কিছুক্ষণ নীরবতার পর ও-প্রান্ত থেকে শোনা গেল, তুই এক কাজ কর। ফোন করে নীরেন, আনন্দ এবং ইন্সপেক্টর দেশাইকে এখুনি আমার এখানে আসতে বল। আর তুইও দুই নিশীথকে নিয়ে চলে আয়। রহস্যের শেষ অঙ্কের অভিনয় আমি আর আগামীকালের জন্যে ফেলে রাখতে চাই না।
সুতরাং ফোন করে নীরেন বর্মা, ইন্সপেক্টর দেশাই এবং রূপক চৌধুরীকে কর্নেল সেনের বাড়িতে আসতে বলল সারিকা। অবাক হলেও তারা মুখে কিছু বলেননি।
কিন্তু আনন্দ কাপুরকে ফোনে পাওয়া গেল না।
একটু পরেই জারিনের ঘরে ঢুকল নিশীথ।
নাঃ, কাউকেই দেখলাম না। নিশীথ হাঁফাতে-হাঁফাতে বলল, আর, সারিকা, লিফটের ভেন্টিলেটার তো ঠিকই আছে, কোনও অ্যাডেসিভ টেপ-ঠেপ কিছু লাগানো নেই!
ও–তা হলে স্রেফ সাইকোলজিক্যালি ভয় দেখানোর জন্যেই লোকটা অমন মিথ্যে কথা বলেছিল। চিন্তিতমুখে বলল সারিকা, যাকগে, নিশীথ, তুমি আর জারিন এখুনি আমার সঙ্গে চলো কাকুর বাড়িতে যেতে হবে। তিনি বলেছেন, এই সব রহস্যের শেষ অঙ্কটা আর আগামী রাতের জন্যে ফেলে রাখবেন না। অতএব গেট রেডি কুইক!
মিনিটখানেক পরেই একটা ট্যাক্সি ওদের তিনজনকে ছুটিয়ে নিয়ে চলল সতীশ মুখার্জি রোডের দিকে।
.
১৪.
সারিকা, নিশীথ আর জারিন যখন কর্নেল সেনের বাড়িতে পৌঁছোল, তখন রাত প্রায় নটা।
বসবার ঘরে ঢুকে ওরা দেখল টেবিলের কাছে রাজকীয় ভঙ্গিতে শাল গায়ে জড়িয়ে বসে আছেন কর্নেল সেন। হাতে একটা গল্পের বই। সামনের টেবিলে রাখা বহ্নিশিখা–আর তার পাশেই একটা কুৎসিত শ্মিসার মেশিন পিস্তল।
দরজা খোলার শব্দে বই থেকে মুখ তুললেন কর্নেল সেন, বললেন, আয়, সারি–আর কেউ এখনও আসেনি–তবে এসে পড়বে।
ওরা লক্ষ করল, ঘরের পুরু কার্পেট তুলে ফেলা হয়েছে। ঘরের এক কোণে চুপচাপ পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে মেরিয়ন।
ওরা তিনজন একইসঙ্গে ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই অভ্যস্ত ভঙ্গিতে মেশিন পিস্তলটা উঁচিয়ে ধরেছেন কর্নেল সেন ও ওয়ান বাই ওয়ান, প্লিজ। সারি, তুই আগে আয়– জুতো খোলার কোনও প্রয়োজন নেই।
সারিকা অবাক হয়ে এক-পা এক-পা করে ঘরের ভেতরে এগিয়ে এল। চেয়ারে বসল।
তারপর একই ভঙ্গিমায় জুতোর খটখট শব্দ তুলে ঘরে ঢুকল জারিন এবং নিশীথ।
কর্নেল সেনের মুখে হাসি ফুটে উঠল : এর জন্যে আমি দুঃখিত, মিস্টার সান্যাল। কিন্তু সেই অদ্ভুত ফলোয়ারকে ধরতে গেলে তার বিচিত্র পায়ের শব্দ আমার শোনা দরকার। তাই আজ ঘরের কার্পেট সরিয়ে ফেলেছি।
কর্নেল সেনের কথা শেষ হতে-না-হতেই বাইরে থেকে ভেসে এল ভারী বুটের শব্দ।
ঘরে ঢুকলেন ইন্সপেক্টর দেশাই। একইসঙ্গে বহ্নিশিখা এবং শ্মিসার মেশিন পিস্তল দেখে চমকে উঠলেন।
বিক্রম সেন হাসলেন : এই পাথরটা একটা নটোরিয়াস জুয়েল, ইন্সপেক্টর–এবং শ্মিসার মেশিন পিস্তল ইজ অলসো আ নটোরিয়াস ডার্টি থিং–।
ইন্সপেক্টর দেশাই কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, বাধা দিলেন বিক্রম সেন দিস ইজ মাই শো, ইন্সপেক্টর। আপনার ভূমিকা এখানে শুধুমাত্র দর্শকের।
চুপচাপ একটা চেয়ারে বসলেন দেশাই। মুখে তার হতবুদ্ধির ছাপ স্পষ্ট।
এমন সময় দেখা গেল দরজায় দাঁড়িয়ে নীরেন বর্মা, আনন্দ কাপুর, রূপক চৌধুরী এবং প্ৰেমনাথ ধর।
সারিকা চমকে উঠে দাঁড়াল : আপনি–আপনি এখানে কী করে এলেন?
প্রেমনাথ ধর হাসলঃ আপনাদের ফলো করে। আমি নীরেন বর্মা এবং ডক্টর কাপুরের সঙ্গে দেখা করে জেনেছিলাম বহ্নিশিখা তাঁদের কাছে নেই। তখন ভাবলাম আপনাকে নজরে রাখলে হয়তো পাথরটার সন্ধান পাওয়া গেলেও যেতে পারে–তাই।
ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিলেন নীরেন বর্মা। কিন্তু কর্নেলের বজ্রকঠিন স্বরে থমকে দাঁড়ালেন।
একসঙ্গে কেউ ঘরে ঢুকবেন না। একে একে আসুন। নীরেন–তুমিই প্রথমে এসো।
নীরেন বর্মা অবাক হয়ে ছোট-ছোট পা ফেলে ঘরে ঢুকলেন। একটা চেয়ারে বসলেন।
নেক্সট-আপনি কর্নেল সেন শ্মিসার উচিয়ে ধরলেন রূপক চৌধুরীর দিকে।
রূপক ধীরে-ধীরে সারিকার পাশে এসে বসল।
একইভাবে ঘরে ঢুকল প্ৰেমনাথ ধর।
সব শেষে এল ডক্টর কাপুরের পালা।
ডক্টর কাপুর একটা চেয়ার লক্ষ করে এগিয়ে আসতে লাগলেন। সঙ্গে-সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল সারিকা। রূপক চৌধুরী ও প্রেমনাথ ধর দু-চোখে অপার বিস্ময় নিয়ে চেয়ে রইল ডক্টর কাপুরের দিকে।
ডট-ড্যাশ। ডট–ড্যাশ।
মর্স কোডের শব্দটা হাজার মেশিনগানের শব্দের মতো এসে বাজল সারিকার কানে। ও বিকৃতকণ্ঠে এক আর্তচিৎকার করে ছুটে গেল কর্নেল সেনের কাছে। তাঁকে ভয়ে আঁকড়ে ধরল। ডুকরে উঠল অস্ফুট স্বরে, না-না–এ হতে পারে না!
ডক্টর কাপুর থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
এবং চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন নীরেন বর্মা। শান্ত পায়ে এগিয়ে গেলেন আনন্দ কাপুরের দিকে। ঘরের আলোয় তাঁর টেরিনের কালো স্যুট ঝলসে উঠল। তিনি আনন্দ কাপুরের সামনে গিয়ে থামলেন। মৃদুস্বরে বললেন, কাপুর, তোমাকে আমি বন্ধু বলেই জানতাম। সঙ্গে-সঙ্গে তার বাঁ-হাত শূন্যে ঝলসে উঠল। সপাটে এসে আছড়ে পড়ল কাপুরের চোয়ালে।
মেঝেতে ছিটকে পড়লেন আনন্দ কাপুর। তার ঠোঁট কেটে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা। নীরেন তাকে টেনে তুলতে যাচ্ছিলেন, বিক্রম সেনের কথায় থমকে দাঁড়ালেন।
নীরেন, দিস ইজ মাই শো। ফিরে এসে চেয়ারে বসো।
