স্বপ্নে দেখল, হাতে উল্কি আঁকা সেই আগন্তুক যেন ওর দিকে এগিয়ে আসছে। তার হিংস্র হাসি, হাতের দীর্ঘ জান্তব নখ, বাঁকানো আঙুল–সব মিলিয়ে সে এক বীভৎস দৃশ্য।
আতঙ্কে ঘুম ভেঙে গেল সারিকার। হাতের উলটোপিঠ দিয়ে গলার ঘাম মুছতে গিয়েই হাত ঠেকল লকেটটার।
এতক্ষণ এটার কথা খেয়ালই ছিল না ওর। মা-পিসিমাকে ও লকেটটা পরে দেখিয়েছে। পাথরটা দেখে ওঁরা কেউই ওটার দাম বিশ্বাস করতে পারেননি। সারিকারও কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছিল।
সারিকা ভেবে দেখল, যে-মুহূর্ত থেকে এই হারটা ও কিনেছে, সেই মুহূর্ত থেকেই সব অস্বাভাবিক ঘটনার শুরু। ও ঠিক করল আজ সন্ধেবেলা কর্নেল সেনের বাড়িতে যাবে। তাঁর কাছে এ-ব্যাপারে সাহায্য চাইবে। জানতে চাইবে–এক্ষেত্রে ওর কী করা উচিত।
বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সারিকা। এগিয়ে গেল ড্রইংরুমের টেলিফোনের দিকে। ফোন তুলে ডায়াল করল কর্নেল সেনের নম্বর।
একটু পরেই ও-প্রান্তে রিসিভার তোলার শব্দ হল।
কর্নেল সেন স্পিকিং।
আমি–আমি সারিকা।
ও—কী খবর বল? রণেন কেমন আছে?
ভালো–। রণেন সারিকার পিসেমশাইয়ের নাম।
হঠাৎই যে ফোন করলি! বয়স হলেও বিক্রম সেনের গলা থেকে গাঢ় সবুজ আত্মীয়তার স্বরটি কিন্তু মিলিয়ে যায়নি।
আজ সন্ধেবেলা তুমি ঘরে থাকছ তো? সারিকা ফোনে পাথরের ব্যাপারটা জানাতে চাইল না।
ঘরে থাকব না তো যাব কোথায়! ও-প্রান্তে হাসির শব্দ হল : ভগবান কি আর সে ক্ষমতা রেখেছে! তুই সন্ধেবেলা আয়, চুটিয়ে তাস খেলা যাবে। আরও দু-একজন আসবেন– তাদের সঙ্গে আলাপ করে তোর ভালো লাগবে। চলে আয়।
আচ্ছা–তা হলে সন্ধে সাতটা নাগাদ যাব। তোমার সঙ্গে দেখা করাটা ভীষণ দরকার।
কর্নেল সেন অবাক হয়ে কিছু বলে ওঠার আগেই রিসিভার নামিয়ে রেখেছে সারিকা।
.
কর্নেল সেনের বাড়িতে পৌঁছোনো পর্যন্ত নিশীথ আর সেই অদ্ভুত আগন্তুকের চিন্তায় সারিকার মন ডুবে রইল।
কলিংবেল টিপতেই সবসময়ের আয়া মেরিয়ন দরজা খুলে দিল। তারপর সারিকাকে দেখেই একগাল হেসে অভ্যর্থনা জানাল। বলল, কর্নেল সেন আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন। আসুন।
মেরিয়ন বাঙালি খ্রিস্টান। এতদিনকার আলাপ-পরিচয়ে সারিকা বুঝেছে, ও ভীষণ ধর্মভীরু। কর্নেল সেনের তত্ত্বাবধানের ভার মেরিয়নের ওপরে। বয়েস হয়েছে ওর, কিন্তু নানান আকর্ষণ এখনও ভোতা হয়ে যায়নি।
ড্রইংরুমে পা রাখতেই সারিকা অবাক হল। ঘরে খুব অল্প পাওয়ারের একটা নীল আলো জ্বলছে। ঘরের দূরপ্রান্তে, বুক-শেফের পাশে, হুইলচেয়ারে বসা একটা ছায়ামূর্তি। তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট।
সারিকা ঢুকতেই ছায়ামূর্তি সরব হল, কে, সারি এসেছিস? আয়, বোস।
কর্নেল বিক্রম সেন।
ঘরের আলো নেভানো কেন, কাকু?
এমনিই। তা ভীষণ দরকার বলছিলি ব্যাপারটা কী?
সারিকা ঘাড় ঘুরিয়ে একবার মেরিয়নের দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রম সেনের ভরাট স্বর শোনা গেল, মেরিয়ন, বড় আলোটা জ্বেলে দিয়ে তুমি একটু ও-ঘরে যাও।
মেরিয়ন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই সারিকা একটা চেয়ার টেনে কর্নেল সেনের কাছে বসল। পাথরের হার কেনা থেকে শুরু করে নিশীথের নিরুদ্দেশ হওয়া পর্যন্ত সব ঘটনা এক নিশ্বাসে বলে গেল। সবশেষে প্রশ্ন করল, এখন আমার কী করা উচিত বলো। সেটা জানতেই তোমার কাছে এসেছি।
সারিকার শেষ কথাগুলো কর্নেল সেনের কানেও ঢোকেনি। তিনি তখন অবাক চোখে চেয়ে আছেন সারিকার গলায় ঝোলানো পাথরের লাল লকেটটার দিকে। তার মুখ দিয়ে প্রশংসার একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল : অপূর্ব!
ঘরের আলো ঠিকরে পড়ছে রক্ত-লাল চুনিটার গা থেকে। ঠান্ডা আগুনের মতো ধকধক করে জ্বলছে পাথরটা।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘরের দরজা খুলে গেল। একটা তরল স্বর ভেসে এল দরজার কাছ থেকে, কী অপূর্ব, সেনসাহেব?
মুখ তুলে তাকালেন বিক্রম সেন। দেখলেন দরজায় কাছে দাঁড়িয়ে জনৈক দীর্ঘকায় পুরুষ।
হাত বাড়িয়ে তাকে আহ্বান জানালেন কর্নেল : এসো, কাপুর–এসো।
কাপুর ঘরে ঢুকতেই তার প্রশ্নের জবাব দিলেন কর্নেল সেন, অপূর্ব এই পাথরটা। ঘরের উজ্জ্বল আলোয় ঝলমল করতে লাগল চুনিটা।
কৌতূহলী হয়ে সারিকা চোখ ফেরাল আগন্তুকের দিকে। দীর্ঘকায় সুদর্শন চেহারা। চোখজোড়া অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। মাথায় ব্যাকব্রাশ করা কালো চুল।
সারিকার উৎসুক দৃষ্টিকে অনুসরণ করে হাসলেন কর্নেল সেন ও সারি–ইনি আমার বন্ধু– প্রতিদিনকার তাস খেলার সাথী আনন্দ কাপুর।…কাপুর, এ আমার ভাইয়ের ক্লোজ রিলেটিভ। দিল্লিতে পড়াশোনা করেছে। এখন ছুটিতে মাসখানেকের জন্যে মাকে নিয়ে কলকাতার বেড়াতে এসেছে। সারিকা মুখার্জি।
সারিকার নমস্কারের উত্তরে আনন্দ কাপুর প্রতি-নমস্কার জানালেন। বললেন, ওই পাথরটার ব্যাপারে আমি কিন্তু কর্নেল সেনের সঙ্গে একমত, মিস মুখার্জি। সত্যিই অসাধারণ।
কিন্তু পাথরটা নকল। সারিকা সহজভাবে কথাটা বললেও ভীষণভাবে চমকে উঠলেন আনন্দ কাপুর।
মাই গুডনেস! ইটস জাস্ট ইম্পসিবল! সারিকার দিকে এগিয়ে এসে তিনি কাছ থেকে ওর গলায় ঝোলানো পাথরটা ভালো করে দেখলেন : অসম্ভব! এটা যদি ঝুটো পাথর হয়, তাহলে আমার জুতোজোড়াও সোনার তৈরি!
সারিকা হতবাক। ওর বিস্ময়ের ভাবটা মুখ থেকে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই কর্নেল সেন গম্ভীর গলায় বললেন, সারি, কাপুর ইজ রাইট। পাথরটা আসল, যেমন আসল আমার আঙুলের এই চুনিটা। বলে নিজের ডান হাতের অনামিকাটা সারিকার সামনে বাড়িয়ে ধরলেন কর্নেল সেন। তার অনামিকায় জুলজুল করছে একটা ছোট চুনি।
