সারিকা চোখ ফেরাতেই দেখল মেরিয়ন তখনও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। শুধুই মেয়েলি কৌতূহল, না আর কিছু?
কর্নেল সেনও ব্যাপারটা লক্ষ করলেন। তারপর বেশ গম্ভীরস্বরে বললেন, মেরিয়ন, যাও হাতের কাজ সেরে নাও গিয়ে।
সব কাজ হয়ে গেছে আমার। মেরিয়ন জবাব দিল।
ওর ইচ্ছেটা বুঝতে বিক্রম সেনের অসুবিধে হল না। বললেন, সব কাজ যখন হয়ে গেছে, তখন দাড়ি কামানোটা সেরে নাও। বিকেলের জন্যে আর ফেলে রাখবে কেন!
সঙ্গে-সঙ্গে ঘর ছেড়ে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেল মেরিয়ন।
সারিকা আর হাসি চাপতে পারল না। গলা ছেড়ে হেসে উঠল।
কর্নেল সেনও হাসলেন ৪ মাঝে-মাঝে এমন গোঁয়ার্তুমি করে মেয়েটি, কড়া কথা না বলে উপায় থাকে না।…তা বল। কী বলবি?
কাকু নিশীথ সান্যাল ফিরে এসেছে।
তাই নাকি?…তবে আর তোর চিন্তা কী?
কিন্তু এ-নিশীথ সে-নিশীথ নয়–একজন জালিয়াত। সারিকা মাথা নীচু করে বলে চলল, আমার চিনতে ভুল হয়নি।
কর্নেল সেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। পরপর ঘটে যাওয়া অদ্ভুত ঘটনাগুলোকে একটা ছকে ফেলতে চাইলেন। কিন্তু জটিল ঘটনার সমারোহ আরও জটিল হয়ে গেল।
গতরাতের প্ৰেমনাথ ধরের ঘটনা থেকে শুরু করে আনন্দ কাপুরের অনুসরণ নিশীথের আবির্ভাব, অফিসে অনুসন্ধান–সব কিছু একে-একে বলে গেল সারিকা।
গভীর মনোযোগের সঙ্গে শুনে চললেন বিক্রম সেন। সারিকার কথা শেষ হলে বললেন, আচ্ছা, সারি সারিকা মুখ তুলে তাকাল, নিউ মার্কেটের দোকানটায় তোর সঙ্গে নিশীথের যখন দেখা হয়, তখন তুই আগে ওকে চিনতে পারিস, না ও তোকে দেখে এগিয়ে আসে?
কয়েক মুহূর্ত ভাবল সারিকা। তারপর নিশ্চিত স্বরে বলে উঠল, কাকু, সত্যি বলতে কী, নিশীথ আমাকে দেখে প্রথমটা ঠিক চিনতে পারেনি। আমি ওকে ডাকতেই ও বেশ একটু ইতস্তত করে এগিয়ে আসে। ও যে প্রথমটা কেন অমন অপরিচিতের ভান করল, ঠিক বুঝতে পারিনি।
কর্নেল সেন তখনও একইভাবে চোখ বুজে গভীর চিন্তায় মগ্ন। সারিকা থামতেই তিনি চোখ খুললেন দেখি তোর হাতটা।
সারিকা ভীষণ অবাক হয়ে গেল। হতভম্ব মুখে ওর ডান হাতটা ধীরে ধীরে সামনে বাড়িয়ে ধরল।
কর্নেল সেন ওর হাতটা হাতে নিয়ে দেখলেন। অনামিকায় একটা আংটি–তাতে কারুকাজ করে সারিকার নামের প্রথম অক্ষর এস লেখা।
তা হলে আমার সন্দেহই দেখছি ঠিক আত্মগতভাবেই উচ্চারণ করলেন বিক্রম সেন।
সারিকা সপ্রশ্ন দৃষ্টি মেলে তাকাতেই কর্নেল সেন হাসলেন : তুই তো বলছিলি নিশীথের এক দিদি শান্তিনিকেতনে থাকে?
হ্যাঁ।
তা হলে এক কাজ কর। আগামীকাল সকালে আমার বাড়িতে তাকে যেমন করে হোক নিয়ে আয়। তারপর এই নকল নিশীথকে এখানে ডাক। নিজের ভাইকে চিনতে নিশ্চয়ই কেউ ভুল করবে না! আর নিশীথও আগে থাকতে জানতেই পারবে না, ওকে কেন ওই সময়ে আমার বাড়িতে ডাকা হয়েছে।
প্রস্তাবটা সারিকার মনে ধরল। ও সানন্দে সম্মতি জানাল : ঠিক আছে, আমি আজই অনন্যাদেবীকে একটা টেলিগ্রাম করে দিচ্ছি। বলছি, কাল দশটার সময় তোমার বাড়িতে আসতে।
কী কী নাম বললি? বিক্রম সেন হঠাৎই কৌতূহলী হয়ে পড়লেন।
অনন্যা-অনন্যা রায়। নিশীথের দিদির নাম।
ফেমাস সোসাল ওয়ার্কার? আর পশ্চিমবঙ্গ নারী সমিতির সেক্রেটারি?
হ্যাঁ, কেন? সারিকা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
তা হলে তাকে টেলিগ্রামে জানাবি, তার মহিলা তহবিলে জনৈক কর্নেল সেন হাজারদশেক টাকা চাঁদা দিতে ইচ্ছুক। তা হলে এখানে আসার কারণ সম্পর্কে ওঁর মনে কোনওরকম সন্দেহ থাকবে না। আর আমিও আমার কাজটা সেরে নিতে পারব।
গ্র্যান্ড আইডিয়া, কাকু। সারিকা আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলঃ আমি তা হলে এখনই যাই–নিশীথের কাছ থেকে ঠিকানাটা নিয়ে টেলিগ্রামটা করে দিই।
এক মিনিট, সারি– গম্ভীরভাবে বললেন বিক্রম সেন, একটা জরুরি কথা তোকে জানানো হয়নি।
কী কথা? সংশয়ে সারিকার ভুরু কুঁচকে উঠল।
কথাটা কাল সন্ধ্যায় হারানো বহ্নিশিখাকে নিয়ে মাথার কাঁচা-পাকা চুলে হাত চালালেন কর্নেল সেনঃ ওটা হারায়নি, সারি, কেউ চুরি করেছে।
আমি আগেই জানতাম! উত্তেজিত হয়ে সামনের টেবিলে একটা চাপড় কষিয়ে দিল সারিকা। আমিও ঠিক সেই সন্দেহই করেছি।
বহ্নিশিখাটা আমিই চুরি করেছি, সারিকা।
ঘরের মধ্যে যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
.
১০.
প্রায় সাতাশ সেকেন্ড সারিকা বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে রইল কর্নেল সেনের দিকে। তারপর অস্ফুষ্ট চাপা স্বরে বলল, কাকু-তুমি-তুমি!
হাঁ–আমিই। মুচকি হাসলেন বিক্রম সেন ও বহ্নিশিখা এখন আছে আমার সিন্দুকে। দেখবি?
সারিকা চুপ।
হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে দেওয়ালে গাঁথা সিন্দুকের কাছে এগিয়ে গেলেন তিনি। কম্বিনেশন চাকতি ঘুরিয়ে লোহার ভারি দরজাটা খুলে ধরলেন। সারিকা যন্ত্রচালিতের মতো এসে দাঁড়াল কর্নেল সেনের পিছনে।
সিন্দুকের ওপরের তাকেই নিরীহভাবে পড়ে রয়েছে বহ্নিশিখা।
সারিকার দিকে ফিরে হাসলেন কর্নেল সেন। তারপর সিন্দুকের দরজা বন্ধ করে দিলেন।
কাল রাতে আনন্দ আর নীরেন যখন আমাকে সার্চ করেছিল, তখন পাথরটা আমি লুকিয়ে ফেলেছিলাম আমার হুইলচেয়ারে গদির নীচে। সবাই চলে যাওয়ার পর আবার বের করে নিই। পাথরটা। কিন্তু, সারি, পাথরটা আমি কেন চুরি করেছিলাম জানিস? কারণ, আমি জানতাম এই পাথরটার জন্যেই তুই বিপদে পড়বি। তা ছাড়া কাল সন্ধেবেলা প্রথম নজরেই আমি বুঝতে পারি পাথরটা নকল নয়, আসল। এখন নীরেন আর আনন্দ থেকে শুরু করে প্রেমনাথ ধর পর্যন্ত জানে বহ্নিশিখা উধাও হয়ে গেছে। তাই কেউই আর পাথরটার জন্যে তোকে বিরক্ত করবে না। সবাই ভাববে পাথরটার হদিস আর সকলেরই মতো তোরও অজানা।
