জারিন কোনও জবাব না দিয়ে সোজা চলে গেল নিশীথের শোওয়ার ঘরে।
কেউ নেই।
তারপর বাথরুম, কিচেন।
এবং সেখানেও কেউ নেই।
জারিন একটু পরেই ফিরে এল সারিকার কাছে। ওর মুখে এখন ভয়ের ছাপ।
ভেতরে কেউ নেই। জারিনের স্বর স্বাভাবিক নয়, আমরা কি পুলিশে খবর দেব?
তা ছাড়া আর তো উপায় দেখছি না। সারিকার মনে তখন চিন্তার ঝড় ও আমার মনে হয় ওই চেয়ারটা উলটে পড়ার শব্দই আমি শুনেছি। আর, ওই লোকটা নিজের গলার স্বর সাপ্রেস করার জন্যেই অমন গম্ভীর টোনে ফোনে কথা বলছিল।
জারিন কোনও জবাব দিল না। ও তখনও ঘরের উদ্ধৃঙ্খল চেহারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।
সারিকার মনে পড়ল বাদশার দেখা লোকটির কথা : যে লোকের উরুতে এই বেড়ালের ছবি উল্কি দিয়ে আঁকা থাকে, তার চলার সময় কোনওরকম শব্দ হয় না, আর, যার হাতে এই উল্কি থাকে, তার নখের আঁচড় হয় গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী।
সত্যিই তো, এই শক্ত বাঁধানো মেঝেতে চলাফেরা করলে একটু-আধটু শব্দ হবেই। অথচ সারিকা শত চেষ্টাতেও সেরকম কোনও শব্দ শোনেনি। তা হলে কি…?
কিন্তু কেন? তবে কি নিশীথ কোনওরকম বেআইনি কাজে জড়িয়ে পড়েছে?
আর বেশি কিছু ভাবতে পারল না সারিকা। তার আগেই জারিনের অস্ফুট চিৎকারে ও চমকে উঠল।
এটা–এটা তুমি কোথায় পেলে? জারিনের আঙুল সারিকার গলার দিকে।
কোনটা? গলার দিকে চোখ নামাল সারিকা, হাসল : ও এটা! এটা আজই কিনেছি নিউ মার্কেট থেকে।
জারিনের চোখে পরিপূর্ণ অবিশ্বাসের দৃষ্টি।
অত অবাক হওয়ার কিছু নেই। পাথরটা নকল। দাম মাত্র পঁচিশ টাকা। সারিকা বলল।
অসম্ভব! সারিকার কাছে সরে এল জারিন। হাতে নিয়ে পাথরটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পরখ করে দেখতে লাগল? কে দিয়েছে, নিশীথ?
উঁহু-আমি নিজেই কিনেছি। সারিকার মনে এবার সন্দেহ দেখা দিল।
জারিন হঠাৎই প্রসঙ্গ পালটাল : চলো, নীচে গিয়ে থানায় ফোন করা যাক।
নিশীথের ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে ওরা দুজন নেমে এল নীচে–জারিনের ঘরে। এগিয়ে গিয়ে রিসিভার তুলল জারিন, ডায়াল ঘোরাল : হ্যালো, পুলিশ স্টেশন?..
.
০৪.
পরদিন সকালটা পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের উত্তর দিতে দিতেই কেটে গেল।
পুলিশ ব্যাপারটাকে একেবারেই তেমন গুরুত্ব দিল না। কেবলই সন্দেহের নজরে সারিকার দিকে তাকাতে লাগল। যেন এই তুচ্ছ ব্যাপারে পুলিশে খবর দিয়েই ও একটা মারাত্মক ভুল করে বসেছে।
নিশীথ সম্পর্কে জারিন আর সারিকা যতটুকু জানে পুলিশকে জানাল। কিন্তু শত খোঁজাখুঁজি করেও নিশীথের কোনও ছবি পাওয়া গেল না।
পুলিশ-দলকে বিদায় দিয়ে ভীষণ ক্লান্তি বোধ করল সারিকা। চুপচাপ বিছানায় শুয়ে এলোমেলো ভাবনা ভেবে চলল।
গতকাল জারিনের ফ্ল্যাট থেকে ফিরে এসে অনেকক্ষণ দুশ্চিন্তায় কাটিয়েছিল ও। সম্রাট ওকে জোর করে লুডো খেলতে বসিয়েছিল, কিন্তু সারিকার খেলার দিকে মন ছিল না।
কী হচ্ছে, দিদি! তোমার পাঞ্জা পড়েছে–ছক্কা পাঞ্জা নয়! ঠিক করে দান দাও! সম্রাট অনুযোগ করে বলল।
এমন সময় পিসিমা চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন কী রে, তুই কোথায় বেরিয়েছিলি?
একটু জারিনের সঙ্গে গল্প করতে গিয়েছিলাম।
সারিকা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না পিসিমাদের সবকিছু বলবে কি না।
কিন্তু কাল তো পুলিশ আসবে! তখন জানাজানি তো হবেই! পিসেমশাই যেরকম ভীতু লোক–হয়তো চিন্তার অস্থির হয়ে পড়বেন! সারিকাকে হয়তো সাত-তাড়াতাড়ি দিল্লিতে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু নিশীথকে বিপদের মধ্যে ফেলে ও এখন দিল্লি যেতে চায় না।
চা খেতে-খেতে ও পিসিমাকে নিশীথের ফ্ল্যাটের ব্যাপারটা বলল। বলল যে, ও আর জারিন ওপরে নিশীথের ফ্ল্যাটে গিয়েছিল। ব্যাপার-স্যাপার দেখে ওরা থানায় খবর দিয়েছে।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর মা, পিসিমা, পিসেমশাই আর সারিকা আলোচনায় বসল।
সারিকা বারবার করে সবাইকে বোঝাল যে, দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই। সেরকম কোনও সমস্যা হলে ও কর্নেল বিক্রম সেনকে সব জানাবে। কর্নেলকাকু অতি সহজেই এসব সামাল দিতে পারবেন।
সারিকার পিসেমশাইয়ের কীরকম যেন ভাই হন কর্নেল বিক্রম সেন। বেশ কিছুদিন হল মিলিটারি থেকে রিটায়ার করেছেন। কলকাতার বেড়াতে এসে ওঁর সঙ্গে প্রথম আলাপেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল সারিকা। কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা রয়েছে কর্নেলের ঝুলিতে। ভদ্রলোক বিপত্নীক, নিঃসন্তান, আর ভীষণ স্নেহপ্রবণ। মাত্র কয়েকবার দেখা-সাক্ষাতেই সারিকাকে ঠিক যেন নিজের মেয়ের মতোই ভালোবেসে ফেলেছেন।
কর্নেল পঙ্গু। এখন সারাটা দিন হুইলচেয়ারে বসে কাটান। বাড়িতে আয়া, চাকর-বাকরের অভাব নেই। তা ছাড়া বন্ধু-বান্ধব নিয়ে রোজ সন্ধেবেলা নিজের ড্রইংরুমে তাসের আড্ডা বসান।
সারিকার এখন মনে হল, কর্নেলকাকুকে সব জানানো দরকার।
মা, পিসিমা, পিসেমশাই শুধু দুশ্চিন্তাই করতে পারবেন। তাতে কাজের কাজ কিছু হবে না। কর্নেল সেনের অনেক যোগাযোগ আছে। তিনি হয়তো এ-রহস্যের জট ছাড়ানোয় সাহায্য করতে পারবেন।
কিন্তু হঠাৎই কেন যে সারিকার মন ঝুঁকে পড়ল নিশীথ সান্যালের দিকে!
এই সহজ কথাটা নিশীথ নিরুদ্দেশ হওয়ার আগেও কেউ যদি সারিকাকে বলত–তা হলে ও হয়তো খুব একটা পাত্তা দিত না। কিন্তু এই মুহূর্তে ও নিশীথের সঙ্গে বন্ধুত্বের অন্যরকম অর্থ যেন খুঁজে পাচ্ছিল। নিশীথের কথা ভাবতে-ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল ও।
