সারিকা প্রথমে ভাবল, এই ফিসফিসে শব্দটা আসছে লিফটের ওপর থেকে। কিন্তু একটু পরেই বুঝল, না, শব্দটা আসছে দরজার কাছ থেকে। দরজার জোড়ে মুখ চেপে কেউ কথা বলছে।
….কারণ ছ-তলার দুটো ফ্ল্যাটের দরজাতেই তালা। লিফট যে ছ-তলায়, সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।
সারিকা জানে কথাটা মিথ্যে নয়। ওর চিৎকার শোনার লোক ছ-তলায় কেউ নেই। বিকেলেই ও দেখেছে, জারিন নিশীথের সঙ্গে বেরিয়ে গেছে। পিসিমারাও নিশ্চয়ই মাকে সঙ্গে করে কোথাও বেরিয়েছেন। নইলে ওর ধাক্কা দেওয়ার শব্দ হয়তো শুনতে পেতেন।
কিন্তু কে এই অদৃশ্য শত্রু?
মিস মুখার্জি, লিফটের ফিউজ আমি খুলে নিয়েছি। ভেতরের বাম্বটাও আমিই খুলে রেখেছি। কেন জানেন? আপনার কাছ থেকে একটা খবর চাই বলে। আশা করি নিজের অবস্থার কথা ভেবে আপনি ঠিকঠাক উত্তর দেবেন।…বহ্নিশিখা কোথায়?
আমি–আমি জানি না। ঢোক গিলে জবাব দিল সারিকা। মনে-মনে অনুমান করার চেষ্টা করল এই গলা কার। সে কি ওর পরিচিত, না অপরিচিত?
জানেন না?…তা হলে জেনে রাখুন, লিফটের ভেতরে দমবন্ধ হয়ে মারা যেতে সাধারণ মানুষের মিনিটদশেক লাগে। আপনার কমিনিট লাগবে বলতে পারি না।
তার মানে! চিৎকার করে উঠল সারিকা।
তার মানে এই লিফটে হাওয়া চলাচলের সমস্ত রাস্তাই বন্ধ। ওপরের ভেন্টিলেটারটা আমি অ্যাডেসিভ টেপ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছি। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্বাসকষ্টটা আপনি বেশ স্পষ্টভাবে টের পাবেন।…দেখুন তো, এবার মনে পড়ছে কি না, বহ্নিশিখা কোথায়!
সারিকা চোখ তুলে ভেন্টিলেটারটা দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই নজরে এল না।
তবে নেপথ্য ব্যক্তির কথা যে ঠিক সেটা একটু পরেই বোঝা গেল। সত্যিই, ক্রমশ ওর শ্বাস-প্রশ্বাস যেন ঘন হয়ে উঠছে। লিফটের আবদ্ধ বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ ক্রমশ কমে আসছে।
কিন্তু না, শত বিপদেও কর্নেল সেনকে এই নৃশংস শক্রর হাতে তুলে দিতে পারে না সারিকা। মনের সমস্ত শক্তি এক করে সারিকা বলে উঠল, বহ্নিশিখা চুরি গেছে। ওটা কে নিয়েছে আমি জানি না। কথা বলতে এখন বেশ কষ্ট হচ্ছে বলে মনে হল সারিকার।
মিথ্যে কথা! দরজার বাইরে আগন্তুক হিসহিস করে গর্জে উঠল, আপনি মিথ্যে কথা বলছেন! এখনও সময় আছে, মিস মুখার্জি। নয়তো মনে করে দেখুন, আপনার মোমের মতো শরীরটা সামান্য অক্সিজেনের অভাবে ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠবে। তারপর আপনার নাকের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসবে রক্ত। চোখজোড়া লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসবে কোটর ছেড়ে। এখনও বলুন বহ্নিশিখা কোথায় আছে।
উত্তরে সারিকা প্রচণ্ড জোরে দরজার ধাক্কা মারল। প্রাণপণে চিৎকার করে উঠল গলা ফাটিয়ে।
আবার কিছুক্ষণ সব চুপচাপ।
তারপর হাসির শব্দ ভেসে এল দরজার বাইরে থেকে। আগন্তুকের ফিসিফিসে স্বরে বেজে উঠল সম্মোহনের সুর, এভাবে চেঁচিয়ে কোনও লাভ হবে না, মিস মুখার্জি। শুধু-শুধু হাঁপিয়ে পড়বেন। যত হাঁফিয়ে পড়বেন তত বেশি অক্সিজেন আপনার দরকার হয়ে পড়বে। অর্থাৎ মৃত্যুর দরজার দিকে আপনি আরও তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাবেন।…পাথরটা কোথায়, বলুন। এই আপনার লাস্ট চান্স। তারপরও যদি চুপ করে থাকেন, তা হলে আমি সোজা এবাড়ি ছেড়ে চলে যাব– অফ কোর্স, আপনাকে এ অবস্থায় রেখেই। সুতরাং জীবন অথবা মৃত্যু, যে-কোনও একটা বেছে নিন।
লিফটের অন্ধকারে ভীষণ অসহায় বোধ করল সারিকা। ধীরে-ধীরে ও হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল। কোনওরকমে উত্তর দিল, পাথরটা কর্নেল সেনের কাছে আছে। এখন দরজাটা খুলে দিন– সারিকা মাথা ঝুঁকিয়ে পড়ে রইল।
আচমকা আলো জ্বলে উঠল, এবং দরজা খোলার শব্দ হল। মুখ তুলল সারিকা। দেখল দরজা খুলে গেছে। ল্যান্ডিংয়ের আলো ঠিকরে এসে পড়েছে লিফটের ভেতরে।
চট করে সোজা হয়ে দাঁড়াল সারিকা। ওর সামনে কেউ নেই। তা হলে কি লোকটি সিঁড়ি দিয়েই সরে পড়েছে?
বাইরে এল ও।
কী করবে ভেবে ওঠার আগেই দেখল, লিফট নেমে যাচ্ছে নীচের দিকে। বোধহয় নীচ থেকে কেউ বোতাম টিপেছে। সিঁড়ির কাছে গিয়ে ঝুঁকে দেখল সারিকা। না, কেউ নেই।
একটু পরেই লিফট আবার ছতলায় এসে থামল। লিফট থেকে বেরিয়ে এল নিশীথ এবং জারিন। সারিকার অবস্থা দেখে ওদের দুজনের চোখে ফুটে উঠল বিস্ময় এবং সংশয়।
কী হয়েছে, সারি? জারিন এগিয়ে এল ওর কাছে? তোমার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা ঝড় বয়ে গেছে!
সংক্ষেপে সব ঘটনা খুলে বলল সারিকা। সঙ্গে-সঙ্গে ক্ষিপ্রগতিতে ঘুরে দাঁড়াল নিশীথ। তীরবেগে সিঁড়ি ভেঙে নামতে শুরু করল।
সারিকা আর জারিন একবার ফিরে তাকাল নিশীথের চলে যাওয়া শরীরের দিকে, তারপর আবার পরস্পরের চোখে চোখ রাখল।
কর্নেল সেনকে ফোন করে এখুনি সাবধান করা দরকার। সারিকা বলল।
চলো–তা হলে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই।
জারিনের ঘরে ঢুকে কর্নেল সেনকে ফোন করল সারিকা।
ও-প্রান্ত থেকে সাড়া পেতেই ও রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল, কে, কাকু? আমি সারি বলছি।
কী ব্যাপার? কর্নেল সেনের ভরাট কণ্ঠস্বরে কিছুটা উদ্বেগ।
সারিকা সমস্ত ঘটনা গড়গড় করে বলে গেল। শেষে হাঁফাতে-হাঁফাতে বলল, লোকটা পুরুষ কি মহিলা সেটাও আমি বুঝতে পারিনি। কারণ, সবসময় সে ফিসফিসে স্বরে কথা বলছিল। আমি শেষ পর্যন্ত সইতে পারিনি, কাকু। লোকটাকে চুনিটার কথা বলে দিয়েছি।
