অনন্যাদেবীকে দেখেই হাতের বইটা টেবিলের ওপরে নামিয়ে রাখলেন কর্নেল সেন। বললেন, আসুন, মিসেস রায়–আমারই নাম কর্নেল বিক্রম সেন। হাত তুলে নমস্কার জানালেন তিনি।
উত্তরে অনন্যাদেবীও প্রতি-নমস্কার জানালেন। এগিয়ে এসে একটা চেয়ারে বসলেন।
আপনি আসাতে আমি খুব খুশি হয়েছি, মিসেস রায়। তা ছাড়া, দেখছেনই তো আমার অবস্থা–গত যুদ্ধের পুরস্কার। কর্নেল সেন হাসলেন।
অনন্যাদেবী কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই তার চোখ পড়ল নিশীথের ওপরে।
খোলা দরজার ফ্রেমে নিশীথ দাঁড়িয়ে। ও কখন এসেছে কেউ খেয়াল করেনি।
কীরে, তুই এখানে। তিনি নিশীথকে দেখে রীতিমতো অবাক।
নিশীথও কম অবাক হয়নি। সে সোজা এগিয়ে এল সারিকার কাছে ও সারিকা, এসব কী ব্যাপার! তুমি শেষ পর্যন্ত দিদিকে এখানে টেনে এনেছ!
কর্নেল সেন নিশীথকে বাধা দিলেন না, মিস্টার সান্যাল, মিসেস রায়কে আমিই আসতে বলেছিলাম সামান্য কিছু চাঁদা দেওয়ার জন্যে।
নিশীথ চুপ করে গেল। কর্নেল সেন এবার ফিরলেন অনন্যা রায়ের দিকে। ডান হাতটা বাড়িয়ে ধরলেন : মিসেস রায়, এই নিন–চেকটা রাখুন।
ধন্যবাদ। টাকার অঙ্কের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে মিসেস রায় বললেন, এই দশহাজার টাকায় আমাদের অনেক নতুন পরিকল্পনা বাস্তব হয়ে উঠবে।
এমন সময় চা-জলখাবার নিয়ে ঘরে এল মেরিয়েন।
মিসেস রায় তখন একমনে নিশীথের সঙ্গে গল্প করছেন। সারিকা কান খাড়া করে ওঁদের কথাবার্তা শুনতে চেষ্টা করল। বেশিরভাগ কথাই পুরনো দিনের, আত্মীয়স্বজন সংক্রান্ত।
না, এরপর নিশীথের পরিচয় সম্পর্কে আর কোনও সন্দেহই থাকা উচিত নয়। কিন্তু…।
নানান আলোচনার পর প্রায় সাড়ে এগারোটা নাগাদ অনন্যাদেবী রওনা হলেন। যাওয়ার আগে কর্নেল সেনকে আরও একবার ধন্যবাদ জানালেন। নিশীথকে ওঁর বাড়ি যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি চলে গেলেন।
অনন্যা রায় ঘর ছেড়ে বেরোতেই ফেটে পড়ল নিশীথ সান্যাল ও সারিকা, এসব নাটকের অর্থ কী! এখনও কি আমার সম্পর্কে তোমার সন্দেহ যায়নি?
নিশীথের প্রশ্নের জবাব দিলেন কর্নেল সেন, নিরুপায় হয়েই আমাদের এই অ্যাসিড টেস্ট করতে হয়েছে এবং এখন আমরা শিওর হয়েছি।
আমি হইনি। কাটা স্বরে বলে উঠল সারিকা, কারণ, আসল নিশীথ কাল রাতে আমার কাছে এসেছিল। ও বলেছে, এর নাম রূপক চৌধুরী নিশীথ সান্যাল নয়। আর এই রূপক চৌধুরীকে নিশীথই পাঠিয়েছে ওর জায়গায় অভিনয় করতে।
চমৎকার! নিশীথের স্বরে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল, চমৎকার। অ্যাক্টিং লাইনে গেলে তোমার সম্ভাবনা দেখছি আমার চেয়েও বেশি!
মিস মুখার্জি, যদি কিছু মনে না করেন, তা হলে এই অদ্ভুত পরিস্থিতির একটা পসিবল সলিউশন আমি করতে চাই। ধরুন ইনিই নিশীথ সান্যাল…।
থাক, নীরেন, আমি জানি তুমি কী বলবে। নীরেন বর্মাকে বাধা দিলেন কর্নেল সেন, কিন্তু সেটা আমি ঠিক এই মুহূর্তেই শুনতে চাই না। আগামীকাল রাতে আমরা প্রথম থেকে শুরু করে সমস্ত অদ্ভুত সমস্যারই সমাধান করার চেষ্টা করব। সারি, কাল সন্ধ্যায় তুই আসবি– আর তোর আসল নিশীথকেও ডেকে আনিস। কারণ, শেষ দৃশ্যে ওর থাকার দরকার আছে।
সভাভঙ্গের স্পষ্ট ইঙ্গিত। সুতরাং একে-একে সকলেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। একমাত্র সারিকা অবুঝের মতো শূন্য দৃষ্টি নিয়ে বসে রইল।
কর্নেল সেন সারিকার মাথায় হাত রাখলেন? নীরেন তোকে যে কথাটা বলতে যাচ্ছিল, সেটা আমিই তোকে বলতে পারি। তখন সবাই ছিল বলে আমি নীরেনকে বাধা দিয়েছি। শোন– সারিকা মুখ তুলে তাকাল ও অ্যালজেব্রার বহু প্রবলেম এক অদ্ভুত উপায়ে সলভ করা হয়। তাকে বলে মেথড অফ ইনভারশন বা বিপরীত অনুপাত পদ্ধতি। এক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে। তুই শুধু নিশীথ সান্যাল আর রূপক চৌধুরীর নামটা ওলটপালট করে দে, তা হলেই দেখবি সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।
সারিকা থরথর করে কেঁপে উঠল। মনে হল হঠাৎই পৃথিবীটা উন্মাদের মতো ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। তারপর আচমকা সব থেমে গেল। ঘরের পরিবেশে নেমে এল নিস্তব্ধতার রাজত্ব।
হ্যাঁ, সারি। তুই যাকে এতদিন নিশীথ ভেবেছিস, সে আসলে রূপক চৌধুরী। আর যাকে তুই রূপক চৌধুরী মনে করেছিস, সে সত্যি-সত্যিই নিশীথ সান্যাল। তা ছাড়া, সে-ই যে আসল তুই তার নানান প্রমাণ পেয়েছিস। নকল নিশীথের কাজগুলো খুঁটিয়ে অ্যানালাইজ করলেই তার জালিয়াতি অতি সহজেই ধরা পড়ে যাবে। মনে করে দেখ, তুই-ই আমাকে বলেছিলি যে, নিউ মার্কেটের দোকানে নিশীথ প্রথমে তোকে চিনতে পারেনি। তুই তাকে ডাকার পর সে ইতস্তত করে এগিয়ে আসে। অর্থাৎ, রোহিত রায়কে অনুসরণ করে সে ওই দোকানটায় ঢোকে। একরাশ নকল পাথরের মধ্যে থেকে আসল পাথরটাকে চিনে নিয়ে সে হয়তো খুঁজে বের করতে পারত, কিন্তু গোলমাল বাঁধালি তুই। তুই ওকে নিশীথ বলে ডাকার পর সে তোর কাছে এগিয়ে আসে। অথচ তোর নাম জানা তো দুরের কথা, তোকে সে জীবনে কোনওদিন দেখেইনি। কিন্তু রূপকের– জানি না, ওটা ওর আসল নাম কি না–উপস্থিত বুদ্ধি আছে। সে তোর হাতের আংটি দেখে বুঝল তোর নামের প্রথম অক্ষর এস। সুতরাং স্বাভাবিক পদ্ধতি অনুযায়ী শর্টে সু নামে তোকে ডাকতে শুরু করল। তুই কিছুটা অবাক হলে সে তোকে একটা ঠাট্টা করে থামিয়ে দেয়।
