অবশেষে এলাম এই কলকাতায়। রোহিত শত চেষ্টাতেও চুনিটা তখনও পর্যন্ত বেচে উঠতে পারেনি। এদিকে এই পুকুর চুরির ব্যাপারটা ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দপ্তরে জানাজানি হয়ে গেছে। তাই পুলিশের কর্তারা উঠে পড়ে রোহিতের পেছনে লাগলেন।
শুধু যে আমি এবং পুলিশ, তাই নয়। আরও একজন যুবককে আমি লক্ষ করেছি, রোহিতকে অনুসরণ করছে। কিন্তু রোহিত আমাদের কাউকেই ভয় পায়নি। ও ভয় পেত চার নম্বর কাউকে। সে কে বা কারা আমি কিছুই জানি না। শেষদিকে রোহিত পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। এমন করত যেন ওকে ভূতে তাড়া করে নিয়ে চলেছে। তারপর গতকাল সন্ধ্যায় একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেল রোহিত। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, সুখেন বর্মার অ্যাক্সিডেন্ট আর রোহিত রায়ের অ্যাক্সিডেন্ট প্রায় এক টাইপের। তবে আমি জানি না, রোহিতকে কারা শেষ করেছে। একটা বড় শেভ্রলে গাড়ি ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ওপর রোহিতকে চাপা দিয়ে চলে যায়।
থামল প্ৰেমনাথ ধর। পোড়া সিগারেটের টুকরোটা মেঝেতে ফেলে পা দিয়ে পিষে দিল।
প্ৰেমনাথ ধরের শেষ কথাটায় তড়িৎস্পৃষ্টের মতোই চমকে উঠল সারিকা। তা হলে কি পাথর বসানো হারটা কেনার পর ও আর নিশীথ যে-অ্যাক্সিডেন্টটা দেখেছিল তাতেই রোহিত রায় মারা গেছে।
প্রেমনাথ ধর যেন সারিকার মনের কথা বুঝতে পারল। বলল, হ্যাঁ, রোহিত যখন মারা যায়, তখন আপনি আর নিশীথ সান্যাল স্পটে ছিলেন। মারা যাওয়ার আগে রোহিত হয়তো টের পেয়েছিল আজ আর তার রেহাই নেই। তাই সে পাথরটাকে নিউ মার্কেটের একটা দোকানে লুকিয়ে ফেলে। বয়ে বেড়ানোর সুবিধের জন্যে সে পাথরটা দিয়ে একটা বিছেহার বানিয়ে নিয়েছিল। যাই হোক, ঘটনাচক্রে সে-হার কিনে ফেললেন আপনি। অগত্যা রোহিতকে ছেড়ে আপনাকেই আমি ফলো করতে শুরু করলাম।
আপনারা বাদশার ঢুকলেন। আমিও ঢুকলাম। সুযোগের অপেক্ষায় রইলাম। নাটকীয়ভাবে আপনার সঙ্গে দেখাও করলাম। কিন্তু লাভ হল না। একটু পরেই আমার নজরে পড়ল মিস্টার সান্যাল চুনির বাক্সটা পকেটে ভরলেন, তারপর রেস্তোঁরা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। অতএব আমিও তাকেই ফলো করলাম। তিনি সোজা গিয়ে ঢুকলেন সামনের একটা ওষুধের দোকানে। কাকে যেন ফোন করলেন। আমি দূর থেকে লক্ষ করতে লাগলাম। একটু পরেই তিনি ফোন সেরে বেরিয়ে এলেন। আমি হাতসাফাই করে তার পকেট থেকে চুনির বাক্সটা তুলে নিলাম।
বাক্স নিয়ে আমি আর ওয়েট করিনি। সোজা রওনা হয়েছি আমার হোটেলের দিকে। কিন্তু কিছুদূর যেতেই দেখি মিস্টার সান্যাল পাগলের মতো পকেট হাতড়াচ্ছেন। তারপরই তিনি দৌড় লাগালেন ওষুধের দোকানটার দিকে। আমি হেসে আবার চলতে শুরু করলাম।
কিন্তু ভাগ্যদেবীও সেই মুহূর্তে বোধহয় হেসেছিলেন। কারণ, হোটেলে গিয়ে বাক্স খুলে দেখি ফক্কিকার। কিছু নেই। তখন ভাবলাম, পাথরটা অন্য পকেটে সরিয়ে রেখে আমাকে ধোঁকা দেওয়ার জন্যে মিস্টার সান্যাল অভিনয় করেননি তো! তাই রাত গম্ভীর হতেই গেলাম নিশীথ সান্যালের ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাট চেনার জন্যে আমাকে বেশি কষ্ট করতে হয়নি। খোঁজখবর করার জন্যে বাদশায় আবার ফিরে গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই ওঁর নাম-ঠিকানা বের করে নিয়েছি।
তা হলে কাল রাতে আপনিই নিশীথের ফ্ল্যাটে ঢুকেছিলেন? প্ৰেমনাথ ধরকে বাধা দিয়ে জানতে চাইল সারিকা।
হ্যাঁ, বহ্নিশিখার খোঁজে। জবাব দিল সে, তবে কীভাবে ঢুকেছি তা জেনে আপনার লাভ নেই, যেমন লাভ নেই কীভাবে আপনাদের ঘরে ঢুকেছি তা জেনে।…যাক, যে কথা বলছিলাম। চুনির খোঁজ করতে গিয়ে আবারও আমি হতাশ হলাম। অবশেষে অনেক চিন্তার পর মনে হল, পাথরটা স্বাভাবিক ইমপাসে আপনি গলায় পরেননি তো! একথা মনে হতেই আজ এখানে এসে আপনার জন্যেই এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করেছি। কিন্তু এখন দেখছি, সে সব বৃথাই।
প্রেমনাথ ধরের স্বরে হতাশার সুর সারিকার কান এড়াল না। ও মনে-মনে কী যেন ভাবল। তারপর বলে বসল, আমার মনে হয়, আজ কর্নেল বিক্রম সেনের বাড়িতে কেউ ওটা চুরি করেছে।
কী! ভীষণভাবে চমকে উঠল আগন্তুক, কী বললেন! চুরি করেছে!
হ্যাঁ। সারিকার স্বর অবিচল।
কে?
সম্ভবত আনন্দ কাপুর, অথবা নীরেন বর্মা।
ধন্যবাদ। যদি সত্যিই এঁদের কেউ বহ্নিশিখাকে হাতিয়ে থাকে, তা হলে আমার হাত এড়িয়ে তারা বাঁচতে পারবেন না। চলি, মিস মুখার্জি। আপনাকে অসময়ে বিব্রত করার জন্যে মাপ করবেন। বলে কোনওরকম সময় নষ্ট না করেই দরজার হাতল ঘুরিয়ে বেরিয়ে গেল প্ৰেমনাথ ধর।
সে বেরিয়ে যেতেই দরজা বন্ধ করে দিল সারিকা। ছুটে গেল ভেতরের ঘরের দিকে।
দরজা খুলে দিতেই মা-পিসিমা-পিসেমশাই আর সম্রাটকে দেখতে পেল ও।
সম্রাট ছুটে এসে ওকে জাপটে ধরল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
মা কাঁদতে কাঁদতে সারিকার কাছে এসে দাঁড়ালঃ এসব কী শুরু হয়েছে, সারি! তুই শিগগিরই থানায় খবর দে। নইলে চল, আমরা দিল্লি ফিরে যাই।
সারিকা ঠিক কী বলবে বুঝতে পারছিল না। কারণ, বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মা সাহস আর আত্মবিশ্বাস অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। একবার কোনও ব্যাপার মাথায় ঢুকলে সকাল বিকেল একই কথা বলে যাবে।
পিসেমশাই এবার কাছে এগিয়ে এলেন, ভয় পাওয়া গলায় বললেন, সারি, ব্যাপারটা কিন্তু সিরিয়াস। রাত নটার সময় কেউ আমাদের ফ্ল্যাটে ঢুকে রিভলবার উঁচিয়ে শাসাবে এটা কোনওদিন ভাবিনি…।
