তা হলে আশা করি পাথরের মালা কেনার ব্যাপারটাও তোমার মনে নেই।
সারিকার স্বর এবার রূঢ়, রাস্তায় দেখা সেই অ্যাকসিডেন্টের ব্যাপারটাও বোধহয় তোমার অস্বীকার করতে ইচ্ছে করছে? সারিকা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
মাই গড! এসব তুমি বলছ কী, সারিকা? নিশীথ শূন্য দৃষ্টিতে একবার তাকাল জারিনের দিকে, তারপর চোখ ফেরাল সারিকার দিকে।
জারিন, আমার মনে হয় নিশীথের ফিরে আসার ব্যাপারটা পুলিশকে জানানো দরকার। তুমি কাইন্ডলি থানায় ফোনটা করো, তারপর ইন্সপেক্টর দেশাইকে ডেকে পাঠাও। বলো, ব্যাপারটা জরুরি।
পুলিশ! এর মধ্যে পুলিশ আসছে কোত্থেকে! নিশীথের ধৈর্যের বাঁধন যেন ছিঁড়ে গেছে। আমি যে দিদির বাড়ি শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলাম, তার জন্যেও পুলিশের কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।
না, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করল জারিন, তোমার উধাও হওয়ার খবরটা পুলিশে জানিয়েছিল সারিকা। তারাও হয়তো তোমার খোঁজ করছে। তাই তোমার ফিরে আসার খবরটা তাদের জানানো দরকার। জারিন আর দাঁড়াল না। পা বাড়াল নিশীথের ফোনের দিকে।
জানি না, তুমি ঠাট্টা করছ, না সত্যিই তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। গম্ভীরভাবে বলল সারিকা, কিন্তু তোমার এ-ঘরে কাল রাতে প্রেমনাথ ধর নামে একজন লোক এসেছিল– বহ্নিশিখার খোঁজে।
নিশীথের দু-চোখে উন্মাদের দৃষ্টি। ও মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে চুপচাপ বসে রইল। মাথাটা গুঁজে দিল দু-হাতের ফাঁকে।
জারিন ফোন রেখে ফিরে এসে বসল চেয়ারে? মিস্টার দেশাই এখুনি আসছেন। সংক্ষিপ্তভাবে জানাল ও।
তারপর ওরা তিনজনেই চুপচাপ বসে রইল। যেন কেউ কাউকে চেনে না।
প্রায় কুড়ি মিনিট পর দরজায় নক করার শব্দ শোনা গেল। সারিকা নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। নিশীথের দিকে একপলক দেখে এগিয়ে গেল দরজায় দিকে।
দরজা খুলতেই এক দশাসই প্রবীণ পুলিশ অফিসারের মুখোমুখি হল সারিকা। গতকাল সকালে তিনিই নিশীথের নিরুদ্দেশের তদন্তে এসেছিলেন। সারিকাকে দেখেই পরিচিতের একফালি হাসি হাসলেন মিস্টার সান্যাল ফিরেছেন?
হ্যাঁ। ভেতরে আসুন। সারিকা সরে দাঁড়াল একপাশে।
ইন্সপেক্টর দেশাই এগিয়ে এসে বিনা আহ্বানেই একটা চেয়ার দখল করলেন। নিশীথের দিকে ফিরে বললেন, মিস্টার সান্যাল, নিশীথ মাথা তুলে তাকাল, আপনাকে এই মিসিং হওয়ার ব্যাপারে একটা স্টেটমেন্ট দিতে হবে।
লিখে নিন। বিরক্ত স্বরে জবাব দিল নিশীথ।
এখানে নয়–থানায় গিয়ে।
চলুন–৷ নিশীথ উঠে দাঁড়াল।
সেই মুহূর্তেই নিশীথের জামার হাতার দিকে নজর পড়ল সারিকার। ও চমকে উঠল। সমস্ত কিছুর যোগফল যা দাঁড়াচ্ছে তাতে…উঁহু, অসম্ভব। কিন্তু…একটা সন্দেহের ঝেকে নিশীথের সামনে এসে দাঁড়াল সারিকা : এক মিনিট, ইন্সপেক্টর দেশাই–এই নিশীথ সান্যালকে একটা ছোট্ট রিকোয়েস্ট আমি করতে চাই।
করুন। দেশাই সম্মতি দিলেন।
নিশীথ, একটু পাশ ফিরে দাঁড়াও প্লিজ।
নিশীথ পাশ ফিরে দাঁড়াল। ওর বাঁ-গালটা কয়েক সেকেন্ড স্থির চোখে খুঁটিয়ে দেখল সারিকা। তারপর ঘুরে তাকাল ইন্সপেক্টর দেশাইয়ের দিকে।
ইন্সপেক্টর, গোড়াতেই একটা বিশাল ভুল আমরা করে বসে আছি। এই লোকটি আদৌ নিশীথ সান্যাল নয়।
.
০৮.
তার মানে! ইন্সপেক্টরের ভুরুজোড়া কপালে উঠল।
তার মানে, এই লোকটি একটি তৃতীয় শ্রেণির জালিয়াত। সারিকা শক্ত গলায় জবাব দিল।
নিশীথের শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে।
কী বলছ সারিকা! জারিনের হৃৎপিণ্ড যেন হোঁচট খেল।
ঠিকই বলছি। এ পর্যন্ত যে কটা কথা আমি বলেছি, তার সবকটাই এই লোকটি অস্বীকার করেছে। বলেছে, বাদশায় সে আমার সঙ্গে যায়নি, নিউ মার্কেট তো দূরের কথা। অথচ পরশু সন্ধ্যায় আমি আর নিশীথ একসঙ্গে প্রায় ঘণ্টাদুয়েক ঘুরেছি। তারপর কীভাবে সে হঠাৎ আসছি বলে উধাও হয়ে যায়, সে-কথা তো আপনাকে কালই বলেছি, ইন্সপেক্টর দেশাই।
হ্যাঁ, তা বলেছেন। দেশাই স্বীকার করলেন, কিন্তু ইনি কি সেসব কথা ডিনাই করছেন নাকি?
হ্যাঁ, করছেন।…তা ছাড়া আরও প্রমাণ রয়েছে–অবশ্য সেগুলোকে ঠিক প্রমাণ বলা যায় কি না জানি না। আসল নিশীথ সবসময় কাফলিঙ্ক ব্যবহার করত, কিন্তু এর বেলা তার ব্যতিক্রম দেখছি। আর সবচেয়ে ইমপরট্যান্ট হল, আসল নিশীথের বাঁ-গালে একটা ছোট আঁচিল আছে। অথচ, এর গালে সেরকম কিছু আমার নজরে পড়ছে না। জানি না, আমার চোখ খারাপও হতে পারে।
হু– চিন্তিতভাবে জবাব দিলেন দেশাই, আচ্ছা, মিস মুখার্জি, মিস্টার সান্যালকে খুব ভালোভাবে জানেন এমন কোনও লোক আপনার সন্ধানে আছে? তা হলে তাকে দিয়েও আমরা আসল-নকল শনাক্ত করতে পারি।
আপনি কি আমার কথায় সন্দেহ করছেন, ইন্সপেক্টর? সারিকা একটু অভিমানী স্বরে বলে উঠল, আপনি এখুনি একে অ্যারেস্ট করুন।
আপনার কথায় সন্দেহ না করলেও আমার নিঃসন্দেহ হওয়ার দরকার, মিস মুখার্জি। উপযুক্ত প্রমাণ না পেলে আমার পক্ষে কোনওরকম লিগাল স্টেপ নেওয়া সম্ভব নয়।
এবার নকল নিশীথ মুখ খুলল, ইন্সপেক্টর, আপনি আমার অফিসে খোঁজ করতে পারেন। মডার্ন মেশিন টুল্স কোম্পানিতে আমি চাকরি করি। নাকি সেটাও বানিয়ে বলছি, সারিকা? সারিকার দিকে ফিরে ব্যঙ্গের সুরে বলে উঠল ও।
আসল নিশীথ সান্যাল ওই কোম্পানিতেই চাকরি করে। ভাবলেশহীন মুখে যান্ত্রিক স্বরে বলল সারিকা।
