বহ্নিশিখা চুরির ব্যাপারে উনি কিন্তু আপনাকেই সাসপেক্ট করছেন।
কী? এতবড় সাহস! রাগে ফেটে পড়লেন ডক্টর কাপুর ও পাথরটা যদি কেউ চুরি করে থাকে, তো ওই আনঅর্থোডক্স বিজনেস ম্যানটাই করেছে! জানেনই তো, কিউরিয়ো কেনা বেচার লাইনটাই দুনম্বরি! খবরদার, ওই লোকটার সঙ্গে বিশেষ মেলামেশা করবেন না। ব্যাটা কথায় লোককে ভোলাতে ওস্তাদ।
সারিকা মনে-মনে হাসল। ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন নামিয়ে রাখল।
সারা সন্ধেটা কীভাবে কাটাবে ভেবে পেল না সারিকা। কাজ যখন নেই, তখন ইন্সপেক্টর দেশাইয়ের সঙ্গে একবার দেখা করলে কেমন হয়?
যা ভাবা সেই কাজ। ফোন তুলে থানায় যোগাযোগ করল ও। শুনল ইন্সপেক্টর দেশাই থানাতেই আছেন। বাইরের পোশাক ওর পরাই ছিল। সুতরাং মাকে ম্যানেজ করে বেরিয়ে পড়ল সারিকা। বলে গেল, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফিরে আসবে।
ফ্ল্যাটের বাইরে আসতেই দেখল নিশীথ আর জারিন আগরওয়াল সিঁড়ি ভেঙে ওপর থেকে নেমে আসছে।
সারিকার দিকে চোখ পড়তেই মুখ ঘুরিয়ে নিল জারিন। নিশীথ কিন্তু হাসল; সারিকা, তোমার রাগ এখনও পড়েনি বলে মনে হচ্ছে?
পড়েছে! অভিসন্ধি নিয়ে হাসল সারিকা ও আমি আর তোমাকে নকল বলে সন্দেহ করছি না। তখন কী যে হয়েছিল হঠাৎ…।
যাক বাবা, বাঁচালে নিশীথও হাসল। কারণ হাসি সংক্রামক বিশেষ করে কোনও প্রমীলার উপস্থিতিতে।
নিশীথ, কাল সকাল দশটায় এক জায়গায় তোমাকে আমি নিয়ে যাব। আশা করি তোমার আপত্তি হবে না?
কোথায়? প্রেসিডেন্সি জেলে?
না। আমার এক কাকা কর্নেল বিক্রম সেনের বাড়িতে। সারিকার মুখে দুষ্টুমির হাসিঃ তিনি বলেছেন, এত ঝড়-ঝাপটার নায়কটিকে তিনি একটিবার দেখতে চান।
নিশীথ সানন্দে ঘাড় নাড়ল : রাজি। তবে ডান হাতের ব্যাপার-ট্যাপারের কথা তোমার কাকাকে মনে করিয়ে দিয়ো। কারণ, অনশনে আমি অভ্যস্ত নই।
নিশীথ এবং সারিকার হাসিতে জারিনও যোগ দিল। মনে হল, ও আগের চেয়ে অনেকটা সহজ হয়ে এসেছে।
ওদের পাশ কাটিয়ে লিফটের কাছে গিয়ে দাঁড়াল সারিকা। বোতাম টিপে এলিভেটর উঠে আসার অপেক্ষায় রইল।
নিশীথ সুযোগ পেয়ে রসিকতা করতে ছাড়ল না, কী ব্যাপার, তোমার যন্ত্র-আতঙ্ক তা হলে কমেছে।
না, কমেনি। তবে উপায় কী?…তা ছাড়া, আগামী অলিম্পিকের ওয়েট লিফটিংয়ে আমি নাম দিচ্ছি না। সুতরাং ছতলা সিঁড়ি ভেঙে ওঠা-নামা করে লাভ নেই।
এলিভেটরে উঠে বোতাম টিপল সারিকা। যন্ত্রযান নিঃশব্দে নামতে শুরু করল। সেই সঙ্গে সারিকার চিন্তাও নিঃশব্দে এগোতে শুরু করল।
কাল সকালে কর্নেল সেনের বাড়ি যাওয়ার ব্যাপারে নিশীথকে রাজি করাতে পেরেছে বলে প্রথমে ও খুশি হল। কিন্তু পরক্ষণেই ওর মনে হল এই নিশীথ যদি আসল নিশীথ না হয়, তা হলে সে ওর লিফট-আতঙ্কের কথা জানল কেমন করে! সারিকার স্পষ্ট মনে আছে, ওর এই যন্ত্র-আতঙ্কের মনস্তত্ত্বের কথা নিশীথ ছাড়া বাইরের আর কেউ জানত না। তা হলে?
থানায় পৌঁছে দরজার দাঁড়ানো কনস্টেবলকে ইন্সপেক্টর দেশাইয়ের নাম বলল সারিকা। লোকটা যেভাবে ওর আপাদমস্তক জরিপ করল তাতে মনে হল সে জীবনে এই প্রথম কোনও যুবতাঁকে দেখছে।
আধমিনিট পর্যবেক্ষণের পর সে সংবিৎ ফিরে পেল। বলল, আসুন।
হয়তো কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর জেনারেল হওয়ার আশায় লোকটি পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা নিয়ে চর্চা করছে। উন্নতি করার একমাত্র অস্ত্র।
কনস্টেবলকে অনুসরণ করে ইন্সপেক্টর দেশাইয়ের ঘরে এসে ঢুকল সারিকা। সারিকাকে ওপরওয়ালার ঘরে পৌঁছে দিয়ে যেন বিরাট একটা উপকার করে গেল, এরকম মুখভাব করে সে বেরিয়ে গেল।
বিরলকেশ মস্তকে একবার হাত চালিয়ে ইন্সপেক্টর দেশাই বললেন, বসুন, মিস মুখার্জি খবর আছে।
সারিকা একটা চেয়ার দিয়ে টেবিলের এ-প্রান্তে ইন্সপেক্টর দেশাইয়ের দিকে মুখ করে বসল।
টেবিলে রাখা পেপারওয়েটটাকে দশ আঙুলে নাড়াচাড়া করতে করতে ইন্সপেক্টর দেশাই সারিকার দিকে চোখ তুলে তাকালেন ও মিস মুখার্জি, নিশীথ সান্যালের আইডেন্টিফিকেশন সম্পর্কে আমার মনে আর কোনও সন্দেহ নেই। কারণ আঙুলের ছাপ আর হাতের লেখা মিলিয়ে দেখার কাজটা আমি ফেলে রাখিনি–আজই সেরে ফেলেছি। আপনার সমস্ত সন্দেহ ভুল।
আমি নিশীথের হাতের লেখা মোটামুটি চিনি। সুতরাং এই জাল নিশীথের হাতের লেখাটা যদি আমাকে একটু দেখান, তা হলে হয়তো চিনতে পারব–আসল কি নকল।
চলুন–আমার কোনও আপত্তি নেই। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ইন্সপেক্টর দেশাই? আই হোপ ইউ উইল চেঞ্জ ইয়োর মাইন্ড।
.
হতাশ ও বিভ্রান্ত সারিকা যখন চক্রবেড়িয়া রোডে পা দিল, রাত তখন পৌনে নটা। এই মুহূর্তে নিশীথের পরিচয় নিয়ে সারিকা বেশ দ্বিধায় পড়েছে। ইন্সপেক্টরের দেখানো সাক্ষ্য প্রমাণ ও নিজের চোখে দেখেছে। দুজনের আঙুলের ছাপে বা হাতের লেখায় এতটুকু ফারাক নেই। কিন্তু তা হলেও সংশয়ের ছায়াটা সারিকার মন থেকে এখনও পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। শেষে হয়তো দেখা যাবে…।
সারিকার কানের পরদা কেঁপে উঠল সুপরিচিত যতি ও গতির ছন্দে। মর্স কোডের প্রথম অক্ষরটা যেন ছায়ার মতো ওকে অনুসরণ করছে। এ-অঞ্চলে রাস্তাঘাট এমনিতেই নির্জন থাকে। তার ওপর শীতের রাতে লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে। পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে কাউকে দেখতে পেল না ও। শুধু চলার গতি বাড়িয়ে দিল। কিন্তু ওই অদ্ভুত শব্দটা ওর সঙ্গে আঠার মতো লেগে রইল।
