নিশীথ সান্যালের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে তুই আগে কোনওদিন মিশেছিস বলে আমার মনে হয় না। তাই চেহারার সামান্য তফাত আর আচার-ব্যবহারের আকাশ-পাতাল ডিফারেন্স তোর চোখে পড়ল না। তুই ওই রূপক চৌধুরীকেই আসল নিশীথ বলে ভাবতে শুরু করলি। তার স্বভাব, চেহারা সব তোর মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলল। তাই যখন আসল নিশীথ হাজির হল, তুই তাকেই নকল বলে মনে করলি।
তাই যদি হয়, তা হলে রূপক তো চুনিটা নিয়েই সরে পড়তে পারত! আমার সঙ্গে আলাপ জমানোর ওর কী দরকার ছিল? সারিকা জানতে চাইল।
ছিল–দরকার ছিল। কর্নেল সেন বললেন, কারণ, যখন সে তোকে দেখতে পায়, তখন তুই চুনিটা হাতে নিয়ে পছন্দ করে ফেলেছিস। সে তো আর দোকানের একঘর লোকের সামনে তোর হাত থেকে পাথরটা ছিনিয়ে নিতে পারে না। তা ছাড়া, মনে করে দেখ, পাথরটা কেনার জন্যে সেও তোকে যথেষ্ট রিকোয়েস্ট করেছিল। কারণ, তুই পাথরটা কিনলে সে পরে কোনও ছলছুতোয় সেটা নিয়ে সরে পড়তে পারবে। সে-চেষ্টাও রূপক করেনি তা নয়। কিন্তু তুই যে রেস্তরাঁয় চুনিটা গলায় পরে বসেছিলি, তা সে বুঝতে পারেনি। তাই ভুল করে খালি বাক্স নিয়েই সরে পড়েছে। পরে যখন দেখেছে বাক্সে পাথরটা নেই, তখন আবার ফিরে এসেছে তোর কাছে ছদ্ম পরিচয়ে কাল রাতে। কর্নেল সেন থামলেন।
সারিকার বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সমস্ত ঘটনা আবার প্রথম থেকে ও ভাবতে শুরু করলসম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে।
কর্নেল সেনের সিদ্ধান্তে যে ভুল নেই সেটা ও স্পষ্ট বুঝতে পারল। তা হলে কি রূপকই ওকে কাল রাতে রাস্তায় অনুসরণ করেছিল? রোহিত রায়কে অনুসরণ করার কথা ও তো নিজের মুখেই সারিকার কাছে স্বীকার করেছে। কিন্তু রোহিত রায়কে খুন করল কে?
কর্নেল সেন জবাব দিলেন, রোহিতকে কে খুন করেছে, তাও আমি জানি।
সারিকা চমকে উঠল। বুঝল, ওর শেষ চিন্তাটা নিজের অজান্তেই ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। কৌতূহলী হয়ে ও জানতে চাইল, কিন্তু কাকু, ওরকমভাবে কে ফলো করছে বলে তোমার সন্দেহ হয়?
সন্দেহ নয়, সেটা সরাসরি জানা যাবে কাল রাতে। তুই বলেছিলি, পেছনে তাকিয়ে তুই কাউকে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখিসনি। সেই কারণেই আমার মনে হয়, অনুসরণকারীর পায়ে কোনওরকম দোষ নেই। কিন্তু ওই অদ্ভুত ডট-ড্যাশের মতো পা টেনে চলার শব্দ যখন হয়, তখন নিশ্চয়ই তার পায়ে এমন কোনও ব্যথা আছে, যার জন্যে সে ওইভাবে চলতে বাধ্য হয়। নইলে সাধ করে কেউ ওভাবে একটা স্পেশাল সাউন্ড করে তোর অ্যাটেনশন চাইত না। মোটামুটি সবই আমার জানা হয়ে গেছে, সারি। কাল রাতে তুই রূপককে নিয়ে আয় সব জানতে পারবি।
কিন্তু রূপক চৌধুরী এর মধ্যে কী করে জড়িয়ে পড়ল? ওর এক্সপ্লানেশনে তোমার বিশ্বাস হয়, কাকু, যে রোহিত ওর বন্ধু ছিল, তাকে বিপদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যেই…?
না। বিশ্বাস হয় না। তবে সত্যি-মিথ্যে আমরা সবই জানতে পারব কাল রাতে।
.
১৩.
সে-রাতে সারিকার বহুদিনের আশঙ্কা সত্যি হল।
এক বন্ধুর বাড়ি থেকে ফিরতে ওর একটু দেরিই হয়েছিল।
পাতিল ম্যানসনের সামনে এসে ও দেখল দরজার কেউ নেই। এতে ও তেমন অবাক হয়নি। অবাক হল লিফটের কাছে এসে।
লিফট অন্ধকার।
ভেতরের ঘোলাটে বাম্বটা কেটে গেছে।
লিফটে উঠবে কি না সেটা দুবার চিন্তা করল সারিকা। কিন্তু না উঠেও উপায় নেই। কারণ এই ক্লান্ত শরীরে ছ-তলা সিঁড়ি ভেঙে ওঠা ওর পক্ষে সম্ভব হবে না। সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই দরজার কাছ থেকে একটা অস্পষ্ট শব্দ পেল সারিকা। কিন্তু ঘুরে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই।
সুতরাং আর সময় নষ্ট না করে ও লিফটে উঠল। বোতাম টিপতে যাবে, শুনল একটা পায়ের শব্দ। যেন কেউ পা টেনে-টেনে হেঁটে আসছে লিফটের দিকে।
আর ভাবতে পারল না সারিকা। চট করে বোতাম টিপে দিল। নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল লিফটের ধাতব দরজা। যন্ত্রযান উঠতে শুরু করল।
একইসঙ্গে সারিকার সেই পুরোনো আতঙ্কটা দানা বাঁধতে লাগল। যত সব বাজে ম্যানিয়া ভাবল ও। মানুষের ভুল হতে পারে, কিন্তু যন্ত্রের কখনও ভুল হয় না। এইসব লিফট তৈরি হওয়ার পর বারবার পরীক্ষা করে দেখা হয় কোনও খুঁত আছে কি না। সুতরাং ভয় পাওয়ার কোনও মানে নেই। এতদিন কেন যে ও ভয় পেয়ে এসেছে কে জানে!
কিন্তু আজ লিফটের ভেতরে ঘন অন্ধকার। দরজাটা যে কোন দিকে সেটা ঠিক ঠাহর করতে পারছিল না সারিকা। এমন সময় হঠাৎই লিফট থামল!
দরজাটা তক্ষুনি একপাশে সরে যাওয়ার কথা, কিন্তু সরল না।
এই শীতেও সারিকা ভয়ে ঘামতে শুরু করল। প্রাণপণে লিফটের দেওয়ালে একটানা ধাক্কা দিয়ে চলল। কিন্তু যে-শব্দ তাতে হল, মনে হয় না কেউ তা শুনতে পাবে। তা ছাড়া, লিফটের ভেতরে বসানো কাচের চাকতিতে শেষ নম্বর ও দেখেছিল পাঁচ। অর্থাৎ, লিফট এসে ছতলাতেই থেমেছে। আর পরমুহূর্তেই সেই চাকতির আলোও নিভে গেছে।
আতঙ্কে উন্মাদ হয়ে গেল সারিকা। দু-হাতে এলোপাতাড়ি আঘাত করে চলল লিফটের ধাতব দেওয়ালে। আর একইসঙ্গে একটানা চিৎকার। সে-চিৎকারের শব্দ বদ্ধ ধাতব খাঁচায় যেন এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মতো মনে হল।
একসময় একটু দম নেওয়ার জন্য থামল সারিকা। আর তখনই শুনতে পেল কারও গলা। যেন ফিসফিস করে কেউ কথা বলছে।
উত্তেজিত হয়ে কোনও লাভ নেই, মিস মুখার্জি। আপনার চিৎকার কেউই শুনতে পাবে না।
