কাঞ্চন মৈত্র–। বলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন করলাম, বলুন, আমি আপনাদের কী কাজে লাগতে পারি? ইন্সপেক্টরকে বাঙালি ক্রিশ্চান বলে মনে হল।
আমি এখানকার থানার পুলিশ ইন্সপেক্টর, মুখ খুললেন ক্রসওয়ার্ড, কুমার রণজিতের মিস্টিরিয়াস ডেথের ব্যাপারটা ইনভেস্টিগেট করার ভার আমার ওপর পড়েছে। আপনাকে আমি ঠিক চিনতে পারছি না। আর তা ছাড়া আপনি ঘরে ঢুকেই কুমারের ডেডবডিটা দেখে যেভাবে চোখ কপালে তুললেন…। কথা অসম্পূর্ণ রেখে চোখ নাচালেন ক্রসওয়ার্ড।
এরপর মুখ না খুলে চুপ করে থাকা হবে স্রেফ বোকামি। তাই একটুও সময় নষ্ট না করে বললাম, ইন্সপেক্টর, আমি সুচরিতার বন্ধু। ওয়েল উইশার বলতে পারেন। কুমারের মারা যাওয়ার খবর আমি কাগজেই পড়েছি, কিন্তু তাঁর ডেডবডি দেখে আমার অবাক হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে…।
তারপর প্রথম থেকে শুরু করে সব খুলে জানালাম তাঁকে। অবশ্য ইব্রাহিমের ব্যাপারটা বাদ। দিলাম।
সব শোনার পর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ইন্সপেক্টর। তারপর বললেন, মিস্টার মৈত্র, এবার কাজের কথায় আসা যাক। কাল রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ গাড়ির ইঞ্জিনের আওয়াজ শোনা গেছে। কবুতরের সবাইকেই আমরা প্রশ্ন করেছি, কেউ কিছু বলতে পারেননি। তাই আমরা কবুতরের চারিদিকে খোঁজ নিয়ে জেনেছি যে, একজন লোককে একটা গাড়ি চালিয়ে বারোটা সোয়া বারোটা নাগাদ কবুতরের দিকে যেতে দেখা গেছে। আপনাকে দেখে আমিও কম অবাক হইনি। কারণ, আপনার সঙ্গে সেই অপরিচিত লোকটির ডেসক্রিপশন প্রায় মিলে যাচ্ছে…।
কী…। ইন্সপেক্টরকে বাধা দিয়ে বলতে গেলাম আমি। কিন্তু ক্রসওয়ার্ড বাধা দেওয়ায় আমার চাইতেও বেশি এক্সপার্ট। তিনি চটপট বলতে শুরু করলেন, সেটাই সব নয়। আমরা কবুতরের সুরকি ঢালা পথে একসারি জুতোর ছাপ পেয়েছি। ছাপগুলোর মধ্যে দূরত্ব বেশি এবং তাদের ডেস্থ দেখে আমরা আন্দাজ করছি যে, গত রাতে যেই এসে থাকুক না কেন, সে দৌড়েছিল। কবুতরের প্রত্যেকের জুতোর ছাপ আমরা নিয়েছি। আমার মুখের দিকে চেয়ে হাসলেন ক্রসওয়ার্ড, হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। কারও সঙ্গে সেই ছাপ মেলেনি। এখন আপনার জুতোর সঙ্গে যদি এই ছাপটা না মেলে তবে আমাদের আরও ভালো করে প্রোব করে দেখতে হবে…। একটু থেমে দম নিলেন ক্রসওয়ার্ড।
আমি মাথা ঝুঁকিয়ে বললাম, লুক হিয়ার, ইন্সপেক্টর। শুধু-শুধু আপনাদের পরিশ্রম আর খরচ বাড়িয়ে লাভ নেই। আমিই সেই রাতের আগন্তুক। আমিই এসেছিলাম কবুতরে।
ইন্সপেক্টর অবাক-টবাক কিছুই হলেন না। অল্প-অল্প হাসতে লাগলেন।
অত্যন্ত বিরক্ত হলেও বিরক্তি চেপে বললাম, মিস্টার ক্রসওয়ার্ড, ইফ ইউ ওয়ান্ট মাই কো অপ দেন প্লিজ স্টপ লাফিং। তারপর কাল রাতে যা-যা হয়েছিল সব খুলে বললাম।
ইব্রাহিমের পকেট থেকে পাওয়া সেই চিরকুটটার কথা চেপে গিয়ে বললাম, আমি সন্দেহ করেছিলাম যে, কবুতরে একটা কিছু ঘটতে চলেছে। তাই শখের গোয়েন্দাগিরির নেশাতেই কবুতরের ওপর লক্ষ রাখতে গত রাতে এসেছিলাম।
জানি না আমার ব্যাখ্যাটা কতটা জোরদার হল। কিন্তু ইন্সপেক্টরের মুখ দেখে মনে হল তিনি আমার কথা মোটামুটি বিশ্বাস করেছেন।
হঠাৎই মুখ তুলে বললেন তিনি, মিস্টার মৈত্র, একটা প্রশ্ন করব–ভালো করে ভেবে উত্তর দিন।
আমি সপ্রশ্ন দৃষ্টি নিয়ে তাকালাম তার দিকে।
আপনি কি শিয়োর যে, জানলাটা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল?
হ্যাঁ, দৃঢ়স্বরে জবাব দিলাম আমি, আমি গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ওটা টানাটানি করেছিলাম। কিন্তু নড়াতেই পারিনি। বলতে বলতে আমি লাইব্রেরির তিনটে জানলার মধ্যে বাঁদিকেরটা দেখিয়ে বললাম, ওই তো, ওই জানলাটা।
কিন্তু এইখানেই একটা মুশকিল দেখা দিয়েছে, কাঞ্চনবাবু। আজ যখন আমরা এই ঘরে আসি তখন শুধু একটা জানলা খোলা ছিল এবং ওই জানলাটাই।
আশ্চর্য, বললাম আমি, তা হলে নিশ্চয়ই যে খুন করেছে, সে এটাই বোঝাতে চেয়েছে যে, খুনি বাইরের লোক। জানলা দিয়ে এসে খুন করে আবার জানলা দিয়েই চলে গেছে।
ঠিকই ধরেছেন আপনি, বললেন ইন্সপেক্টর, কিন্তু জানলায় আপনার ছাড়া আর কারও হাতের ছাপ পাওয়া যায়নি। তবে আপনার হাতের ছাপগুলো আপনার কথামতো শুধু বাইরের দিকেই ছিল।
আমি চেয়ারে একটু নড়েচড়ে বসলাম, বললাম, মার্ডার ওয়েপনটা পেয়েছেন?
নাঃ, জানালেন ইন্সপেক্টর, সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও আমার লোকেরা রিভলভারটা বের করতে পারেনি। তবে আশা করি দিনকয়েকের মধ্যেই খুঁজে পাব। আচ্ছা, নমস্কার–আপনি এখন যেতে পারেন। পরে যদি দরকার হয় আপনার সঙ্গে কথা বলবখন।
কোনওরকমে নমস্কার জানিয়ে শ্লথ পায়ে দরজার দিকে এগোলাম।
সুচরিতা এতক্ষণ চুপ করে বসেছিল। আমার পেছন-পেছন সেও বেরিয়ে এল বাইরে।
বাইরে এসে আমি বললাম, সুচরিতা, কবুতরে যারা রয়েছেন তাদের নামের একটা লিস্ট আমাকে দাও।
সুচরিতা বলল, মানেকজি, প্রসাদজি, তরুণ সান্যাল–মানেকজির সেক্রেটারি। শ্রীনরসিংহ চৌধুরী আর কিরণ শর্মা। এঁরা হলেন লয়ালিস্টদের তরফের। কিরণ শর্মা কুমার রণজিৎকে ফাইনান্স করতে রাজি ছিলেন। নয়না কল্যাণী এবং সর্বেশ্বর রায়–তেলের ব্যাপারটায় এঁর স্বার্থ ছিল। এঁরা ছাড়া কুমারের একজন নেপালি চাকর আর কবুতরের কাজের লোকজন।
আমার মনে নামগুলো গেঁথে গেল। বললাম, সাতকাণ্ড রামায়ণ পড়া শুরু করব এবার। প্রথম কাণ্ড হলেন নয়না কল্যাণী।
