ও। তা হলে আমি জয়দীপ মিত্র, বক্ষদেশে হাত রাখিয়া বলিতেছি, আমার সম্মুখে দণ্ডায়মান যুবকের নাম শ্রীনিশীথ সান্যাল। ইহা আমার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সত্য। ও.কে.?
জয়দীপের নাটকীয় স্বরে নিশীথ হেসে উঠল। দেশাইয়ের দিকে ফিরে একটা শ্রাগ করলঃ ইন্সপেক্টর আমার মনে হয় আজকের মতো যথেষ্ট হয়েছে। চলুন, এবার ফেরা যাক।
কিন্তু যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল নিশীথ। জয়দীপের দিকে ফিরল জয়, এ-ঝামেলা না মেটা পর্যন্ত আমি অফিসে আর আসছি না।
তোমার ইচ্ছে। তবে যাওয়ার আগে তোমার পিতৃদেবের আদ্যশ্রাদ্ধ করার কপিরাইটটা বড়সায়েবকে দিয়ে যেয়ো।
মডার্ন মেশিন টুলস থেকে বেরিয়ে এল ওরা চারজন।
ইন্সপেক্টর দেশাই এখন যেন ততটা দ্বিধাগ্রস্ত নন। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, তাঁর অবিশ্বাসের ভিতটা টলে গেছে। অন্যমনস্কভাবে তিনি জিপে উঠলেন। ওরাও উঠল।
জিপ আবার ফিরে চলল পাতিল ম্যানসনের দিকে।
নিশীথের সাততলার ঘরে এসে জমায়েত হল সবাই। এতক্ষণ ধরে যে অদৃশ্য উৎকণ্ঠা সকলের কণ্ঠরোধ করেছিল, এখন সেটা মিলিয়ে গেল নিশীথের স্বরে, সারিকা, এর পরেও কোনও প্রমাণ তোমার দরকার?
সারিকা পালটা প্রশ্ন করল, শুনেছিলাম তোমার এক দিদি আছেন। বলো তো কোথায় থাকেন তিনি?
কেন? নিশীথ যেন প্রশ্নের তাৎপর্য খুঁজে পেল না।
দরকার আছে। তিনি কোথায় আছেন এখন? দিল্লিতে? ইচ্ছে করেই নিশীথকে গুলিয়ে দিতে চাইল সারিকা।
না। শান্তিনিকেতনে–তার কাছেই আমি গিয়েছিলাম গত পরশু।
তাই নাকি! সারিকা অবিশ্বাসের সুরে বলল, দেখা যাক–
এবার ইন্সপেক্টর দেশাই গলাখাঁকারি দিলেন : মিস মুখার্জি, আমি আইনের নাগপাশে বাঁধা। সুতরাং আমি প্রমাণসাপেক্ষে যা বুঝেছি, ইনি যে আসল নিশীথ সান্যাল, সে-বিষয়ে আমার আর কোনও সন্দেহ নেই। আশা করি ভবিষ্যতে আপনি আপনার ভুল বুঝতে পারবেন। তবে ওঁর হ্যান্ডরাইটিং আর ফিঙ্গারপ্রিন্ট আমি টেস্ট করে দেখব। গুড নাইট এভরিবডি।
বলিষ্ঠ পদক্ষেপে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন ইন্সপেক্টর দেশাই।
জারিন ঘৃণাভরা চোখে তাকাল সারিকার দিকে ও ঢের রঙ্গ হয়েছে, সারি। নিশীথকে তুমি যে কখনও এভাবে হ্যারাস করতে পারো আমি কোনওদিন স্বপ্নেও ভাবিনি। সমস্ত প্রমাণ তোমার মুখের ওপর ছুঁড়ে দেওয়া সত্ত্বেও তুমি কেন যে এরকম গোঁয়ার্তুমি করছ জানি না। এখন নিশীথকে একটু রেস্ট করতে দাও।
সারিকা হাসল, বলল, বেশ তো, এই নিশীথের সঙ্গে তুমি যদি একা থাকতে চাও, তাতে আমি বাধা দেওয়ার কে! তবে জারিন আগরওয়াল, মনে রেখো, এর শেষ আমি দেখবই। ইন্সপেক্টরের চোখকে ফাঁকি দিতে পারলেও এই লোকটার চালাকিতে আমি ভুলছি না। যারা একে নিশীথের জায়গা নিতে পাঠিয়েছে, বেশ শিখিয়ে-পড়িয়েই পাঠিয়েছে দেখছি! কিন্তু আগামীকাল ইন্সপেক্টর দেশাই আবার আসবেন। নিশীথের ফিঙ্গারপ্রিন্ট অরা হ্যান্ডরাইটিং টেস্ট করলেই এই জালিয়াতটার আসল রূপটি সুড়সুড় করে বেরিয়ে পড়বে। তখন দেখব, এ-ঠাট কোথায় থাকে। গুড নাইট, মিস্টার নিশীথ সান্যাল-আজকের অভিনয়ের জন্যে আপনার প্রশংসা না করে পারছি না। তবে আগামীকালের জন্যে এখন থেকেই জারিনের সঙ্গে রিহার্সালে নেমে পড়ুন–আর সময় নষ্ট করবেন না।
গটমট করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল সারিকা। সশব্দে বন্ধ করে দিল ফ্ল্যাটের দরজা।
ঘরে দাঁড়ানো নিশীথ সান্যালের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে কি হাতের লেখা আর হাতের ছাপ যাচাই করার কথায়? কে জানে।
.
০৯.
ফ্ল্যাটে ফিরে এসে কর্নেল সেনকে ফোন করল সারিকা।
ফোন ধরল মেরিয়ন। সুরেলা গলায় প্রশ্ন করল, কাকে চাই?
কে, মেরিয়ন? আমি সারিকা বলছি।
বলুন।
কাকু আছেন ঘরে?
হ্যাঁ, খেতে বসেছেন।
তা হলে এক কাজ করো। কাকুকে বললো, আমি দুপুরে একবার ওঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই। খুব জরুরি দরকার।
আচ্ছা।
ফোন নামিয়ে রাখল সারিকা। তারপর ফোনগাইডটা টেনে নিল তাক থেকে। খুঁজে খুঁজে বের করল নীরেন বর্মার ফোন-নম্বর। রিসিভার তুলে নিয়ে ডায়াল করল।
একটু পরেই ও-প্রান্ত থেকে কোনও অভ্যস্ত নারীকণ্ঠ ভেসে এল, অজন্তা কিউরিয়ো শপ।
মিস্টার বর্মা আছেন?
আপনি কে কথা বলছেন?
বলুন মিস সারিকা মুখার্জি ফোন করছেন। বিশেষ দরকার।
প্লিজ হোল্ড অন–।
মিনিটখানেক পর শোনা গেল নীরেন বর্মার ভরাট কণ্ঠস্বর, কে, মিস মুখার্জি?
হ্যাঁ, আপনি কি এখন দোকানেই আছেন?
হ্যাঁ, কেন বলুন তো?
আপনার সঙ্গে একটু জরুরি কথা আছে। ফোনে বলা সম্ভব নয়। আমি মিনিট কুড়ির মধ্যেই আপনার দোকানে যাচ্ছি।
আসুন, আমি অপেক্ষা করব।
রিসিভার নামিয়ে রাখল সারিকা। প্রেমনাথ ধরের ব্যাপারটা মিস্টার বর্মাকে জানানো দরকার। কারণ, প্রেমনাথ ধর বহ্নিশিখার খোঁজে হয়তো আজ রাতেই নীরেন বর্মা বা আনন্দ কাপুরের বাড়িতে হাজির হবে। ওঁদের সাবধান করে দেওয়া সারিকার কর্তব্য। তা ছাড়া, এই নকল নিশীথের ব্যাপারটা নিয়ে ভীষণ বিব্রত হয়ে পড়েছে ও। কী করবে ঠিক করতে পারছে না। নীরেন বর্মাকে সব কথা জানানো কি ঠিক হবে?
অনেক চিন্তা-ভাবনার পর সিদ্ধান্তে এল সারিকা। ও আনন্দ কাপুরকে না বললেও মিস্টার বর্মা এবং বিক্রম সেনকে সবকিছু খুলে বলবে। গতকাল রাতে ডক্টর কাপুর প্ৰেমনাথ ধরকে অনুসরণ করছেন দেখে ও ভীষণ অবাক হয়ে গেছে। তা হলে রোহিত রায়কেও কি অনুসরণ করছিলেন আনন্দ কাপুর। কিন্তু তার হাঁটা-চলা দেখে তো স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। পা টেনে তো তিনি চলেন না! তা হলে কি প্রেমনাথ ধরই…?
