ডোন্ট টক রট! বিক্রম সেনকে ধমক দিলেন নীরেন বর্মা : তোমাকে আমরা সার্চ করতে যাব কোন দুঃখে! আর ওই চুনিটা নিয়েই বা তুমি কী করবে! তোমার কাছে মণিমুক্তো কি নেহাত কম আছে?
বর্মা ঠিকই বলছে, বিক্রম। আনন্দ কাপুর বললেন।
তা হোক। তবুও আমি চাই আমাকেও সার্চ করা হোক। নিজের বক্তব্যে বিক্রম সেন অবিচল।
অতএব তার কথামতোই কাজ হল। বিক্রম সেনের চোখের সামনেই পরস্পরকে তন্নতন্ন করে সার্চ করলেন আনন্দ কাপুর ও নীরেন বর্মা। এবং স্বাভাবিকভাবেই সেই অনুসন্ধানের ফলাফল হল শূন্য।
তারপর ওঁরা দুজনে এগিয়ে এসে কর্নেল সেনকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলেন। দ্রুত হাত চালিয়ে তার শরীর অনুসন্ধান করলেন নীরেন বর্মা। কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না।
কর্নেল বিক্রম সেন এবার চিন্তিত হয়ে পড়লেন ও নীরেন, ও-ঘর থেকে সারিকা আর মেরিয়নকে ডেকে পাঠাও।
নীরেন বর্মা চটপট ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
সেন, নীরবতা ভাঙলেন ডক্টর কাপুর, জানি, আমার বলা উচিত নয়, কিন্তু বর্মার যে একটা কিউরিয়ো শপ আছে একথাটা তুমি একেবারে ভুলে যেয়ো না।
বিক্রম সেন হাসলেনঃ আমার মনে হয় পাথরটা টেবিল থেকে গড়িয়ে কোথাও পড়ে গেছে। কাল সকালেই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে।
এমন সময় মেরিয়ন, সারিকা, আর নীরেন বর্মা একসঙ্গে এসে ঘরে ঢুকল।
কর্নেল সেনের কাছে এসে থামল সারিকা ওকাকু, ও-ঘরে গিয়ে আমি আর মেরিয়ন এ ওর পোশাক তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেছি–পাথরটা কোথাও নেই।
তার কোনও প্রয়োজন ছিল না।
কেন নয়? কর্নেল সেনকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল মেরিয়ন, এ-ধরনের দামি কোনও জিনিস চুরি গেলে সন্দেহটা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির কাজের লোকদের ওপর আসে, তাই না? মুখে কিছু না বললেও, আপনাদের মনে হয়তো একটা সন্দেহ থেকেই যাবে। ভাববেন হয়তো আমিই…। আর, এই খবরটা শোনার পর মেজর চৌধুরী হয়তো আমাকে আর কোথাও পার্সোনাল নার্স হিসেবে রেকমেন্ড করবেন না!
মেরিয়নের কথায় যুক্তি আছে। সারিকা সমর্থন জানাল, সেইজন্যেই আমি ওর প্রোপোজালে রাজি হয়ে ওকে সার্চ করেছি।
তা হলে মোদ্দা ব্যাপারটা হল, চুনিটা আমাদের পাঁচজনের কারও কাছেই নেই। সিদ্ধান্তটা স্পষ্ট করেই উচ্চারণ করলেন কর্নেল সেন, কাপুর, বর্মা আমি দুঃখিত যে, আজ তাসের আসর বসানোর মতো মেন্টালিটি আমাদের কারও নেই। অতএব, গুড নাইট। ..সারিকা, সারিকার দিকে চোখ ফেরালেন কর্নেল, তুই পরশু সকালে একবার আমার সঙ্গে দেখা করিস কথা আছে।
এবার হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে পাশের ঘরের দিকে এগোলেন বিক্রম সেন। শুধু একবার মেরিয়নের দিকে ঘাড় ফেরালেন : মেরিয়ন, আমার খাবার দেওয়ার সময় হয়েছে।
কর্নেল সেন ঘর ছেড়ে বেরোতেই আনন্দ কাপুর বললেন, মিস মুখার্জি, যদি আপত্তি না করেন তো আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।
কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবল সারিকা। সম্ভবত সেই মর্স কোডের বিচিত্র ছন্দটার কথা, তারপর রাজি হল।
সুতরাং ওরা তিনজনেই বিক্রম সেনের বাড়ি ছেড়ে সতীশ মুখার্জি রোডে বেরিয়ে এলেন।
রাস্তা নির্জন। নীরেন বর্মা মৃদু স্বরে বিদায় নিয়ে হনহন করে পা চালালেন রাসবিহারী অ্যাভিনিউর দিকে। সারিকা ও আনন্দ কাপুর বড় রাস্তার দিকে পা বাড়াল ট্যাক্সির খোঁজে।
পথে যেতে-যেতে নিশীথ আর অনুসরণের ব্যাপারটা কাপুরকে জানাল সারিকা।
সব শুনে তিনি একেবারে হতবাক হয়ে গেলেন। পরে বললেন, মিস মুখার্জি, আপনি তো শুনলেন, নীরেন বর্মার একটা কিউরিয়ো শপ আছে। হয়তো চুনিটা আসল শোনার পর একটা নতুন কিউরিয়ো কালেকশনের লোভে ও নিজেকে আর সামলাতে পারেননি। আমি তো বাজি ফেলে বলতে পারি, ওই পাথরটা বর্মা ছাড়া আর কেউ নেয়নি।
কী জানি! অনিশ্চিত স্বরে জবাব দিল সারিকা।
আনন্দ কাপুরের ট্যাক্সি সারিকাকে নামিয়ে দিল ল্যান্সডাউন রোডে। রাত তখন পৌনে দশটা। রাস্তা নির্জন। সুতরাং একটু ভয় যে মনকে দোলা দিল না তা নয়, তাড়াতাড়ি পা চালাল সারিকা।
প্রথমটা ঠিক ঠাহর করতে পারেনি। কিন্তু কিছুটা যাওয়ার পর বেশ স্পষ্টই সারিকার কানে এল শব্দটা : ঠক–তারপরই পা টেনে চলার একটা অদ্ভুত শব্দ, আবার ঠক–এবং একই পুনরাবৃত্তি। যেন মর্স কোডের সংকেত।
ভীষণ ভয় পেয়ে গেল সারিকা। ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে তাকাল। কেউ নেই।
ভয়ে প্রায় ছুটতে শুরু করল সারিকা। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে থামল এসে একেবারে ওদের ফ্ল্যাটবাড়ির দরজায়। পিছনে অনুসরণের শব্দ তখন ফিকে হয়ে সম্পূর্ণ মিলিয়ে গেছে।
তাড়াতাড়ি গিয়ে এলিভেটরে উঠল সারিকা। দারোয়ান বা কাউকেই কাছাকাছি নজরে পড়ল না। বোতাম টিপতেই যন্ত্রযান নিঃশব্দে উঠতে শুরু করল। সেই সঙ্গে সারিকার বুকের ঢিপঢ়িপ শব্দও বেড়ে চলল।
হঠাৎই থেমে গেল লিফট। দরজা খুলে গেল। সামনেই সারিকার পিসিমাদের ফ্ল্যাটের করিডর। করিডরের আলোটা নেভানো।
আশ্চর্য! কে নেভালো আলোটা!
লিফট ছেড়ে বাইরে আসতেই সারিকা লক্ষ করল জারিনের ফ্ল্যাটে কোনও আলো জ্বলছে না। তা হলে ও হয়তো কোথাও বেরিয়েছে।
অন্ধকারেই দেওয়ালে হাত রেখে নিজেদের দরজার কাছে এগিয়ে চলল ও।
কলিংবেল টিপতেই দরজা খুলে গেল। কিন্তু ঘরের ভেতরটা অন্ধকার থাকায় কিছুই ঠাহর করা যাচ্ছিল না।
কিন্তু কে দরজা খুলল!
