আমার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। গজানন শিকদার আর কুমার রণজিৎ এক ও অভিন্ন। অবিশ্বাস্য মনে হলেও কথাটা সত্যি!
কাঞ্চনবাবু, এই যে,…আপনি কিন্তু একজনকে বিশেষভাবে বাদ দিয়ে গেছেন। সুচরিতাদেবীকে আপনি ভালোবাসেন–তাই ওঁকে বাদ দেওয়ার যুক্তি থাকতে পারে– চাকরবাকরদের মোটিভ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এসব মানলাম। কিন্তু ওই লোকটিকে আপনি বাদ দিলেন কী বলে? আরে, ওই লোকটা, যে কালো পোশাক পরে গাড়ির সিটরে নীচে লুকিয়ে আপনাদের কথা শুনছিল। দেখুন না, ওই দেখুন– সে এখনও দাঁড়িয়ে আছে কবুতরের সদর গেটের কাছে। হাঁ করে তাকিয়ে আছে আপনার দিকে। হাতে সিগারেট। দেখুন না, কাঞ্চনবাবু, প্লিজ এদিকে তাকান না একবার!
কবুতর থেকে শপাঁচেক গজ দূরে গাছ-গাছড়ার একটা জঙ্গলের মতো রয়েছে। বনই বলা যেতে পারে সেটাকে। এবড়ো-খেবড়ো জমি। বড়-বড় বট, অশথ, দেবদারু ইত্যাদি গাছ জায়গাটাকে ছেয়ে ফেলেছে। সেইখানে পা ফেলে হেঁটে যাচ্ছিলাম আমি আর সুচরিতা।
আমি এখন কবুতরের অতিথি। আমিই যে অশোক বোস নাম নিয়ে ভাগ্যচক্রে পাণ্ডুলিপির জালে জড়িয়ে পড়েছিলাম সেটা প্রসাদজিকে খুলে বলেছি। এখন ব্যাপারগুলোর একটা ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত কবুতরেই থাকব আমি।
বিকেলের সোনা-রোদ যেন অনেক কষ্ট করে লুকোচুরি খেলে গাছের আড়াল দিয়ে এসে পড়েছে আমাদের গায়ে। মাঝে-মাঝে ঠান্ডা হাওয়ায় একটা আদর টের পাচ্ছিলাম। পাশাপাশি হেঁটে যেতে কী ভালো যে লাগছিল! মনে হচ্ছিল, যদি এই পথ আর না ফুরোয়…।
হাতে হাত ধরে ঝরাপাতার পথ মাড়িয়ে এগিয়ে যেতে-যেতে তাকালাম সুচরিতার দিকে। সুচরিতাও আমারই দিকে চেয়ে ছিল। চোখাচোখি হতেই ফিক করে হেসে ফেলল। আমি একটু বোকা বোকা হাসি হেসে বললাম, সুচরিতা, সত্যিই আমি কোনওদিন ভাবিনি যে, এমনিভাবে তোমার সঙ্গে– সুচরিতার চোখে কপট রাগ দেখে চটপট বলে ফেললাম, তোমার সঙ্গে ভাগ্য এমন চাতুরী করবে। সত্যি, কী বিপদেই না জড়িয়ে পড়েছ!
থাক, আর কথার জাল পাততে হবে না, হেসে বলল সুচরিতা, এবার কাজের কথায় আসা যাক।
হ্যাঁ, গলার স্বর গম্ভীর করে শুরু করলাম, নয়না কল্যাণী সম্পর্কে তুমি কী জানেনা, তাই খুলে বলো।
কিছুই না। ওঁকে আমি চোখে দেখিনি কোনওদিন, ঠোঁট বেঁকিয়ে জবাব দিল ও, শুনেছি গতবছর পর্যন্ত নাকি সাইরেন ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে রিসেপশনিস্টের কাজ করতেন। তারপর মানেকজি ওঁকে কবুতরে ডেকে পাঠান। মানেকজির ইচ্ছে, নয়না কল্যাণী তাঁর সঙ্গেই রাজনীতি নিয়ে থাকুক।
তিনি কবুতরে কতদিন হল এসেছেন?
গতকাল সকালে। কিন্তু ওঁকে তুমি সন্দেহ করছ কেন?
না। সন্দেহ আমি প্রত্যেককেই করছি। কিন্তু ভাবছি যে, রণজিৎ সেনকে খুন করে নয়না কল্যাণীর কী লাভ? হঠাৎই ঘুরে দাঁড়িয়ে বললাম, সু, চলো ফেরা যাক।
ঘুরে দাঁড়াতেই আমার চোখ পড়ল একজন ছায়া-ছায়া মানুষের দিকে। আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে দেখেই সে দৌড়োতে শুরু করল। দিনের আলোয় উজ্জ্বল আকাশের পটভূমিতেও তাকে চেনা গেল না। তবু আমি ছুটলাম।
সুচরিতা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে যত তাড়াতাড়ি পারে আমাকে অনুসরণ করে আসতে লাগল।
দৌড়োতে-দৌড়োতে বনের বাইরে চলে এলাম। কিন্তু কই, কেউ তো কোথাও নেই! হতাশ হয়ে হাঁফাতে-হাঁফাতে বললাম, সুচরিতা, এই লোকটা কোন দলের, সমর বর্মন, না লালপাঞ্জা?
উত্তরে ঠোঁট উলটে হাসল সুচরিতা।
দুজনে আবার কবুতরে ফিরে এলাম। বাড়িতে ঢুকতে যেতেই একটা ব্যাপার দেখে চমকে উঠলাম। বাঁদিক থেকে তৃতীয়? নাঃ, এ তো চার নম্বর জানলাটা দেখা যাচ্ছে। ডানদিকে আরও দু-চার পা এদিক-ওদিক সরলেই তিনটে জানলা থেকে চারটে হয়ে যাচ্ছে। কারণ, দ্বিতীয় সারির ঘরগুলোর একটা জানলা প্রথম সারির ঘরগুলোর সঙ্গে দেখা যাচ্ছে। যাকগে, কুছ পরোয়া নেই।
সুচরিতার দিকে ঘুরে প্রশ্ন করলাম, সু, ওই জানলাটা কার ঘরের?
কেন বলো তো! ওটা কিরণ শর্মার।
কিরণ শর্মার? ঈষৎ ভাঁজ পড়ল আমার কপালে, তা হলে, আমার লিস্টে দ্বিতীয় ব্যক্তি শ্ৰীযুক্ত কিরণ শর্মা। দৃঢ়স্বরে বললাম আমি।
আবার পা বাড়ালাম কবুতর লক্ষ্য করে।
ভেতরে গিয়ে দেখা হল মানেকজির সঙ্গে। তিনি ক্রসওয়ার্ডের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন। আমাকে দেখেই বললেন, আসুন, আসুন–
আমি মৃদু হেসে তার পাশে গিয়ে বসলাম। সুচরিতাও আমার পাশে বসল।
মিস্টার মৈত্র, আমাকে লক্ষ্য করে বললেন মানেকজি, আপনার জন্যে দোতলার যে-ঘরটা ঠিক করে দিয়েছি, সেটা আপনার পছন্দ হয়েছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। ধন্যবাদ।
এইবার ক্রসওয়ার্ডের দিকে ফিরলেন মানেকজি। বললেন, ওয়াডি, এ তো ভীষণ বিশ্রী ব্যাপার ঘটে গেল। মানেকজির স্বচ্ছন্দ বাংলা শুনে অবাকই হলাম।
কুমার রণজিৎ এখানে সাঙ্ঘাতিক জরুরি একটা কনফারেন্সে এসেছিলেন, মানেকজি বলে চললেন, মিটিং তো হলই না, তার ওপর এই স্ক্যান্ডালাস ব্যাপার। কে, কেন, কুমার রণজিৎকে খুন করল আমি ভেবেই পাচ্ছি না, ক্রসবি। পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালে, মুখে একবার বুলিয়ে নিলেন মানেকজি।
দেখুন, আমি চেষ্টায় কোনওই ফাঁক রাখব না। আমতা-আমতা করে বললেন ক্রসওয়ার্ড, কিন্তু এটা আমি বুঝতে পারছি না যে, আপনারা গুলির শব্দ পেলেন না কেন? অথচ মিস্টার মৈত্র বারোটা পঁয়তাল্লিশের সময় গুলির শব্দ পেয়েছেন।
