মা-পিসিমা ওরা সব কোথায়?
আবছা আলো-আঁধারে সারিকার কেমন ভয়-ভয় করতে লাগল। একইসঙ্গে অবাকও হল।
আন্দাজে ধীরে-ধীরে আলোর সুইচের দিকে হাত বাড়াল।
ঠিক তখনই একটা জ্বলন্ত অগ্নিবিন্দু ওর নজরে পড়ল। আর একটা গাঢ় ছায়া কোথা থেকে যেন ওর সামনে এসে দাঁড়াল। এক ধাক্কায় দরজাটা বন্ধ করে দিল।
সঙ্গে-সঙ্গে ভয়ে কানফাটানো চিৎকার করে উঠল সারিকা। ওর চিৎকারে গোটা ফ্ল্যাটটা যেন থরথর করে কেঁপে উঠল। কিন্তু সেই আর্তনাদের রেশ শেষ হওয়ার আগেই একটা লোমশ বলিষ্ঠ কালো থাবা এসে পড়ল সারিকার মুখে মাঝপথেই থামিয়ে দিল ওর চিৎকার। একটা ভরাট কণ্ঠস্বর আচ্ছন্ন সারিকার কানে আছড়ে পড়ল, এতক্ষণ ধরে আপনার অপেক্ষাই করছিলাম, মিস মুখার্জি।
.
০৬.
একটু পরেই ঘরের আলো জ্বলে উঠল। আগন্তুক তার হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা মেঝেতে ফেলল, পায়ের চাপে নিভিয়ে দিল আগুন।
সারিকা এবার তাকে স্পষ্ট চিনতে পারল।
বাদশার সেই বিচিত্র আগন্তুক।
একটা বিশেষ দরকারে আমি আপনার কাছে এসেছি, মিস মুখার্জি। আপনার কোনও ভয় নেই। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে গুছিয়ে বসল লোকটি : আপনার কাছে যে-লাল পাথরটা আছে, ওটা আমি ফেরত চাই।
সারিকা ওর হতবুদ্ধি আতঙ্কের ভাবটা ততক্ষণে কাটিয়ে উঠেছে। ও জানতে চাইল : আমার মা-পিসিমা সব কোথায়?
আগন্তুক শান্ত গলায় বলল, আপনার রিলেটিভরা সবাই ভেতরের ঘরে আছেন। আমি ওঁদের সবাইকে ও-ঘরে আটকে রেখেছি। বলেছি, ভয়ের কিছু নেই। মিস মুখার্জির সঙ্গে কয়েকটা জরুরি কথা বলেই আমি চলে যাব। অনেস্টলি বলছি, মিস মুখার্জি মিনিট পনেরো-কুড়ির বেশি সময় আমি নেব না। আর কথাগুলো সত্যিই খুব জরুরি…।
আমি মায়ের সঙ্গে একবার দেখা করব। সারিকা অনুনয়ের গলায় বলল।
শুধু-শুধু কমপ্লিকেশন বাড়াবেন না। আমি চাই না, যেসব কথা আমি বলব সেগুলো বেশি লোক জানাজানি হোক। তাতে আপনার বিপদ আরও বাড়বে। আপনাকে সব খুলে বললেই আপনি ক্লিয়ারলি সব বুঝতে পারবেন। আপনি আমাকে জাস্ট পনেরো মিনিট সময় দিন..প্লিজ… আপনার কোনও ভয় নেই…।
সারিকা বিহ্বলভাবে দাঁড়িয়ে রইল। ওর সবকিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল।
ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আগন্তুক বলল, দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন!
কিন্তু কিন্তু আপনি আমাদের ফ্ল্যাটে ঢুকলেন কী করে? কী চান আপনি? সারিকা একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। ও সামান্য হাঁফাচ্ছিল।
সব বলছি–তার আগে চুনিটা আমাকে ফেরত দিন। সামনের দিকে ডান হাত বাড়িয়ে ধরল আগন্তুক।
সারিকার স্পষ্ট নজরে পড়ল বেড়ালের নিখুঁত ছবিটা।
ও শিউরে উঠল, বলল, ওটা আর আমার কাছে নেই। আজ সন্ধেবেলা একজনের বাড়িতে আমরা কয়েকজন আড্ডা মারছিলাম। তখন পাথরটা হারিয়ে গেছে।
মিথ্যে কথা! চট করে সোজা হয়ে দাঁড়াল আগন্তুক, আপনি মিথ্যে কথা বলছেন।
বিশ্বাস না হয় আপনি এই ফোন নম্বরে ফোন করে জিগ্যেস করতে পারেন। ব্যাগ থেকে পেন বের করে খসখস করে কর্নেল সেনের ফোন নম্বরটা লিখে দিল সারিকা।
কিছুক্ষণ চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে রইল আগন্তুক। তারপর বলল, না, আপনি সত্যি কথাই বলছেন। তবে ওই চুনির সঙ্গে রিলেটেড পুরো ঘটনাটা আপনার জানা দরকার–তা হলে আপনি সিচুয়েশনটা বুঝতে পারবেন। তা ছাড়া ওই বহ্নিশিখার জন্যে আপনি বিপদে পড়ুন তা আমি চাই না।
বহ্নিশিখা! সারিকা অবাক হল।
হ্যাঁ, ওই চুনিটার নামই বহ্নিশিখা। সে এক লম্বা ইতিহাস। একটা সিগারেট ধরাল আগন্তুক, একমুখ ধোয়া ছেড়ে বলল, আমার নাম প্রেমনাথ ধর, আমি কাশ্মীর থেকে এসেছি কলকাতায়– শুধু ওই বহ্নিশিখাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে।
নিশীথ কোথায়? সারিকা প্রশ্ন করল।
আপনার সব প্রশ্নের উত্তরই পাবেন, মিস মুখার্জি। নিশীথ সান্যাল সম্পর্কে যতটুকু আমার জানা আছে বলছি। প্রেমনাথ ধর সিগারেটে এক গভীর টান দিল। মাথার কালো চুলে হাত বুলিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করল, রোহিত রায়কে আপনি চেনেন?
অভিব্যক্তিহীন মুখে মাথা নাড়ল সারিকা।
গত যুদ্ধের সময় ইন্ডিয়ান আর্মির রোহিত রায় আর সুখেন বর্মা কাশ্মীরে ছিল। যুদ্ধ চলার সময় কোনওরকম বিপদ দেখা দেয়নি। দেখা গেল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর। রোহিত রায় আর সুখেন বর্মা এমনিই বেড়াতে বেড়াতে হরওয়ান জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছোয়। ওই জায়গা থেকে মাইল দুয়েক দূরে একটা বিশাল মন্দির আছে–তখনও সেটা তৈরি হচ্ছিল। সেই মন্দিরের ভেতরে ভগবানের আসনে সাজানো ছিল বহ্নিশিখা। ওটা পাহারা দেওয়ার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। আমরা ভাবপ্রবণ হিন্দুরা খুবই ধর্মভীরু লোক। তাই ওই পাথর চুরি করার কথা কেউ কখনও ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করিনি। অথচ রোহিত রায় লোভ সামলাতে পারেনি। সে একদিন চুপিসারে ওই চুনিটা তুলে নিয়ে চম্পট দেয়। তখন হাতেনাতে ধরা পড়লে তার অবস্থা কী হত, সে একমাত্র ভগবানই জানেন। কিন্তু ধরা সে পড়েনি।
একটা ছোট প্লেনে করে পালানোর মতলব করেছিল রোহিত রায়। সুখেন বর্মা বরাবরই এই পাথর চুরিতে আপত্তি করেছিল, কিন্তু শেষে রোহিতের অনুরোধ-উপরোধে রাজি না হয়ে পারেনি। এরপর একটা নৃশংস দুর্ঘটনা ঘটল। এক সকালে আমরা দেখলাম সুখেন বর্মার ছিন্নভিন্ন দেহটা মাংসপিণ্ড হয়ে প্লেনের কাছে পড়ে রয়েছে। রোহিত জানাল, প্লেনের চলন্ত প্রপেলারে ধাক্কা লেগে সুখেনের ওই অবস্থা হয়েছে। দুর্ঘটনা। কিন্তু আসল ব্যাপারটা তা নয়। চুনির লোভে সুখেন বর্মাকে খুন করেছিল রোহিত রায়। তখনও আমরা পাথর চুরির ব্যাপারে রোহিতকে সন্দেহ করে উঠতে পারিনি। সমস্ত ব্যাপারটা জানাজানি হওয়ার আগেই কাশ্মীর ছেড়ে সরে পড়ল রোহিত রায়। কিন্তু আমরাও অত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নই। তাই আর্মিতে গোপনে খোঁজ করে আমরা রোহিতের ঠিকানা বের করলাম। তারপর থেকেই আমি ছায়ার মতো ওকে ফলো করতে লাগলাম।
