সারিকা সলজ্জভাবে হাসল।
রূপক চৌধুরীর কথার সঙ্গে তাঁর কাজ হুবহু মিলে গেছে। অতএব সারি, তোর সব রহস্যের সমাধান এইখানেই শেষ। তবে মিস্টার সান্যালের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের জন্যে তোর ক্ষমা চাওয়া উচিত। কর্নেল শ্মিসারটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন।
সারিকা নিশীথের দিকে ফিরল : নিশীথ, সরি, আমার তখন মাথার ঠিক ছিল না।
নিশীথ আর জারিন হাসল।
আশা করি সেই মাথার ঠিক না থাকার জন্যে মিস্টার চৌধুরীই পুরোপুরি দায়ী। নিশীথ রসিকতা করতে ছাড়ল না।
সারিকা মাথা নীচু করল।
সো গুড নাইট টু এভরিবডি। কর্নেল সেন ঘোষণা করলেন।
সকলেই যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল।
বিক্রম সেন সারিকাকে লক্ষ করে বললেন, সারি, কাল আমাকে একবার ফোন করিস।
ঘাড় হেলিয়ে দরজার দিকে এগোল সারিকা।
হঠাৎই আনন্দ কাপুর বাঁ-হাতের এক হ্যাঁচকায় ইন্সপেক্টর দেশাইয়ের রিভলভারটা টেনে নিলেন। বিকৃতকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, খবরদার! কেউ এক পা নড়বেন না! ইন্সপেক্টর, আপনি তো আমাকে রোহিতের খুনের দায়ে অ্যারেস্ট করলেন, কিন্তু শুনলে অবাক হবেন, সে-বিষয়ে পুলিশকে আমার অনেক অদ্ভুত ব্যাপার বলার আছে। ইন্সপেক্টরের দিক থেকে কর্নেলের দিকে ফিরলেন তিনি। বাঁ-হাতের রিভলবার নাচিয়ে বলে উঠলেন, বিক্রম, আমার ডান হাতের বদলে তোমার ডান হাত আমার পাওনা। সুতরাং… হয়তো রিভলবারের ট্রিগার টিপতে যাচ্ছিলেন ডক্টর কাপুর, কিন্তু তার আগেই নীরেন বর্মার ভেঁতা অটোমেটিক গর্জে উঠল।
মুহূর্তের জন্যে একটা অপার বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল আনন্দ কাপুরের মুখে। তারপর তার নিপ্রাণ দেহটা মেঝেতে আছড়ে পড়ল।
এ স্যাড বিজনেস। বললেন বিক্রম সেন, ধন্যবাদ, নীরেন–তুমি গুলি না করলে কাপুর হয়তো সত্যিই আমাকে গুলি করত।
নীরেন বর্মা শুধু হাসলেন। রিভলবারটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন।
ইন্সপেক্টর দেশাই উঠে টেলিফোনের কাছে গেলেন। অ্যাম্বুলেন্স কল করে ফোন করলেন।
সকলেই চুপ। কারও মুখে কোনও কথা নেই।
.
ঘণ্টাখানেক পর দেখা গেল বসবার ঘরে অতিথিরা কেউ নেই। সবাই চলে গেছেন– শুধু নীরেন বর্মা অধৈর্যভাবে পায়চারি করছেন। কর্নেল সেন হাতের গল্পের বইয়ে মগ্ন। মেরিয়নও কখন যেন ঘর ছেড়ে চলে গেছে।
রাত প্রায় এগারোটা।
কর্নেল হঠাৎ মুখ তুললেন : নীরেন, অনেক রাত হল। তুমি বাড়ি যাও।
চমকে উঠলেন নীরেন বর্মা। থমকে দাঁড়ালেন। ও হ্যাঁ, যাব। কিন্তু শেষকালে আনন্দ এই কাজ করল! আমি যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।
ও তো করেনি। আবার বইয়ের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন বিক্রম সেন।
তার মানে!
সুখেন এখন কোথায়, নীরেন? কর্নেল হাতের বইটা বন্ধ করে শ্মিসারের পাশে রাখলেন? শুনেছিলাম ও আর্মিতে আছে।
নীরেন বর্মা অবাক চোখে তাকালেন তার বন্ধুর হাসিখুশি মুখের দিকে। বললেন, ও, তুমি সবই জানো দেখছি! তার গলার স্বর ভারি হয়ে এল। ঘরের ছাদের দিকে আঙুল তুলে। দেখালেন, বললেন, ওপরে। ভগবানের কাছে গেছে।
তোমার একটা কালো শেভ্রলে গাড়ি আছে?
আছে। রোহিত রায় তোমার কী ক্ষতি করেছিল, নীরেন?
অনেক। সুখেনকে আমি সারা জীবনে শুধু দুঃখ আর যন্ত্রণা ছাড়া কিছুই দিতে পারিনি। আমাকে বাবা বলে ডাকতে পর্যন্ত ও ঘেন্না করত। তাই ওর মা মারা যাওয়ার পর ও আমার মুখে থুতু ছিটিয়ে মিলিটারিতে জয়েন করল। আমি বাধা দিতে পারিনি। সে-জোর আমার ছিল না। কিন্তু যখন শুনলাম, সুখেন প্রপেলারের ঘায়ে মারা গেছে, আমি বিশ্বাসই করতে পারলাম না। ক্রমশ জানলাম, ব্যাপার আরও গভীর। রোহিত রায় আমার ছেলেকে ব্রুটালি মার্ডার করেছে। তাই প্রায় একইভাবে রোহিতকে আমি গাড়ি চাপা দিয়ে মেরেছি। তুমিই বলো, বিক্রম, যদি ওর মৃত্যুর শোধ আমি না নিতাম, তা হলে সুখেন কি কোনওদিন আমাকে ক্ষমা করতে পারত! আমার যে নরকেও ঠাই হত না! নীরেন বর্মার চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল ও একাজে আমি সাহায্য চাইলাম আনন্দের। ও স্রেফ চুনিটার লোভে আমাকে সাহায্য করতে রাজি হল। যখন ও রোহিতকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়, তখনও ও জানত না, রোহিতকে আমি সত্যি-সত্যিই খুন করতে চলেছি। কিন্তু পরে ওই চুনিটার লোভে কাপুর যেন খেপে গেল। সারিকাকে হেনস্থা করতে পর্যন্ত ও ছাড়েনি। সারিকা বড় ভালো মেয়ে–ওর লিফট-আতঙ্কের কথা তোমার কাছেই শুনেছিল কাপুর।
কাপুর মারা যাওয়ার আগে তা হলে এইসব কথাই বলতে চাইছিল!
হ্যাঁ। মাথা নাড়লেন নীরেন বর্মা।
নীরেন, তুমি আমার ছোটবেলার বন্ধু। তা ছাড়া, একটু আগেই তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ। তাই একঘর লোকের সামনে আমি তোমাকে অপমান করতে চাইনি। কিন্তু…।
তুমি কী বলবে, আমি জানি। বিক্রম, আমার রিভলবারের গুলি এখনও শেষ হয়ে যায়নি। আশা করি এটুকু বিশ্বাস তুমি আমাকে করবে। তা ছাড়া, সংসারে আমার আর কে আছে! সুখেন নেই, কবিতা নেই–সবাই অভিমানে আমাকে পৃথিবীতে একা রেখে ছেড়ে চলে গেছে। তা ছাড়া, কাপুরকে আমি ওর ঋণ শোধ করে দিয়েছি। আমার মনে আর কোনও দুঃখ নেই। শুধু শেষ ইচ্ছে, একা-একা চলে যাওয়ার সময় তোমাদের কয়েক ফোঁটা চোখের জল যেন আমার সঙ্গে থাকে। গুড নাইট।
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন নীরেন বর্মা। রুদ্ধ কান্নায় তার সমস্ত শরীর ফুলে-ফুলে উঠছিল।
বাইরের রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন তিনি। ওপরের আকাশের দিকে তাকালেন। ঝকঝকে নক্ষত্রের উজ্জ্বল সমারোহ তার চোখের তারায় প্রতিফলিত হল। মাথা নামিয়ে নির্জন কালো রাস্তা ধরে তিনি বিজয়ীর মতো দৃপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে চললেন। যেন নিঃসঙ্গ আলেকজান্ডার গ্রিসের রাজপথ ধরে হেঁটে চলেছেন।
