…অথবা আপনি এই পাতিল ম্যানসনেরই অন্যান্য বাসিন্দাকে ডেকে আনতে পারেন আমাকে শনাক্ত করার জন্যে।
তারা শনাক্ত করতে হবে ভেবে কোনওদিন আসল নিশীথের দিকে তাকায়নি। স্বীকার করছি, তোমার সঙ্গে আসল নিশীথের চেহারার অনেকটা মিল আছে, কিন্তু তাই বলে আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে এমন আশা করা অন্যায়।
জারিন এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। সারিকার কথা শেষ হতেই ও বলে উঠল, তোমারই হয়তো ভুল হচ্ছে, সারিকা। আমি তো সন্দেহ করার কিছু দেখছি না।
না, ভুল আমার হচ্ছে না। বরং তোমার এই আচমকা সাপোর্টের পেছনে কি ইন্টারেস্ট আছে ভেবে অবাক হচ্ছি। সারিকা তিক্তস্বরে ঝাঁঝিয়ে উঠল।
ইন্সপেক্টর দেশাই এবার এগিয়ে এসে বাধা দিলেনঃ আপনাদের উত্তেজিত হওয়ার কোনও দরকার নেই। এখুনি সব ক্লিয়ার হয়ে যাবে। মিস্টার সান্যাল নিশীথের দিকে ফিরলেন দেশাই গেট রেডি। এখন প্রায় দশটা বাজে। আমরা এখন মডার্ন মেশিন টুল্স-এ যাব।
জারিন আর সারিকা একইসঙ্গে চোখ রাখল নিশীথের চোখে। বুঝতে চাইল, ইন্সপেক্টর দেশাইয়ের এই সরাসরি চ্যালেঞ্জে সে দ্বিধাগ্রস্ত কি না।
কিন্তু নিশীথ যেন ইন্সপেক্টরের কথা লুফে নিল। সাগ্রহে বলল, চলুন, সেই ভালো। মেয়েগুলো তা হলে পাগলামি থেকে একটু রেহাই পাবে।
নিশীথ, আমি কিন্তু তোমাকে মোটেই সন্দেহ করছি না। অনুযোগের সুরে জারিন প্রতিবাদ করল।
তা করছ না, তবে মন খুলে সাপোর্ট করছ বলেও তো মনে হচ্ছে না! নিশীথের বাঁকা জবাবে চুপ করে গেল জারিন।
ইন্সপেক্টর দেশাইয়ের ইঙ্গিতে ওরা তিনজনে ঘর ছেড়ে বেরোল।
ছতলায় নেমে ইন্সপেক্টর দেশাইয়ের কাছে একমিনিট সময় চাইল সারিকা। তারপর চটজলদি পিসিমাকে জানিয়ে এল, জরুরি কাজে ও ঘণ্টাখানেকের জন্য বেরোচ্ছে। চিন্তার কিছু নেই।
বাইরের রাস্তায় পুলিশের একটা জিপ দাঁড়িয়েছিল। দেশাইয়ের দেখাদেখি সকলেই চুপচাপ জিপে গিয়ে উঠল। দেশাই নিজেই গাড়ি ছুটিয়ে দিলেন।
জিপের পিছনের আসনে বসে ওরা তিনজন। একেবারে নিশূপ। একটা বিশ্রী থমথমে আবহাওয়া গাড়ির ভেতরে যেন জমাট বেঁধেছে।
মডার্ন মেশিন টুলস-এর সামনে গাড়ি যখন থামল, তখন প্রায় সাড়ে দশটা বাজে। দেশাই স্টার্ট বন্ধ করে জিপ থেকে নামলেন। নিশীথকে লক্ষ করে বললেন, মিস্টার সান্যাল, আপনি এগোন–আমরা পেছন-পেছন যাচ্ছি।
নিশীথ সামান্য ভ্রূকুটি করেই অফিস বিল্ডিংয়ের ভেতরে পা বাড়াল। চলার ভঙ্গি দেখে স্পষ্টই মনে হল এ-অফিস ওর বহুদিনের চেনা।
নিশীথকে অনুসরণ করে ওরা তিনতলায় এসে পৌঁছোল। সুদৃশ্য কাচের সুইংডোর ঠেলে ভেতরে ঢুকল নিশীথ। পিছনে জারিন, সারিকা ও ইন্সপেক্টর দেশাই।
ঘরে ঢুকতেই নিশীথ এক সুন্দরী মহিলার মুখোমুখি হল। ওকে দেখেই মেয়েটি একগাল হাসলঃ কোথায় ছিলেন এ-দুদিন। একেবারে নো ট্রেস!
নিশীথ মৃদু হেসে চোখ ঠারল : এ স্পেশাল ট্রিপ অন নটি বিজনেস। তারপর সারিকার দিকে ফিরে বলল, আমাদের স্টেনো, সোনালি অরোরা।
মেয়েটিকে পাশ কাটিয়ে ওরা এগিয়ে চলল একটা পার্টিশনের দিকে।
সারিকা ইতিমধ্যেই চিন্তিত এবং গম্ভীর হয়ে পড়েছে। তা হলে কি ওর ভুল হয়েছে। কিন্তু সেটাই বা কী করে সম্ভব! যে-নিশীথের সঙ্গে ও প্রায় সারাটা সন্ধে ঘুরে বেড়িয়েছে, পরে সে-ই কিনা আজ সব অস্বীকার করছে! না, এই লোকটা যে নিশীথের নাম ভাড়িয়ে ওর জায়গা নিতে এসেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু তা হলে আসল নিশীথের কী হল। তেমন গুরুতর কিছু হয়নি তো! তা ছাড়া, অফিসের স্টেনোরা নেহাত প্রয়োজন ছাড়া অফিসের কর্মীদের কাছে যাতায়াত করে না। হয়তো তেমনভাবে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে তাদের চেহারাও জরিপ করে দ্যাখে না। সুতরাং সোনালি অরোরার ভুলও হতে পারে। এমন একজন লোককে সারিকার দরকার, যে ছোটবেলা থেকেই নিশীথের সঙ্গে মিশেছে, তাকে হাড়ে হাড়ে চেনে, জানে এবং বোঝে। কিন্তু হাতের কাছে সেরকম কাউকে ও পাচ্ছে কোথায়! তবে নিশীথের মুখেই তো ও শুনেছে যে, ওর এক দিদি আছেন। শান্তিনিকেতনে থাকেন। এ-দু-দিন তার কাছেই তো ও ছিল বলে বলছে! দেখা যাক, দরকার হলে ইন্সপেক্টর দেশাই এবং এই নকল নিশীথকে নিয়ে শান্তিনিকেতন পর্যন্ত দৌড়তেও ও রাজি আছে। কিন্তু আসল নিশীথের কী হল? নিশ্চয়ই সে কোনও বিপদে পড়েছে।
সারিকার চিন্তার স্রোতে বাধা পড়ল নকল নিশীথের কণ্ঠস্বরে, সারিকা, ইনি আমার সঙ্গে আজ ছবছর ধরে একসঙ্গে কাজ করছেন জয়দীপ মিত্র।
সারিকা হাত তুলে নমস্কার জানাল।
জয়দীপ মিত্রের বয়েস নিশীথের কাছাকাছি হবে। তার সুদর্শন চেহারায় কেমন একটা বেপরোয়া ভাব। মাথার চুলে হাত বুলিয়ে সে অবাক হয়ে তাকাল সারিকা, জারিন ও ইন্সপেক্টর দেশাইয়ের দিকে। তারপর নিশীথের দিকে ফিরে প্রশ্ন করল, কী রে, কী ব্যাপার!
ব্যাপার গুরুতর। দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিল নিশীথ, এদের হঠাৎ ধারণা হয়েছে, আমি নাকি কোনও জালিয়াত, এবং আমার নাম নিশীথ সান্যাল নয়।
তা হলে এক কাজ কর। আমার রাঁচিতে জানাশোনা আছে। লিখে দিচ্ছি। মনে হয় তিনটে সিট খালি পেয়ে যাবি। গম্ভীর স্বরে বলল জয়দীপ।
মিস্টার মিত্র, ইটস নট এ ম্যাটার অফ জোক। ইন্সপেক্টর দেশাই সামনে এগিয়ে এলেন : মিস্টার সান্যালের আইডেন্টিফিকেশনের ওপর অনেক কিছু ডিপেন্ড করছে।
