আমার মনে হয় এটা পুলিশের হাতেই তুলে দেওয়া ভালো।
না, না–ভুলেও ও-কাজ করবেন না। কর্নেল সেনকে বাধা দিলেন আনন্দ কাপুর, ওরা ভাববে এ-ব্যাপারে আপনারাই দোষী। পাথরটা হজম করতে না পেরে পুলিশে ফেরত দিচ্ছেন।
আমার কাছে হিস্টোরিক্যাল ভ্যালু আছে এমন সব মণিমুক্তো পাথরের একটা ক্যাটালগ আছে। আমি বরং দেখতে পারি পাথরটা সেরকম কোনও দরের পাথর কি না। হয়তো ঘটনাচক্রেই কলকাতার এসে পড়েছে–ঠিক কোহিনুরের মতো। বলে সারিকার দিকে ফিরলেন নীরেন বর্মা ও মিস মুখার্জি, আমার একটা কিউরিয়ো শপ আছে। তা ছাড়া আমার বাড়িতে একটা ছোট ল্যাবরেটরিও আছে। যদি পারমিশন দেন, তা হলে আমি পাথরটার ওপর দিনদুয়েক পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে আপনাকে তার রেজাল্ট জানাতে পারি।
সারিকা ইতস্তত করছে দেখে কর্নেল সেন ওকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এলেন না, বর্মা, তাতে লাভ কিছু হবে বলে আমার মনে হয় না। তার চেয়ে আমার মনে হয়, পুলিশে জমা দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
স্যার, আমি একবার দেখব– ঘাড় ফেরাতেই বিব্রত মেরিয়নের চোখে চোখ পড়ল কর্নেল সেনের। কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবলেন তিনি। তারপর বললেন, নাও, দ্যাখো।
সারি– এবার সারিকাকে লক্ষ করে তিনি বললেন, নিশীথ সান্যাল ফিরে এলে আমাকে একটা খবর দিস। আগে থেকেই মন খারাপ করিস না। হয়তো কোনও রিলেটিভের বাড়িতে গিয়ে বসে রয়েছে।
মিস মুখার্জি, আশা করি পাথরটার একটা ছবি তুলতে চাইলে আপনার কোনও আপত্তি থাকবে না? আনন্দ কাপুর জিগ্যেস করলেন।
না, না, আপত্তির কী আছে!
নীরেন বর্মা এবার প্রস্তাব দিলেন? বিক্রম, আর দেরি করে লাভ কী। নাও, তাসের প্যাকেট বের করো।
বিক্রম সেন করছি বলে ফিরলেন মেরিয়নের দিকে ও মেরিয়ন, দেখি, হারটা দাও।
আমি তো ওটা ডক্টর কাপুরের হাতে দিলাম। মেরিয়ন যেন বিস্মিত।
আমি ওটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখেছি। সহজ স্বরে জবাব দিলেন কাপুর।
হ্যাঁ, আমি আপনাকে টেবিলে নামিয়ে রাখতে দেখেছি। সারিকা গম্ভীর গলায় বলল, তবে ব্যাপারটা কী জানেন, চুনিটা সেখানে আর নেই।
সত্যিই, চুনি বসানো হারটা আর কোথাও নজরে পড়ছে না। যেন চোখের পলকে পাথরটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে!
.
০৫.
নিশ্চয়ই টেবিল থেকে গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে গেছে। আনন্দ কাপুর যেন সম্ভাবনাটা সম্পর্কে প্রায় নিশ্চিত।
অতএব সারিকা, নীরেন বর্মা, মেরিয়ন এবং ডক্টর কাপুর–চারজনেই উবু হয়ে বসে খোঁজাখুঁজি শুরু করলেন।
কিন্তু বহুক্ষণ পরিশ্রমের পরও চুনিটা পাওয়া গেল না।
অনুসন্ধান পর্ব-শেষ করে ওঁরা চারজনেই সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। সকলেই চুপ।
মিনিটপাঁচেক কেটে গেল নীরবতায়।
অবশেষে কথা বললেন কর্নেল সেন, মেরিয়ন, সদর দরজাটা বন্ধ করে দাও।
মেরিয়ন যন্ত্রের মতো এগিয়ে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
আমাকে এই মুহূর্তে যে কথাগুলো বলতে হবে তা বলতে হচ্ছে বলে আমি আন্তরিক দুঃখিত। শান্ত স্বরে বলে চললেন কর্নেল সেন, আমার ধারণা একটা কঠিন জড় পদার্থ কখনওই জ্যান্ত হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে না। এর জন্যে আমাদের পাঁচজনের একজনই দায়ী। জানি না, এটা কেউ অন্যমনস্কভাবে তুলে নিয়েছে কি না, তবে একটা সুযোগ আমি তাকে দিতে চাই। আমরা এখন সেই পুরোনো টেকনিকই ব্যবহার করব। আশা করি, সেই চান্সটা যে নেওয়ার সে নেবে।
তার মানে! আনন্দ কাপুরের ধৈর্যের বাঁধ যেন ভেঙে পড়ছে।
তার মানে এই ঘরের আলো দুমিনিটের জন্যে নিভিয়ে দেওয়া হবে। চুনিটা যে-ই নিয়ে থাকুক, আশা করি, দুমিনিট বাদে ঘরের আলো জ্বলে ওঠার পর চুনি বসানো হারটাকে আমরা আবার টেবিলের ওপরেই দেখতে পাব। অতএব…মেরিয়ন, ঘরের আলোগুলো সব নিভিয়ে দাও।
সেই একই যান্ত্রিক ভঙ্গিতে দরজার পাশে বসানো আলোর সুইচের দিকে এগিয়ে গেল মেরিয়ন। সুইচ অফ করে দিল।
মুহূর্তে নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে ঘরে ভরে গেল।
কান খাড়া করে প্রতীক্ষা করে রইল সারিকা। কিন্তু কই, কোনও শব্দই তো ওর কানে আসছে না! শুধু শোনা যাচ্ছে সকলের ভারী শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ।
নিজের রেডিয়াম ডায়াল হাতঘড়িতে চোখ রেখে অপেক্ষা করছিলেন বিক্রম সেন। দুমিনিট সময় পার হতেই তিনি স্পষ্ট স্বরে বললেন, মেরিয়ন, আলো জ্বেলে দাও।
খুট করে সুইচ অন করার শব্দের সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের আলো জ্বলে উঠল। সকলেই চোখ ফেরালেন টেবিলের দিকে।
না, চুনিটা তখনও অদৃশ্যই থেকে গেছে।
কাপুর, নীরেন–তোমরা আশা করি আমার পজিশনটা বুঝতে পারছ। আনন্দ কাপুর ও নীরেন বর্মার মুখের ওপর দিয়ে নজর বুলিয়ে নিলেন কর্নেল সেনঃ সুতরাং, তোমরাই বলো, আমার নেক্সট স্টেপ কী হওয়া উচিত।
একটু আমতা-আমতা করে বলেই ফেললেন নীরেন বর্মা, নিজেদের সার্চ করা ছাড়া আমি তো আর কোনও উপায় দেখছি না।
নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে হলে সেটাই তো একমাত্র পথ। সমর্থন জানালেন আনন্দ কাপুর।
তা হলে তাই হোক। সারি সারিকার দিকে ফিরলেন কর্নেল সেন : তুই আর মেরিয়ন একটু পাশের ঘরে যা। আশা করি দশ মিনিটের মধ্যেই আমাদের সার্চ করার কাজ শেষ হয়ে যাবে।
সারিকা কোনও কথা না বলে উঠে দাঁড়াল। পা বাড়াল পাশের ঘরের দিকে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেরিয়ন ওকে অনুসরণ করল।
ওরা দুজনে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই বিক্রম সেন বললেন, কাপুর, তুমি আর নীরেন এ-ওকে সার্চ করার কাজটা আগে সেরে নাও। আমি নজর রাখছি। তারপর তোমাদের হয়ে গেলে, তুমি অথবা নীরেন, যে-কেউ আমাকে সার্চ করতে পারো।
