আর ভাবতে পারল না সারিকা। সব কিছু যে জট পাকিয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে মাকে বলে ও বেরিয়ে পড়ল। গন্তব্য কিউরিয়ো শপ।
গভর্নমেন্ট প্লেসে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের কাছাকাছি দোকানটা। দোকানের মাপ নেহাত অগ্রাহ্য করার মতো নয়। গেটের বাইরে উর্দিপরা দারোয়ান থেকে শুরু করে সেস-গার্ল সবই আছে।
একটু আড়ষ্ট পায়ে দোকানে ঢুকল সারিকা। দোকানের ভেতরটা কেমন অন্ধকার-অন্ধকার। বেশ কয়েকটা উলঙ্গ বা সিলিংয়ে লাগানো। তাদের কর্কশ আলো সাজানো কিউরিয়োগুলোর ওপর ঠিকরে পড়ছে! অর কিউরিয়োগুলো যেন সেই ঠিকরে পড়া আলোকে শুষে নিচ্ছে।
এদিক-ওদিক তাকিয়ে নীরেন বর্মাকে খুঁজে বের করার আগে তিনিই দেখতে পেলেন সারিকাকে। সহাস্যে এগিয়ে এলেন। আলো পড়ে তার কপালের দুপাশে রুপোলি রেখা চিকচিক করে উঠল। পরনের কালো স্যুট এবং গলায় লাগানো রক্ত-লাল টাই তাঁর পরিচ্ছন্ন রুচির পরিচয় দিচ্ছে।
আসুন, মিস মুখার্জি, ওয়েলকাম টু মাই বিজনেস প্লেস।
সারিকা হেসে বলল, আপনার সঙ্গে একটু জরুরি কথা ছিল। যদি…।
চলুন, পেছনের অফিসে বসেই কথা বলা যাবে।
দোকানের বাঁ দিকে ভারি পরদা দেওয়া একটা দরজা। পরদা সরিয়ে ভেতরে ঢোকার আগে সামনে দাঁড়ানো একজন সেল্সম্যানকে ডাকলেন নীরেন বর্মা ও মেহেরা, যদি কেউ আমার খোঁজ করে তা হলে বলবে আমি নেই–অন্তত ঘণ্টাখানেকের জন্যে।
পরদা সরিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল সারিকা। নীরেন বর্মা হাত বাড়িয়ে আলো জ্বাললেন। তারপর ডেস্কের ওপাশে গিয়ে বসলেন। টেবিলে রাখা কাগজপত্র একপাশে সরিয়ে রেখে বললেন, বসুন, মিস মুখার্জি, বলুন, জরুরি ব্যাপারটা কী?
কাল রাতে একজন লোক আমাদের ফ্ল্যাটে এসেছিল–ওই পাথরটার খোঁজে।
বলেন কী! তারপর?
প্ৰেমনাথ ধরের সমস্ত ঘটনাই বলে গেল সারিকা। রোহিত রায়ের প্রসঙ্গও বাদ দিল না। সবশেষে বলল, সবচেয়ে আশ্চর্য লাগল, ডক্টর কাপুরকে অত রাতে দেখে–? প্ৰেমনাথ ধরকে অনুসরণ করার ব্যাপারটা বলল ও।
তাই নাকি! তা হলে তো আর সন্দেহ নেই। বহ্নিশিখা নির্ঘাত ওই কাপুর সরিয়েছে। লোকটার হাঁটা-চলাই যেন আমার কেমন-কেমন লাগে।
আমি কিন্তু প্ৰেমনাথ ধরকে আপনার আর কাপুরের নাম বলেছি। সে আপনাদের কাছে হয়তো আসবে। তাই আগে থাকতেই জানিয়ে গেলাম।
ও–। একটু যেন থমতো খেয়ে গেলেন নীরেন বর্মা। কিন্তু পরমুহূর্তেই স্বভাবসিদ্ধ হাসি ফুটিয়ে বললেন, যাকগে চুনিটা তো আর আমার কাছে নেই! বিপদে পড়লে আনন্দই পড়বে। তবুও সাবধান থাকা ভালো।…আচ্ছা, এইমাত্র যে নিশীথ সান্যালের ব্যাপারটা বললেন, মানে– আপনি কি শিয়ের যে, লোকটা একটা ইম্পস্টার?
আমি শিয়োর বলেই তো ইন্সপেক্টরকে বলব, আগামীকাল নিশীথ সান্যালের হাতের লেখার সঙ্গে এই জালিয়াতটার হাতের লেখা মিলিয়ে দেখতে। তখনই সব ধরা পড়ে যাবে।
কিন্তু এই লোকটি নিশীথের জায়গা নিতে চাইছে কোন উদ্দেশ্যে? নীরেন জানতে চাইলেন।
মনে হয় বহ্নিশিখার খোঁজে। কারণ আগেই তো আপনাকে বলেছি, নিশীথের কাছে খালি বাক্স দেখে প্রেমনাথ ধর কেমন ধোঁকা খেয়ে গিয়েছিল। এই লোকটি হয়তো ভাবছে চুনিটা নিশীথের কাছেই আছে। দেখি, কাল মনে হয় সব জানতে পারব। সারিকা উঠে দাঁড়াল : আজ তা হলে চলি। পরে একদিন ফোন করে সব জানাব আপনাকে।
আচ্ছা। ডক্টর কাপুরের কাছ থেকে সাবধানে থাকবেন। লোকটা সুবিধের নয়। নীরেন বর্মাও উঠে দাঁড়ালেন : ও–ভালো কথা। আমি ওই যে ক্যাটালগের কথা বলেছিলাম না, সেটাতে একটা বড় চুনির ছবি আছে। তার নামও বহ্নিশিখা। তবে কোনওরকম হার বা চেন ওটার সঙ্গে লাগানো নেই।
তা হলে হয়তো এই পাথরের ছবিই হবে। তা ছাড়া প্ৰেমনাথ ধর তো বলেইছে, চেনটা রোহিত রায় নিজে লাগিয়ে নিয়েছে। আচ্ছা, আপনি সাবধানে থাকবেন কিন্তু…।
আমার জন্যে চিন্তা করবেন না। পকেট থেকে একটা মুখভোতা অটোমেটিক বের করলেন নীরেন বর্মা। হাসলেন : লাইসেন্স করা আত্মরক্ষার অস্ত্র-অতএব নিশ্চিন্ত থাকুন।
বিদায় নিয়ে রাস্তায় নামল সারিকা। বাড়ির দিকে রওনা দিল। স্নান খাওয়া-দাওয়া সেরে ওকে আবার বেরোতে হবে। দেখা করতে হবে কর্নেল সেনের সঙ্গে।
.
দুপুর দুটো নাগাদ সতীশ মুখার্জি রোডে কর্নেল সেনের বাড়িতে পৌঁছোল সারিকা। বাগান এবং বাড়ির সমন্বয়কে যদি বাগানবাড়ি বলা যায়, তা হলে কর্নেল সেনের বাড়িটা তাই। লম্বা টানা সিমেন্ট বাঁধানো পথ গিয়ে শেষ হয়েছে একফালি বাগানের প্রান্তে। সেখানে ফুলের চেয়ে সবুজ পাতার সমারোহই বেশি। বাগানের গায়েই টান-টান হয়ে দাঁড়ানো তিনতলা সাদা ধবধবে বাড়িটা।
শুরুর গ্রিলের দরজাটা পার হয়ে বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়াল সারিকা।
কলিংবেলের বোতামে চাপ দিল।
দরজা খুলল মেরিয়ন। নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকল সারিকা। মেরিয়ন দরজাটা আবার বন্ধ করে দিল।
কর্নেল বিক্রম সেন ড্রইংরুমেই বসেছিলেন। গায়ে জড়ানো একটা ধূসর শাল। হাতে একটা বই মনে হল গল্পের বই।
সারিকাকে দেখতে পাননি কর্নেল সেন। গল্পের বইটায় একেবারে ডুবে ছিলেন। সারিকা কাছে এগিয়ে যেতেই ওর উপস্থিতি টের পেলেন। মুখ তুললেন।
কী রে, এসেছিস? হেসে হাতের বইটা বন্ধ করে রাখলেন তিনি।
সারিকা দেখল, ওটা একটা গোয়েন্দা গল্পের বই। ওর নজর অনুসরণ করে বিক্রম সেন কিছু একটা যেন আঁচ করলেন, বললেন, একটা ডিটেকটিভ গল্প পড়ছিলাম। দেখলাম কী জানিস! শুধু বিশ্লেষণ আর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণই একজন গোয়েন্দাকে জাতে তুলতে পারে–যাগকে, তুই কী বিশেষ দরকার আছে বলেছিলি মেরিয়নকে?
