কিন্তু কিন্তু কী করে এই হারটা ওই দোকানের শো-কেসে গেল? সারিকার প্রশ্ন।
বলা কঠিন। চিন্তিত মুখে জবাব দিলেন বিক্রম সেন, তুই তো বলছিলি রাস্তায় কেউ তোকে ফলো করছিল। সে হয়তো এই পাথরটার জন্যেই। এটার দাম হবে কম করেও পঁচিশ তিরিশ হাজার টাকা!
সারিকা এবার সম্পূর্ণ নতুন আলোর সমস্ত ঘটনা ভাবতে শুরু করল।
একটা ঝুটো পাথরের দোকানে এই মহামূল্য চুনিটা গেল কেমন করে! বাদশার দেখা ওই লোকটাই বা কে? নিশীথের নিরুদ্দেশ হওয়ার পিছনে এই চুনির কি কোনও ভূমিকা আছে?
ভাবতে-ভাবতে তড়িৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল ও। ওর মনে পড়ল, বাদশার নিশীথ যখন হারের বাক্সটা টেবিলে রেখে ট্যাক্সি ডাকতে যায়, তখন বাক্স থেকে হারটা বের করে সারিকা যেখানে আশ্চর্য। এই পচিমনটাকে ঘুরিয়ে ফিগালমাল হয়ে যেতে গলায় পরেছিল। ওর গায়ে ফারের কোট থাকায় চুনিটা লোমের কলারে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। নিশীথ আবার ফিরে এসে হারের বাক্সটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে পকেটে ভরে। হয়তো ও তখনও ভেবেছে হারটা বাক্সের ভেতরই আছে। তারপর সারিকাকে ফেলে রেখে নিশীথ বাক্স নিয়ে সরে পড়ে।
তা হলে কি নিশীথ জানত, চুনিটা নকল নয়, আসল, নিশ্চয়ই জানত। নইলে ওরকমভাবে সারিকাকে ফেলে চুনিটা নিয়ে কেন সরে পড়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু নিশীথের এই অদ্ভুত আচরণের কারণ কী? কেউ কি তখন নিশীথকে বাক্সটা নিয়ে পকেটে রাখতে দেখেছিল? তারপর সেই হয়তো নিশীথকে ফলো করেছে–আবিষ্কার করেছে বাক্সটা খালি। তাই হয়তো গত রাতে এসেছিল নিশীথের ফ্ল্যাটে।
ভাবতে-ভাবতে সারিকার সব কিছু গোলমাল হয়ে যেতে লাগল। ও গলা থেকে হারটা খুলে নিয়ে নতুন করে চুনিটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল।
আশ্চর্য! এই পঁচিশ-তিরিশ হাজার টাকা দামের পাথরটাকে অবহেলাভরে সঙ্গে নিয়ে ও যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়িয়েছে!
হঠাৎই আনন্দ কাপুরের কথায় সারিকার ঘোর কাটল? মিস মুখার্জি, আপনি যদি পারমিশন দেন তা হলে এই পাথরটার একটা ভ্যালুয়েশন করিয়ে আনতে পারি। আমার চেনাশোনা একজন জুয়েলার আছে।
তার কোনও দরকার নেই, কাপুর। বাধা দিলেন কর্নেল সেন, সারি তো আর ওটা বেচতে যাচ্ছে না! তবে এটুকু বেশ বোঝা যাচ্ছে, পাথরটার দাম অনেক সাধারণের কল্পনার বাইরে।
আপনি ঠিকই বলেছেন, কর্নেল, পাথরটা জেনুইন।
মেরিয়নের স্বরে ভীষণভাবে চমকে উঠলেন কর্নেল সেন। ও যে কখন তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে তিনি টেরই পাননি।
একটু বিরক্ত হয়েই হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে মেরিয়নের মুখোমুখি হলেন তিনি।
তোমাকে এ-ঘরে আসতে কে বলেছে? রক্ষস্বরে প্রশ্ন করলেন কর্নেল।
না–মানে–আপনি অনেকক্ষণ একা রয়েছেন…তাই ভাবলাম যদি কোনও দরকার হয়–
শাট আপ গর্জে উঠলেন কর্নেল সেন, ঢের হয়েছে, আর এক্সপ্লেইন করতে হবে না। তোমাকে মেজর চৌধুরী আয়া হিসেবেই দিয়েছেন, বডিগার্ড হিসেবে নয়।
মেরিয়নের মুখ আরক্ত হয়ে উঠল। ও মাথা নীচু করল।
এই জটিল মুহূর্তে হঠাৎই শোনা গেল কারও দরাজ কণ্ঠস্বর, আরে, কাপুর পৌঁছে গেছে। দেখছি! কিন্তু ব্যাপার কী, বিক্রম, তোমাকে দেখে বেশ বিরক্ত মনে হচ্ছে। মেরিয়ন কিছু করেছে। নাকি?
আগন্তুক কথা বলতে বলতে খোলা দরজা ছেড়ে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল।
মাথায় কাঁচা-পাকা চুল, কপালে বলিরেখা, চোখে-মুখে অভিজ্ঞতার ছাপ। ঠোঁটের কোণে সব সময়েই একটুকরো হাসি।
এসো, নীরেন। গভীর স্বরে আহ্বান জানালেন কর্নেল সেন, আজ একটা ইন্টারেস্টিং কাহিনি তোমাকে শোনাব। তারপর সারিকার দিকে ফিরে বললেন, আমার আর-এক বন্ধু– নীরেন বর্মা।
উপস্থিত প্রত্যেকের মুখে একপলক চোখ বুলিয়ে নিল আগন্তুক। তারপর মেরিয়নের দিকে ঘুরে বলে উঠল, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, মেরিয়ন–এক গ্লাস জল।
নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল মেরিয়ন।
ও চলে যেতেই মুখ খুললেন বিক্রম সেন। সারিকার পরিচয় দিয়ে বললেন ঝুটো পাথরের দোকান থেকে ওর আসল চুনি বসানো হার কেনার কথা।
কর্নেলের কথা শুনে ভীষণ কৌতূহলী হয়ে পড়লেন নীরেন বর্মা। বললেন, মিস মুখার্জি, পাথরটা একবার দেখতে পারি?
নিশ্চয়ই। গলা থেকে হারটা খুলে নীরেন বর্মার হাতে তুলে দিল সারিকা।
সেটাকে বিশেষজ্ঞের দৃষ্টি নিয়ে দেখতে লাগলেন তিনি। আপনমনেই বলে উঠলেন, হু– দাম হবে অ্যাক্সিমেটলি তিরিশ হাজার টাকা। কিন্তু আশ্চর্য! এই পাথরটা নিউ মার্কেটের দোকানে গেল কী করে! ডক্টর কাপুর, আপনার কী ধারণা?
সারিকা অবাক হয়ে আনন্দ কাপুরের দিকে তাকাতেই তিনি হাসলেন : মানুষের ডাক্তার নই : ইতিহাসে ডাক্তার। আমি জয়পুরিয়া কলেজের জনৈক প্রফেসর–এবং নিঃসন্দেহে ছাত্রদের কৃপার পাত্র।
সারিকা তার কথা বলার ভঙ্গিতে না হেসে পারল না। সেই হাসিতে সকলে যোগ দিলেন।
আপনার জল। মেরিয়নের দৃষ্টি নীরেন বর্মার হাতের পাথরটার দিকে।
থ্যাংক ইউ, গেলাসটা নিয়ে ঢকঢক করে জলটা খেয়ে নিলেন নীরেন বর্মা। গ্লাসটা রাখলেন সামনের টেবিলের ওপর। তারপর পাথরটা বিক্রম সেনের হাতে দিলেন বিক্রম, লক্ষ করো, পাথরটা কাটা হয়নি। অর্থাৎ, একটা বিশেষ কোনও কারণে এটাকে কাটা হয়নি। তা ছাড়া কারও পক্ষে এটাকে চুরি করাও মিনিংলেস। কারণ, এ-পাথর বিক্রি করাটা নেহাত সহজ হবে না। বাপারটা পুলিশের নজরে পড়বেই।
