দূরে কোথাও কোনও ঘড়িতে শব্দ করে ঘণ্টা বাজল।
বিশ্বাসঘাতকদের জন্য
ড. নীতিন জোয়ারদার প্যারিসে একটি চিকিৎসক সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছেন। সঙ্গে স্ত্রী রিনি। বিয়ের পর এই প্যারিসেই দুজনে মধুচন্দ্রিমা কাটাতে এসেছিলেন। তখনই এই শহরটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন ওঁরা দুজনে। তারপর কেটে গেছে কুড়িটি বছর। এবার এই সম্মেলনের সুযোগে নীতিন সস্ত্রীক এসেছেন প্যারিসে–দ্বিতীয়বার।
নড়বড়ে মান্ধাতার আমলের ট্যাক্সি চড়ে ফ্রান্সের রাজধানীর সদ্য-ঘুম-ভাঙা রাজপথ ধরে ওঁরা এসে উঠলেন বিলাসবহুল গ্র্যান্ড হোটেলে। খানিকক্ষণ পুরোনো স্মৃতি রোমন্থনের রঙ্গ-রসিকতায় ডুবে গেলেন দুজনে।
তারপর রিনি স্নান সেরে নিল। তোয়ালে গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে এল বাথরুম থেকে। নীতিন বাথরুমে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাড়ি কামাতে শুরু করলেন। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, রিনি কার্পেট পাতা মেঝের ওপর দিয়ে জামাকাপড়ের সুটকেসটা টেনে নিয়ে গেল চোখের আড়ালে। এবার পোশাক-টোশাক পরে ও তৈরি হয়ে নেবে। তারপর ওঁরা দুজনেই সম্মেলনের জন্য তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়বেন।
দাড়ি কামাতে কামাতে বাথরুম থেকেই নীতিন গলা উঁচু করে কথা বলছিলেন রিনির সঙ্গে। কিন্তু হঠাৎই খেয়াল করলেন, রিনির কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তখন তিনি স্ত্রীর নাম ধরে ডাকলেন–একবার, দুবার।
কিন্তু কোনও সাড়া নেই।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন নীতিন জোয়ারদার। হতবাক হয়ে আবিষ্কার করলেন, ঘরে আর কেউ নেই। রিনির ভেজা পোশাক একপাশে পড়ে আছে। আর তার কাছেই একটা সুটকেস– এই সুটকেসটা নীতিন আগে কখনও দেখেননি। তন্নতন্ন করে সব জায়গায় খুঁজেও স্ত্রীকে দেখতে পেলেন না তিনি।
একজন নিরীহ ছাপোষা ডাক্তারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। হোটেলের ফ্ল্যাটে তিনি একা–আর কেউ নেই!
ড. নীতিন জোয়ারদারের স্ত্রী নামি হোটেলের দামি ঘর থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে উধাও হয়ে গেছেন।
এরপরই শুরু হল খোঁজ।
হোটেলের রিসেপশনের লোকজন বলল, মিসেস জোয়ারদারকে তারা হোটেল ছেড়ে বেরোতে দেখেননি।
ফরাসি পুলিশ অফিসার মুচকি হেসে বললেন, আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গে হোটেলে এসে উঠেছিলেন তো!
কেউ বা বললেন, উনি হয়তো কোনও ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে ইলোপ করেছেন।
মধ্যবয়স্ক একটি মানুষ বিদেশ-বিভুঁই শহরে পাগলের মতো স্ত্রীকে খুঁজে বেড়াতে লাগল।
অবশেষে গ্র্যান্ড হোটেলের একজন পরিচারকের দেওয়া সূত্র ধরে নীতিন জানতে পারলেন, দুজন লোক তার স্ত্রীকে একটা লাক্সারি সিডানে করে তুলে নিয়ে গেছে। সিডানটা যে-গলিতে পার্ক করা ছিল সেখানে গিয়ে নীতিন খুঁজে পেলেন রিনির ব্রেসলেট। কিন্তু তা সত্ত্বেও পুলিশ মানতে রাজি নয় যে, রিনিকে কেউ কিডন্যাপ করেছে।
হোটেলে ফিরে এসে হতাশভাবে বসে রইল একজন বিপন্ন মানুষ। নীতিন এখন কী করবেন? কার কাছে যাবেন সাহায্যের জন্য?
পরদিন ড. জোয়ারদারকে ফোন করল একজন অজ্ঞাতকুলশীল মানুষ।
ড. জোয়ারদার?
কথা বলছি।
আপনার স্ত্রী আমাদের কাছে রয়েছেন।
নীতিন জোয়ারদার পাগলের মতো হয়ে উঠলেন। একসঙ্গে অনেক প্রশ্ন করলেন অচেনা লোকটিকে।
তারপর জানতে পারলেন, ওরলি এয়ারপোর্টে তার হাতব্যাগটি পালটে গেছে আর একজনের হাতব্যাগের সঙ্গে। সেই হাতব্যাগে একটা জিনিস আছে। সেটা নিয়ে এই লোকটির সঙ্গে কোথাও দেখা করে জিনিসটা দিলে ফেরত পাওয়া যাবে রিনিকে। আর নীতিন যদি পুলিশে খবর দেন তা হলে পাওয়া যাবে রিনির লাশ। এখন যেটা ড. জোয়ারদারের পছন্দ…।
.
অন্ধকার ঘরের বিশাল পরদায় বয়ে চলেছে রঙিন চলচ্চিত্র। রোমান পোলানস্কির রুদ্ধশ্বাস ছবি ফ্রানটিক-এর বাংলায় ডাব করা সংস্করণ। নায়ক ড. নীতিন জোয়ারদারের ভূমিকায় হলিউডের প্রখ্যাত অভিনেতা হ্যারিসন ফোর্ড। সিরাজ হোটেলের বলরুমের আবছায়া অন্ধকারে বসে বিশিষ্ট দর্শকরা ছবি দেখছেন।
বার্ষিক রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক সম্মেলন এইবার তৃতীয় বছরে পা দিল। উদ্যোক্তারা এ বছরে কয়েকটি ক্রাইম ছবি দেখানোর ব্যবস্থা করেছেন। ফ্লিম আর্কাইভ থেকে নিয়ে আসা হয়েছে জিঘাংসা ও চিড়িয়াখানা। এ ছাড়া বাছাই করা কয়েকটি বিদেশি ছবি বাংলায় ডাব করে দেখানোর ব্যবস্থা হয়েছে। আজ, প্রথমদিনের ছবি ছিল ফ্রানটিক।
ছবি যখন শেষ হল তখন ঠিক পৌনে তিনটে।
বলরুমের সাবেকী ঝাড়লণ্ঠন জ্বলে উঠল। এ ছাড়াও অন্যান্য বাড়তি আলোয় ঝলমল করে উঠল চারদিক।
অজস্র সাদা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে সুদৃশ্য মঞ্চ। সাদা ফুলের ঘন পটভূমিতে গল্পের গোয়েন্দা শার্লক হোমসের বিখ্যাত ছবি। মাথায় চেক-চেক টুপি। পরনে একই নকশার কোট। ঠোঁটে পাইপ। বাঁকানো লম্বা নাক। ব্যক্তিত্বময় প্রোফাইল। চোয়ালের শক্ত রেখা তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
কাঁধ পেরোনোর পরই প্রখ্যাত গোয়েন্দার ছবিটা শেষ। কিন্তু অনায়াসেই বাকিটা কল্পনা করে নেওয়া যায়।
অনেকক্ষণ আধো-আঁধারির পর হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠায় বেঙ্গলি ক্রাইম রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি ভাস্কর রাহা চোখ পিটপিট করছিলেন। চোখের আর দোষ কী! ওদেরও তো বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি হল! পাঁচ বছর আগেই ওদের রিটায়ার করা উচিত ছিল। কিন্তু পুরু লেন্সের চশমা ওদের প্রতি পদে সাহায্য করায় ওরা এখনও হাল ছাড়েনি।
