আমার বরাবরের চেষ্টা ছিল চুনিটা ফেরত দেওয়া। তাই রোহিতকে আমিও ফলো করতাম। সেদিন নিউ মার্কেটের ওই দোকানে আমি ঢুকেছিলাম রোহিতকে ফলো করে। তার পরের ঘটনা তো তুমি সবই জানো থামল নিশীথ। সারিকা চুপচাপ কী ভাবতে লাগল। তারপর আচমকা জিগ্যেস করল, রোহিতকে কে খুন করেছে?
সারিকার স্বরে চমকে উঠল নিশীথ। অবাক হয়ে বলল, তুমি নিশ্চয়ই আমাকে সন্দেহ করছ না। তোমার মনে আছে, যখন সেই অ্যাক্সিডেন্টটা হয়, তখন তুমি আমার সঙ্গে ছিলে? তা হলে তুমিই বলো, আমাকে সন্দেহ করার কোনও মানে হয়। তা ছাড়া রোহিত আমার ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিল।
সারিকার মুখ থেকে সংশয়ের ভাবটা কেটে গিয়ে হাসি ফুটে উঠল তোমাকে আমি বিশ্বাস করলাম, নিশীথ।
সু, এবার চুনিটা আমাকে দাও। সেদিন তুমি যে কখন ওটা বাক্স থেকে নিয়ে গলায় পরেছিলে, আমি টেরই পাইনি। পরে বাইরে বেরিয়ে দেখি বাক্সটা খালি।
চুনিটা আমার কাছে নেই, নিশীথ।
তা হলে কার কাছে? নিশীথ উদগ্রীব, আমি চাই না, ওই পাথরটার জন্যে কেউ বিপদে জড়িয়ে পড়ুক।
সারিকা ভাবছিল কর্নেল সেনের কথা। প্রাণ থাকতে চুনিটার সন্ধান কাউকে জানাতে তিনি বারণ করেছেন। কাউকে নয়।
তা হলে সারিকা কি নিশীথকে বলে দেবে, ওটা কর্নেল সেনের কাছে আছে? নাকি।
কী হল–জবাব দাও! চুপ করে থেকো না। নিশীথ একেবারে অধৈর্য হয়ে উঠেছে।
চুনিটা চুরি গেছে। সারিকা গত সন্ধ্যার কাহিনি খুলে জানাল নিশীথকে। শেষে বলল, এই একই কথা প্রেমনাথ ধর আমাকে জিগ্যেস করছিলেন কাল রাতে। কে যে ওটা চুরি করেছে বলা মুশকিল। আমার মনে হয়, আনন্দ কাপুরই হয়তো পাথরটা সরিয়েছেন।
মিনিটদুয়েক গুম হয়ে রইল নিশীথ। তারপর আপন মনেই বলে উঠল, যে করেই হোক বহ্নিশিখা আমার চাই।
সারিকা অবাক চোখে চেয়ে রইল নিশীথের মুখের দিকে। দেখল, ওর চোয়াল কেমন শক্ত হয়ে উঠেছে।
সু, যদি চুনিটার কোনও খোঁজ পাও, তা হলে এই নম্বরে আমাকে ফোন করে জানাবে। একটা কাগজে খসখস করে একটা ফোন নম্বর লিখে সারিকার হাতে তুলে দিল নিশীথ ও আমাকে এখন কিছুদিন লুকিয়ে থাকতে হবে।
হঠাৎই নকল নিশীথের কথা মনে পড়ল সারিকার। ও তাড়াতাড়ি বলে উঠল, নিশীথ, একটা মজার ব্যাপার তোমাকে জানাতে একদম ভুলে গেছি। তুমি উধাও হওয়ার একদিন পর আর একজন লোক এসে তোমার ফ্ল্যাট দখল করেছে। বলছে, সে-ই নিশীথ সান্যাল। তার সঙ্গে তোমার চেহারার কিছুটা মিল আছে তা ঠিক। কিন্তু আমি সঙ্গে-সঙ্গেই ধরে ফেলেছি লোকটা জালিয়াত। তাই পুলিশে খবর দিয়েছি। কিন্তু আশ্চর্য, লোকটা সবরকম টেস্টেই অদ্ভুতভাবে উতরে যাচ্ছে। এমনকী তোমার সঙ্গে তার হাতের লেখা পর্যন্ত মিলে গেছে। তবে আমি এখনও হাল ছাড়িনি। কাল সকালেই আছে এক চরম অ্যাসিড টেস্ট। তোমার দিদি কাল আসছেন নকল নিশীথকে শনাক্ত করতে।
সর্বনাশ করেছ, সু! ভীষণভাবে চমকে উঠল নিশীথ, ওই লোকটার নাম রূপক চৌধুরী। ওকে আমিই পাঠিয়েছি। কারণ, আমার অ্যাবসেন্স বিশেষ কয়েকজনের চোখে পড়ুক, তা আমি চাইনি।
কিন্তু এখন আর কোনও উপায় নেই, নিশীথ। তীর আমার হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে। কাল সকাল দশটায় রূপক চৌধুরী ধরা পড়বেই।
নিশীথ চিন্তান্বিতভাবে বলল, সব কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। আমি কী যে করব, কিছুই ভেবে পাচ্ছি না…আচ্ছা, সু, আমি চলি। চুনিটার কোনও হদিস পেলে আমাকে ফোন করতে ভুলো না।
সারিকার হাতে আস্তে চাপ দিয়ে হাসল নিশীথ। তারপর এগিয়ে গেল দরজার দিকে।
ও চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল সারিকা। সত্যিই, পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে পড়ছে। রূপক চৌধুরীকে নিশীথই তা হলে পাঠিয়েছে। কিন্তু কেন এই লুকোচুরি?
ভাবতে-ভাবতে ঘুমে চোখ বুজে এল সারিকার। কোনওরকমে উঠে দাঁড়াল ও। দরজা বন্ধ করে পা বাড়াল রান্নাঘরের দিকে।
অনন্যাদেবী যদি সত্যিই কাল সকালে এসে পড়েন, তা হলে রূপক চৌধুরীকে বাঁচানোর কোনও রাস্তা সারিকা দেখতে পাচ্ছে না। ধরা তাকে পড়তেই হবে।
জারিনের কথা ভেবে দুঃখ হল সারিকার।
.
১২.
দশটা বাজতে তখনও মিনিটকয়েক বাকি।
কর্নেল সেনের বসবার ঘরে সারিকা বসে। বুকে একরাশ উৎকণ্ঠা।
অনন্যাদেবী এখনও এসে পৌঁছননি। আসেনি রূপক চৌধুরীও।
গায়ে চাদর জড়িয়ে বসে একটা গল্পের বই পড়ছিলেন কর্নেল সেন। পাশেই একটা চেয়ারে বসে নীরেন বর্মা। আনন্দ কাপুর আপনমনে কার্পেটের ওপর পায়চারি করছিলেন–একটু অধৈর্যভাবে।
সারিকা এসেছে সবার আগে। এসেই গতকাল রাতে আসল নিশীথের সঙ্গে ওর কথাবার্তার কথা বলেছে কর্নেল সেনের কাছে। তিনি শুধু চুপচাপ মাথা নেড়েছেন। হয়তো কিছু একটা আন্দাজও করেছেন, কিন্তু সারিকাকে কিছু বলেননি।
এরপর এসেছেন নীরেন বর্মা এবং আনন্দ কাপুর। কর্নেল সেনই ওঁদের দুজনকে ফোনে ডেকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু ডেকে আনার উদ্দেশ্য বা আসন্ন নাটক সম্পর্কে কোনও আভাস ওঁদের দেননি।
এমন সময় দরজায় কলিংবেল বেজে উঠল। ডক্টর কাপুরই এগিয়ে গেলেন। দরজা খুলে দিলেন।
ঘরে যিনি প্রবেশ করলেন, তাকে চিনতে সারিকার অসুবিধে হল না। কারণ অনন্যা রায়ের পরিচয় রোজকার খবরের কাগজের মাধ্যমে কম-বেশি সকলেরই জানা।
ভদ্রমহিলার চেহারা একটু ভারির দিকেই। সিঁথির সিঁদুর কষ্ট করে দেখতে হয়। সাজগোজ তেমন দৃষ্টিকটু নয়। চোখে চশমা, হাতে শান্তিনিকেতনী ব্যাগ।
