শেষ পর্যন্ত পাতিল ম্যানসনে ঢুকতেই কিছুটা ভরসা পেল সারিকা। লিফটে উঠে চটপট বোতাম টিপল। এই মুহূর্তে যন্ত্রের চেয়ে মানুষের ভয়টাই ওর কাছে বেশি হল। মনে হল, ছতলা যেন আর আসতেই চায় না।
মনে হল, এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নিজের ল্যান্ডিংয়ে ও পা রাখল। অবাক চোখে দেখল, ওদের ঘরের দরজার ওপর ঝুঁকে রয়েছে একটা লোক। বারান্দার আলো পড়েছে তার পিঠে, গায়ের জামায় এবং তার ফুলহাতা জামায় লাগানো ধাতব কাফলিঙ্কের ওপর।
সারিকার হৃৎপিণ্ড উন্মাদের মতো ঘুরপাক খেয়ে আচমকা থামল। কাঁপতে লাগল থরথর করে। ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা চাপা অস্ফুট আর্তনাদ।
সেই শব্দে চমকে সোজা হয়ে দাঁড়াল আগন্তুক। ঘুরে তাকাল। তার বাঁ-গালের ছোট্ট আঁচিলটা উত্তেজনায় কাঁপছে।
সারিকা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। এ কদিনের অষ্টপ্রহর দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ, সমস্ত কিছু ভাবাবেগের জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়ে ও বলে উঠল, নিশীথ–তুমি তা হলে ফিরে এসেছ! এ কদিন কোথায় ছিলে! জানো, সবাই আমাকে…।
আর কথা শেষ করতে পারল না সারিকা–শরীর এলিয়ে পড়ে গেল।
কিন্তু ঝাপসাভাবে ও যেন দেখল, অনুভব করল, দুটো বলিষ্ঠ হাতের আশ্বাস, আশ্রয়, ওকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। বোজা চোখের ওপর আঙুলের উষ্ণ স্পর্শ অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে চেতনা হারাল সারিকা।
.
১১.
সারিকা যেন স্বপ্নের ঘোরে সাগরের অতলে তলিয়ে গিয়েছিল। ওর শ্রান্ত ক্লান্ত দেহটা বুদবুদের মতো ধীরে-ধীরে ভেসে উঠতে লাগল চেতনার জগতে।
ওর জ্ঞান যখন ফিরল, বিস্ময় তখনও ওর পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। ব্যাপারটা যে অলীক অথবা মিথ্যে স্বপ্ন নয়–সেটা ও বুঝতে পারল নিশীথের স্পর্শে। ও এমন দৃষ্টিতে নিশীথকে দেখতে লাগল, যেন দীর্ঘ কয়েক বছর পর সে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
নিশীথ হাসলঃ ভয় নেই, আমি এসে গেছি।
সারিকার স্বপ্নের ঘোর তখনও কাটেনি। ও শূন্য দৃষ্টিতে চারপাশে দেখতে লাগল।
ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা মুখগুলো ক্রমশ চেনা হয়ে যেতে লাগল।
মা, পিসিমা, পিসেমশাই, সম্রাট আর নিশীথ।
ওঃ, নিশীথ, কতদিন পরে তোমাকে দেখলাম।
অনেকক্ষণ পর ঘরটাকে নিজেদের ড্রইংরুম বলে চিনতে পারল সারিকা। ও তাড়াতাড়ি উঠে বসল। দেখল, এতক্ষণ ও ড্রইংরুমের সোফায় শুয়ে ছিল।
মা সঙ্গে-সঙ্গে এক গ্লাস জল ওর সামনে ধরে দিলেন : এই জলটুকু খেয়ে নে, ভালো লাগবে।
পিসেমশাই বললেন, আমি ডক্টর ভট্টাচার্যকে খবর দিচ্ছি।
পিসিমা বললেন, চল, ভেতরের ঘরে নিয়ে গিয়ে তোকে শুইয়ে দিই…।
সারিকা কোনও কথা বলতে পারছিল না। ঘরের উজ্জ্বল আলোয় ওর চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল।
মা আর পিসিমা ওকে সাবধানে ধরে-ধরে শোওয়ার ঘরের দিকে নিয়ে গেলেন।
সারিকা একবার ঘাড় ঘুরিয়ে নিশীথের দিকে তাকাল। সমস্ত লাজলজ্জা ভুলে সকলের সামনে আকুলভাবে ডেকে উঠল, নিশীথ!
নিশীথ আশ্বাসের হাসি হাসল, বলল, আজ শুধু বিশ্রাম। কাল সব কথা হবে।
পিসেমশাই নিশীথকে বললেন, ভাগ্যিস আপনি ছিলেন। তা না হলে একটা বিরাট বিপদ হতে পারত।
নিশীথ সৌজন্যের হাসি হেসে বলল, আসলে ও বোধহয় খুব টেনশনে আছে। কাল সকালে আমি এসে ওর সঙ্গে কথা বলব। তা হলেই বুঝতে পারব কীসের জন্যে এত টেনশন।
পিসেমশাই আনমনাভাবে বললেন, আমি কিছু-কিছু শুনেছি। আপনি কথা বলে দেখুন।
নিশীথ আসি বলে চলে গেল।
.
পরদিন নিশীথের সঙ্গে আলাদা কথা বলতে বসল সারিকা।
চা-বিস্কুটের পালা শেষ হতেই ও কোনওরকম ভূমিকা না করে সরাসরি প্রশ্ন করল, এ দু-দিন তুমি কোথায় ছিলে?
সবই বলছি, সু৷ নিশীথের কণ্ঠে ব্যগ্র সুর : কিন্তু তার আগে আমি জানতে চাই, যে পাথরটা তুমি নিউ মার্কেট থেকে কিনেছিলে, সেটা কোথায়?
সারিকা ভীষণভাবে একটা মানসিক ধাক্কা খেল। একটা অজানা সংশয় ওর মনের গহনে ছায়া ফেলে গেল। গলার স্বরকে সংযত করে সংক্ষিপ্তভাবে ও জবাব দিল, কিন্তু সে কথা বলার আগে তোমার এই উধাও হওয়ার কারণ আমার জানা দরকার।
রাগ কোরো না, সু। ওকে বোঝাতে চাইল নিশীথ ও সেসব কথা বলে তোমার বিপদকে আমি আর বাড়াতে চাই না। শুধু-শুধু তুমি।
চুনিটার নাম বহ্নিশিখা। ওই পাথরটার জন্যেই রোহিত রায় খুন হয়েছে। আমি সবই জানি, নিশীথ। সারিকা শান্ত স্বরে বলল।
আকস্মিক ভূমিকম্পেও বোধহয় এতটা চমকে উঠত না নিশীথ। বিস্ময়ে তার চোখজোড়া বুঝি ছিটকে বাইরে বেরিয়ে আসবে।
তুমি তুমি কী করে জানলে!
বললাম তো, আমি সবই জানি। শুধু জানি না, প্রেমনাথ ধর, সুখেন বর্মা আর রোহিত রায়ের মধ্যে তুমি কেমন করে আসছ।
নিশীথ বিস্ময়ে বোবা।
বেশ কিছুক্ষণ মাথা ঝুঁকিয়ে কী যেন ভাবল নিশীথ। অনুভব করল, ওর দিকে সারিকার স্থির দৃষ্টি।
তারপর হঠাৎ একসময় ও মুখ খুলল, রোহিত রায় আমার বন্ধু ছিল। কাশ্মীর থেকে পাথরটা যখন ও এখানে নিয়ে আসে তখন আমি জানতে পারি, ওটা কোত্থেকে কীভাবে রোহিতের হাতে এসেছে। তার কিছুদিন পর রোহিতের মুখে শুনলাম, পুলিশ ওর পিছু নিয়েছে। আমি ওকে বারবার বোঝালাম, পাথরটা জায়গামতো ফেরত দিয়ে দেওয়া উচিত। তা ছাড়া, ওই চুনিটা কোথাও বিক্রি করা ওর পক্ষে অসম্ভব। কারণ, কলকাতার ইনটেলিজেন্স ডিপার্টমেন্টও চুনিটার খোঁজে ক্ষিপ্ত হাউন্ডের মতো ঘুরছে। এরপর অবস্থা আরও জটিল হল–আরও দুটো দল এসে হাজির হল চুনির সন্ধানে। তার মধ্যে একজন কাশ্মীরের এজেন্ট–প্রেমনাথ ধর। আর দ্বিতীয়জনের পরিচয় আমি জানি না। শুধু জানি মারা যাওয়ার কয়েকদিন থেকে রোহিত ভীষণ ভয়ে ভয়ে ছিল। ও বলত একটা অদ্ভুত শব্দ নাকি ওকে অষ্টপ্রহর ফলো করে বেড়ায়। সেই শব্দের মালিককে ও কখনও চিনতে পারেনি। একবার ভাবত পুলিশ, আবার ভাবত, হয়তো অন্য কেউ।
