নীরেন বর্মা চুপচাপ ফিরে এসে চেয়ারে বসলেন। কর্নেল সেন ডক্টর কাপুরকে লক্ষ করে শ্মিসার মেশিন পিস্তল উঁচিয়ে ধরলেন ও কাপুর, বহ্নিশিখাকে কবজা করার জন্য বহু পরিশ্রম তোমাকে করতে হয়েছে। সারিকাকে আমার আদরের সারিকাকে তুমি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতেও ছাড়োনি। কিন্তু এখন তোমার অত পরিশ্রমের প্রয়োজন নেই। এগিয়ে এসে টেবিল থেকে বহ্নিশিখা তুলে নাও-ওঃ, কাম অন–।
আনন্দ কাপুর নিশ্চল হয়ে পড়ে রইলেন।
এসো কাপুর-আমার বাড়িতে আমার হুকুম শোনা ছাড়া তোমার উপায় নেই। গর্জে উঠলেন বিক্রম সেন।
আনন্দ কাপুর জামাকাপড় ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়ালেন। পা টেনে-টেনে এগিয়ে এলেন টেবিলের কাছে। কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে হাত বাড়ালেন বহ্নিশিখার দিকে।
বিকট শব্দে গর্জে উঠল বিক্রম সেনের হাতের শ্মিসার।
আনন্দ কাপুরের হাত থেকে বহ্নিশিখা ছিটকে পড়ল মেঝেতে। কাপুর রক্তাক্ত ডান হাত চেপে মেঝেতে বসে পড়লেন।
আই ক্যান্ট টলারেট এনি মোর। চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন ইন্সপেক্টর দেশাই।
বিক্রম সেন হাসলেন : তা হলে দরজা খোলাই আছে। আপনি স্বচ্ছন্দে চলে যেতে পারেন। তা ছাড়া, আপনি তো দেখলেন, কাপুর চুনিটা নিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিল। ঘরের সবাই দেখেছে। জিগ্যেস করুন।
দেশাই গম্ভীর মুখে ধক করে চেয়ারে বসে পড়লেন।
সারিকা ফিরে এল ওর চেয়ারে।
রূপক চৌধুরী সারিকার কানে কানে বলল, সু, মনে আছে, যেদিন রোহিত রায় মারা যায়, সেদিন ওই স্পটের কাছেই একটা পানের দোকানে দাঁড়িয়ে ছিলেন এই আনন্দ কাপুর?
সারিকার দৃশ্যটা মনে পড়ল। তখন ডক্টর কাপুর এক বৃদ্ধা মহিলার সঙ্গে কথা বলছিলেন।
ও ঘাড় নাড়লঃ মনে পড়েছে।
কর্নেল সেনকে সেকথা জানাল সারিকা। তিনি নীরবে মাথা নাড়লেন। আনন্দ কাপুরকে লক্ষ করে বললেন, রোহিত রায়কে খুন করা হয়েছিল, কাপুর। এখন আমার প্রশ্ন ওকে পেছন থেকে ধাক্কাটা কে দিয়েছিল, তুমি?
আনন্দ কাপুর ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর শরীর থরথর করে কাঁপছে। ঠোঁটজোড়ার কাপুনি দেখে মনে হল, তিনি কিছু বলতে চাইছেন, কিন্তু পারছেন না।
কাপুর, তুমি আমাকে চেনো। শান্ত স্বরে বললেন বিক্রম সেন, সত্যি কথা না বলা পর্যন্ত এই শ্মিসারের গুলি একটা-একটা করে তোমার শরীরে ঢুকবে। না, মারা তুমি যাবে না। তবে বাকি জীবনটা তোমাকে হ্যাঁন্ডিক্যাল্ড হয়ে কাটাতে হবে। শ্মিসার তাক করলেন কর্নেল সেন : প্রথমে বাঁ-হাত। এক..দুই…।
দু-হাতে চোখ ঢাকল জারিন এবং সারিকা। কর্নেল সেন কি পাগল হয়ে গেছেন!
বিক্রম, প্লিজ স্টপ স্টপ! আকুতি ঝরে পড়ল কাপুরের গলায়, বলছি, সব বলছি!..হ্যাঁ, রোহিত রায়কে ধাক্কা আমিই দিয়েছি!
দ্যাট ইজ উইলফুল মার্ডার। অতএব, ইন্সপেক্টর দেশাই, আপনি খুনের চার্জে আনন্দ কাপুরকে গ্রেপ্তার করতে পারেন। ইন্সপেক্টরের দিকে ফিরলেন কর্নেল।
ইন্সপেক্টর দেশাই উঠে এলেন চেয়ার ছেড়ে। আনন্দ কাপুরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন ও মিস্টার কাপুর, আপনাকে খুনের চার্জে অ্যারেস্ট করা হল।
আনন্দ কাপুর মাথা নীচু করে এসে বসলেন দেশাইয়ের পাশে। রক্তাক্ত ডান হাতে রুমাল চাপা দিলেন।
কর্নেল সেন আবার মুখ খুললেন, মিস্টার প্ৰেমনাথ ধর, আপনার চুনি আপনি ফেরত নিতে পারেন। এই চুনিটাকে নিয়ে যে পরিশ্রম আপনাকে করতে হয়েছে, তার জন্যে আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি।
প্রেমনাথ ধর এগিয়ে এসে বহ্নিশিখাকে তুলে নিল। পকেটে রাখল। তারপর কর্নেলকে একটা ছোট্ট ধন্যবাদ জানিয়ে আবার চেয়ারে এসে বসল।
মিস্টার রূপক চৌধুরী! রূপক চৌধুরী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল? আশা করি আপনার নামের ব্যাপারে আমরা কোনও ভুল করিনি?
না। কর্নেল সেনের প্রশ্নের জবাব দিল সে। স্বর অকম্পিত : আমার নাম রূপক চৌধুরীই।
সারিকার কাছে আপনি যেসব কথা বলেছেন, তার কতটা সত্যি বলে আমরা মনে করতে পারি?
আংশিক।
যথা?
যথা, রোহিত রায় শুধু আমার বন্ধুই ছিল না–ও আমার ছোট বোনকে বিয়েও করেছিল। ওদের সুমন নামে একটা ছেলে আছে। রোহিত চুনিটা নিয়ে যখন কলকাতায় আসে তখন ওর বিপদের কথা আমরা জানতে পারি। আমার বোন এবং আমি ওকে অনেক বোঝাই। কিন্তু ও তখন লোভে অন্ধ। তাই আমাদের অনুরোধ-উপরোধ ওর কাছে বিরক্তিকর মনে হল। দিনের পর দিন ও পালিয়ে বেড়াতে লাগল। বলত, বিভিন্ন গ্যাং নাকি ওর পিছু নিয়েছে। অর্থাৎ প্ৰেমনাথ ধর, ইনটেলিজেন্স ডিপার্টমেন্ট, আর–এখন জানলাম–ডক্টর আনন্দ কাপুর।
আমি আমার ছোট বোনের কান্নাকাটি সহ্য করতে পারছিলাম না। তাই ভাবলাম, যেভাবে হোক ওই চুনি আমি রোহিতের কাছ থেকে নিয়ে জায়গামতো ফেরত দেব। তাই শেষে আমিও ওকে ফলো করতে লাগলাম। তারপর রোহিত একদিন সন্ধ্যায় মারা গেল। বহ্নিশিখার সঙ্গে আমার সম্পর্ক এই সূত্রেই। রূপক চৌধুরী বসল। সারিকার দিকে ফিরে বলল, সু, তোমার সঙ্গে সেদিনের অভিনয়ের জন্যে আমি দুঃখিত। কিন্তু তুমি হয়তো জানো না, এই বহ্নিশিখার ব্যাপারে পুলিশ আমার বোনকে সাসপেক্ট হিসেবে এখনও হ্যারাস করছে। তাই এই পাথরটা ফিরে পাওয়ার জন্যে আমি মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। আমাকে ক্ষমা কোরো, সু–।
সারিকা আশ্বাসের হাত রাখল রূপকের হাতে। রূপক হাসল : নিশীথ সান্যালকে আমি জীবনে কোনওদিন দেখিনি। কিন্তু কী উপায় ছিল, বলো? তুমিই আমাকে নিশীথ বানিয়ে ছাড়লে!
