হঠাৎই কী ভেবে সারিকা এক মিনিট–আসছি। বলে ছুটে চলে গেল রাস্তার দিকের জানলার কাছে। পরদা সামান্য সরাতেই সে দেখল উলটোদিকের একটা বাড়ির বারান্দার নীচে দাঁড়িয়ে এক ছায়ামূর্তি। মাথায় কালো টুপি। পরনে গাঢ় রঙের পোশাক। চেহারাটা যেন খুব চেনা মনে হল সারিকার।
প্ৰেমনাথ ধর রাস্তায় পা দিয়ে চলতে শুরু করতেই শব্দটা শুনতে পেল। অতি সন্তর্পণে কেউ তাকে অনুসরণ করছে। গতি এবং যতি মিলিয়ে অনুসরণের ছন্দটা যেন মর্স কোডের ডট ড্যাশেরই মতো। তাড়াতাড়ি পা চালাল প্ৰেমনাথ ধর।
সারিকা দেখল প্রেমনাথ ধর রাস্তায় পা দিতেই ছায়ামূর্তি নড়েচড়ে দাঁড়াল। তারপর একটু পরেই একান্ত অভ্যস্ত ভঙ্গিতে তাকে অনুসরণ করল।
ঠিক তখনই আগন্তুককে চিনতে পারল সারিকা।
ডক্টর আনন্দ কাপুর!
.
০৭.
পরদিন একটু বেলাতেই ঘুম ভাঙল সারিকার। মনে অনেক দুশ্চিন্তা থাকা সত্ত্বেও কাল রাতে ঘুমটা খারাপ হয়নি। তার একটা কারণ বোধহয় রাতে শুতে অনেক দেরি হয়েছে।
রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর পিসিমা-পিসেমশাইকে নিয়ে সারিকা আবার আলোচনায় বসেছে। সারিকা একরকম বাধ্য হয়েই চুনির ব্যাপারটা ওঁদের বলেছে।
শুনে পিসেমশাই তো ভয়েই অস্থির। ভয় সারিকারও করছে। কিন্তু ও তো এখন একেবারে জড়িয়ে গেছে। প্ৰেমনাথ ধর যা বলে গেছে তাতে দিল্লি পালিয়েও সারিকা রেহাই পাবে না। এখন একমাত্র কর্নেলকাকুই ভরসা।
পিসিমার ভয়-ডর একটু কম। একবার দেশের বাড়িতে ডাকাতদলকে চেঁচিয়ে ভয় দেখিয়ে রুখে দিয়েছিলেন। তিনি বললেন, তুই পুলিশকে সব খুলে বল। আর আমার মিলিটারি ভাসুরকে সব জানিয়ে দে। উনি সব্বাইকে ঠান্ডা করে দেবেন।
সারিকা তখন কর্নেল বিক্রম সেনের কথা বলল। বলল, কর্নেলকাকু সব জানেন। উনি এই মিস্ট্রি সলভ করার জন্যে খুব চেষ্টা করছেন। তোমাদের কোনও ভয় নেই। পুলিশ রয়েছে, কর্নেলকাকু রয়েছেন। তা ছাড়া যে-ভদ্রলোক আজ এসেছিলেন তিনিও আমার ফরে-এগেইনস্টে নন। সুতরাং কোনও ভয় নেই।
এইরকম বহু তর্ক-বিতর্ক আলোচনার পর সারিকা শুতে গেছে। যাওয়ার আগে পিসিমাদের বারবার করে বলেছে, মাকে যেন ওঁরা এত কথা না জানান। তা হলে দুশ্চিন্তায় মা শেষ হয়ে যাবে।
এখন মুখ-হাত ধুয়ে ব্রেকফাস্ট খাওয়ার সময় সারিকা হঠাৎই একটা শব্দ শুনতে পেল।
কেউ ওপরতলায় নিশীথের ফ্ল্যাটে হেঁটে বেড়াচ্ছে।
একটু চিন্তিত মনেই ব্রেকফাস্ট সারল ও। তারপর পোশাক পরে বেরোতে যাবে, শুনল দরজায় কারও নক করার শব্দ। শব্দের কম্পাঙ্কের সাংখ্যমান নিঃসন্দেহে সেকেন্ডে দুবারেরও বেশি। অতএব যে-ই ওর দরজায় এসে থাকুক, তার প্রয়োজনটা খুব জরুরি।
দরজা খুলতেই সারিকা জারিন আগরওয়ালের মুখোমুখি হল। ওর চোখেমুখে তীব্র উত্তেজনার ছায়া। যেন ভীষণ কিছু একটা দেখে ছুটতে ছুটতে এসেছে।
সারিকা প্রশ্ন করল, কী ব্যাপার?
নিশীথ-নিশীথ ফিরে এসেছে।
সারিকা বুকে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেল। খুশির মুহূর্তটাকে কাটিয়ে উঠেই ও বলে উঠল, চলো তো, দেখি।
ওরা দুজনে ক্ষিপ্রপায়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরতলায় উঠতে শুরু করল।
নিশীথের ফ্ল্যাটের কাছে এসে দরজায় ধাক্কা মারল ও।
একটু পরেই দরজা খুলে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে বিস্মিত নিশীথ। ওদের দেখেই ওর মুখে পরিচয়ের হাসি ফুটে উঠল। একপাশে সরে দাঁড়িয়ে ও আহ্বান জানাল, এসো, ভেতরে এসো।
ওরা ইতস্ততভাবে ধীরে-ধীরে ঘরে ঢুকল।
দরজা ভেজিয়ে দিল নিশীথ। ফিরে এসে চেয়ারে বসল। ওদেরও বসতে অনুরোধ করল।
কিন্তু সারিকা আর জারিন তখন তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে ঘরের চারিদিকে দেখছে। মাঝে-মাঝেই ফিরে তাকাচ্ছে নিশীথের দিকে। যেন কোনও অপরিচিত মানুষের অপরিচিত ফ্ল্যাটে ঢোকার প্রথম সুযোগ পেয়েছে ওরা।
প্রাথমিক বিস্ময়ের ভাবটা কাটিয়ে উঠে চেয়ারে বসল জারিন ও সারিকা। ওদের সামনে বসা নিশীথ সান্যাল যেন এক দূরের মানুষ। ওদের মাঝের অদৃশ্য দেওয়াল এই দু-দিনেই যেন অনেক শক্তপোক্ত হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর সারিকা গম্ভীর গলায় বলল, এ কদিন কোথায় ছিলে জানতে পারি? নিজের অজান্তেই নিশীথকে তুমি করে কথা বলে ফেলল সারিকা।
কলকাতার বাইরে শান্তিনিকেতনে। নিশীথের স্বর অত্যন্ত সহজ, দ্বিধাহীন।
কারণ? এবারের প্রশ্ন জারিনের।
এই, ব্যাপার কী বলো তো? চমকে উঠল নিশীথ। উঠে দাঁড়াল, তোমরা দুজনে এমনভাবে জেরা শুরু করেছ, যেন আমি কোনও বিরাট অপরাধ করে ফেলেছি। কী ব্যাপার?
অপরাধ করেছ, তবে বিরাট কি না বলতে পারি না। সারিকা বাঁকা সুরে জবাব দিল। নিশীথের চোখে চোখ রেখে বলল, তুমি বাদশা থেকে উধাও হওয়ার পর এখানে পিকিউলিয়ার অনেক কিছু ঘটে গেছে।
বাদশা! পিকিউলিয়ার! কী সব আবোলতাবোল বকছু, সারিকা? নিশীথ এবার সত্যিই অবাক। বোধহয় ভাবছে, সারিকার মাথা ঠিক আছে কি না কে জানে।
নিশীথের কথায় সারিকা চমকে উঠল? সে কী! তোমার কি মেমারি লস হয়েছে, নিশীথ? আমরা বাদশায় খেতে ঢুকলাম। ট্যাক্সি করে এক বন্ধুকে এগিয়ে দিয়ে আসার নাম করে তুমি সেই যে বেপাত্তা হলে, তারপর এই হাজির হলে। এরপরও তুমি বলবে ব্যাপারটা স্বাভাবিক? শান্তিনিকেতনে তোমার কী দরকার ছিল যে, অমন না বলে কয়ে হুট করে চলে গেলো।
জারিন, কী ব্যাপার! সারিকার মাথায় কোনও গন্ডগোল হয়নি তো? জারিনের দিকে ফিরে কপট সুরে প্রশ্ন করল নিশীথ।
