সারিকার থমথমে মুখে ধীরে-ধীরে হাসি ফুটল। সমস্ত ঘটনার তাৎপর্য ক্রমশ স্পষ্ট হল ওর কাছে। কর্নেল সেন যে ওকে বাঁচানোর জন্যই চুনিটা লুকিয়েছেন, সে-বিষয়ে ওর মনে আর কোনও সন্দেহই রইল না।
একটা ব্যাপারে তোকে কথা দিতে হবে। কর্নেল সেন বলে চললেন, তুই এই বহ্নিশিখার সন্ধান কাউকেই আর বলবি না। এটা যে আমার কাছে আছে, তোর মুখ থেকে একথা যেন না বেরোয়। আমাকে কথা দে।
কথা দিলাম। হাসল সারিকা তবে একটা জিনিস আমি আজ আবিষ্কার করেছি, কাকু। যত রাজ্যের গোয়েন্দাকাহিনি পড়ে-পড়ে তুমি নিজেও একজন পাকা গোয়েন্দা হয়ে উঠেছ।
তার আরও পরিচয় আগামীকাল সকালে তুই পাবি। একটা সাঙ্ঘাতিক কিছুর জন্যে নিজেকে তৈরি করে রাখ।
সারিকা স্থির চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল কর্নেল সেনের মর্মভেদী নজরের দিকে। তারপর বলল, আমি এখন তা হলে যাই, টেলিগ্রামটা করে দিই গিয়ে..।
বিদায় নিয়ে সারিকা এসে নামল রাস্তায়। ওর মনে বয়ে চলল চিন্তার ঝড়। হারানো বহ্নিশিখাকে ঘিরে যেন ছত্রিশ লোকের জটলা। প্রেমনাথ ধর, নীরেন বর্মা, আনন্দ কাপুর, মেরিয়ন, নকল এবং আসল নিশীথ সান্যাল, জারিন আগরওয়াল। কিন্তু এর জট কে খুলবে?
এ পর্যন্ত সারিকা শুধু জেনেছে বহ্নিশিখার ইতিহাস আর প্রেমনাথ ধরের পরিচয়–অবশ্য তার বলা কাহিনি যদি সত্যি হয়। তা ছাড়া হারানো চুনির জন্যই মারা গেল রোহিত রায়। কে খুন করল তাকে? কেন খুন করল? বহ্নিশিখার জন্য? নীরেন বর্মা আর ডক্টর আনন্দ কাপুর দুজনে চুনিটা চুরির ব্যাপারে পরস্পরকে সন্দেহ করছেন। এ কি শুধুই সন্দেহ? নাকি এর পিছনে যুক্তিগ্রাহ্য তথ্য আছে? তার ওপর রয়েছে নকল এবং আসল নিশীথের জটিল সমস্যা, অনুসরণকারীর সেই ছন্দোময় অদ্ভুত অনুসরণ।
সারিকা হার মানল। না, এ-জটিলতার সমাধান করা ওর পক্ষে অসম্ভব। রাস্তার যান্ত্রিক পরিবেশে মনকে ভাসিয়ে দিয়ে বাস স্টপের দিকে হেঁটে চলল সারিকা।
টেলিগ্রামের কাজ সেরে যখন ও বাড়ি ফিরল তখন সন্ধ্যা হয়-হয়। শীতের হাওয়া অভ্যস্ত ভঙ্গিমায় তার রাজত্ব বিছিয়ে দিচ্ছে।
টেলিগ্রাম পেয়ে অনন্যাদেবী আসবেন কি না কে জানে! তবে কর্নেল সেনের দশহাজার টাকা চাঁদা দেওয়ার ইচ্ছেটা তার কাছে নেহাত অগ্রাহ্য করার মতো হবে বলে মনে হয় না।
এলিভেটরে উঠে সুইচ টিপল সারিকা।
নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল যন্ত্রযানের দরজা। শুরু হল আরোহণ।
সারিকার বুকটা অনিশ্চয়তায় বারকয়েক কেঁপে উঠল। ভাবল, যেখানে মানুষকে বিশ্বাস করাটাই মুশকিল, সেখানে মানুষের তৈরি একটা যন্ত্রকে বিশ্বাস কী! যদি এই মুহূর্তে এটা বন্ধ হয়ে যায়! তখন কে শুনতে পাবে সারিকার চিৎকার! এলিভেটরের দরজার ফ্রেমে মোটা রবারের লাইনিং দেওয়া রয়েছে। সেটা ভেদ করে কোনও শব্দ বাইরে বেরোবে বলে মনে হয় না।
কিন্তু সারিকার সমস্ত দুশ্চিন্তাকে মিথ্যে প্রমাণ করে ছতলায় এসে এলিভেটর থামল।
আজ করিডরের আলো ঠিক মতোই জ্বলছে। এগিয়ে গিয়ে ফ্ল্যাটের দরজায় নক করল সারিকা।
পিসিমা দরজা খুলে দিলেন। ওকে দেখেই জিগ্যেস করলেন, কীরে, এত দেরি হল! আমরা এদিকে চিন্তা করছি…।
সারিকা হেসে বলল, এখন আর চিন্তার কিছু নেই। কর্নেলকাকুর বাড়িতে গিয়েছিলাম। উনি সব প্রবলেম সম্ভ করে দেবেন বলেছেন।
সারিকা ভেতরের ঘরের দিকে পা বাড়াচ্ছিল, কিন্তু ঠিক তখনই টেলিফোন বেজে উঠল।
সারিকা মনে এক অপ্রত্যাশিত আঁকুনি খেল। কে ফোন করছে! নিশীথ নয় তো? হয়তো ও কোনও বিপদে পড়েই সারিকাকে ফোন করছে। হয়তো এই মুহূর্তে ওর সাহায্যের প্রয়োজন।
কিন্তু ফোন তুলতেই ওর ধারণা এবং আশঙ্কা আরও একবার মিথ্যে বলে প্রমাণিত হল। কারণ ডক্টর কাপুরের স্বরের তারল্য সারিকার কানে ধরা পড়ল হ্যালো বলামাত্রই।
আশা করি আমার রং নাম্বার হয়েছে? ও-প্রান্তের কণ্ঠ ভেসে এল দূরভাষে।
উত্তরে নিজের ফোন নম্বর বলল সারিকা।
অসম্ভব! ডক্টর কাপুরের স্বরে একরাশ বিস্ময়, এরপর আপনি হয়তো বলে বসবেন আপনার নাম সারিকা মুখার্জি?
আপনি আমার নাম জানলেন কেমন করে! ঠাট্টা করে বলল সারিকা।
মাই গড! অবশেষে আপনাকে পাওয়া গেল! আমি আনন্দ কাপুর বলছি।
আমিও সেইরকম আন্দাজ করেছিলাম। কিন্তু প্রথমে অমন অসম্ভব, অসম্ভব, বলছিলেন কেন? আমাকে কি এক্সপেক্ট করেননি?
আর বলবেন না। গত আধঘণ্টা ধরে পাঁচ মিনিট অন্তর-অন্তর আপনার নম্বরে ফোন করে যাচ্ছি। রেজাল্ট তো বুঝতেই পারছেন! তাই আপনি যখন ফোন তুললেন, তখন ভাবলাম– নির্ঘাত রং নম্বর হয়েছে।
সারিকা হাসলঃ হঠাৎ এত জরুরি টেলিফোন? প্রয়োজনটা কী?
প্রয়োজনটা গুরুতর–এবং আপনাকে জড়িয়েই। কাল রাতে আমি আপনাকে ফলো করেছিলাম। কারণ, শুনেছিলাম ওই পাথরটার জন্যে আপনার নাকি বিপদে পড়ার পসিবিলিটি আছে। আপনার বাড়ির কাছে পৌঁছে আমি উলটোদিকের একটা গাড়ি বারান্দার নীচে অপেক্ষায় রইলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখলাম একজন বেঁটেখাটো গাঁট্টাগোট্টা লোক পাতিল ম্যানসন থেকে বেরিয়ে আসছে। জানি না, তার সঙ্গে আপনার কোনও কথা হয়েছে কি না, তবে জানবেন লোকটি সুবিধের নয়।
ধন্যবাদ। কিন্তু ওইরকম কোনও লোককে দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না। ইচ্ছে করেই মিথ্যে বলল সারিকা : ডক্টর কাপুর, আজ সকালে আমি মিস্টার বর্মার দোকানে গিয়েছিলাম।
