এক অদ্ভুত ঘোরে সারিকা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। এই সামান্য নকল পাথরের দীপ্তি ওকে বারবার অবাক করল। একইসঙ্গে আবার মনে পড়ল হারিয়ে যাওয়া নিশীথের কথা। ও বাড়ি ফিরে এল কি না সেটা খোঁজ করা দরকার।
প্রথমে ও ঠিক করল, সোজা ওপরে নিশীথের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখবে ও ফিরেছ কি না। কিন্তু পরক্ষণেই কী ভেবে মত পালটাল। ও সোজা এগিয়ে গেল বসবার ঘরে। ঘরের এক কোনে ছোট টিপয়ের ওপর বসানো টেলিফোন। পাশেই ছোট মাপের টেলিফোন-বই।
নিশীথের ফোন নম্বর খুঁজে বের করে সতর্ক আঙুলে ডায়াল করল ও।
একটু পরেই কানে-চাপা রিসিভারে শোনা গেল ক্রিং ক্রিং শব্দ।
সেকেন্ড দশেক পর কেউ এসে অপর প্রান্তে রিসিভার তুলে নিল।
সারিকা উৎকণ্ঠ, কৌতূহলে উদগ্রীব।
হ্যালো গম্ভীর পুরুষ কণ্ঠস্বর।
কে, নিশীথ?
আপনার কত নম্বর চাই?
৪৬-৩৫১৬। ভয়ে-ভয়ে বলল সারিকা।
সরি, রং নম্বর–।
কট করে লাইন কেটে দেওয়ার শব্দে ভীষণ অপমানিত বোধ করল ও। সেইসঙ্গে মনে একটা সন্দেহও দানা বাঁধতে শুরু করল। সত্যিই কি ওর রং নম্বার হয়েছে?
উঁহু–অসম্ভব। কিন্তু নিশীথই যদি ফোন ধরে থাকবে, তা হলে অমন অভদ্রের মতো লাইন কেটে দেবে কেন? তা হলে কি অন্য কেউ নিশীথের ফ্ল্যাটে ঢুকেছে?
দ্বিধাগ্রস্ত মনে আবার নিশীথের নম্বর ডায়াল করল ও।
কিন্তু ফোন বেজেই চলল, কেউ আর ধরল না।
ফোন রেখে দিতে যাবে, এমন সময় ওপরের ঘরে একটা ভারি কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দে চমকে উঠল সারিকা। তা হলে কি ওর সন্দেহই সত্যি? নিশীথ কোনও বিপদে জড়িয়ে পড়েনি তো!
চট করে ফোন নামিয়ে রাখল ও। মাকে বলল, আমি জারিনের ঘর থেকে একটু আসছি। তারপর একটা শাল নিয়ে গায়ে জড়িয়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। দেখল, জারিনের ঘরে তখনও অলো জ্বলছে। ও এগিয়ে গিয়ে জারিনের দরজায় ধাক্কা মারল। একবার, দুবার।
দরজা খুলতেই সারিকা দেখল স্লিপিং গাউন পরা জারিন ওর সামনে দাঁড়িয়ে।
কী ব্যাপার, সারি?
জারিন, আমার–আমার মনে হয়, ওপরে নিশীথবাবুর ফ্ল্যাটে কেউ ঢুকেছে।
যদি পুরো ব্যাপারটাই আমার মনের ভুল হয়, তা হলে! মনে-মনে ভাবল সারিকা। তা হলে এ নিয়ে হাসাহাসির সীমা থাকবে না।
তার মানে? জারিনের ভুরুজোড়া কুঁচকে উঠল।
সারিকা সংক্ষেপে ওকে সন্ধেবেলার সব ঘটনা জানাল।
সব শুনে জারিন হাসলঃ চিন্তার কিছু নেই, সারি। এই ভ্যানিশ হওয়ার ব্যাপারটার একটা সিম্পল এক্সপ্লানেশান আছে–অবশ্য যদি তুমি কিছু মনে না করে তা হলে বলছি।
আমি জানি তুমি কী বলবে। জারিনকে বাধা দিয়ে বলে উঠল সারিকা, কিন্তু একটা কথা তুমি হয়তো ঠিক জানো না, জারিন–নিশীথবাবুর সঙ্গে আমার রিলেশন এমন কিছু থিক নয় যে, আমাকে অ্যাভয়েড করার জন্যে ওঁকে ওরকম চালাকি করতে হবে। নেহাত উনি আমাদের জানাশোনা, তাই চিন্তা করছি তার বেশি কিছু নয়। তা ছাড়া, একটু আগেই আমি ওঁর ফ্ল্যাটে ফোন করেছিলাম। কে যেন ফোন ধরে ভারি গলায় বলে দিল, রং নম্বর।
হতে পারে, হয়তো সত্যিই তোমার রং নম্বর হয়েছে। জারিন ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করল।
তা পারে– চিন্তিত মুখে জবাব দিল সারিকা, কিন্তু তার ঠিক পরেই আমি আবার ফোন করেছিলাম। তখন কেউ ফোন ধরল না। অথচ নিশীথবাবুর ফ্ল্যাটে ভারি কিছু উলটে পড়ার শব্দ শুনতে পেয়েছি।
তাই নাকি? জারিন এবার অবাক হল।
হ্যাঁ। চলো, আমরা দুজনে একবার ওপরটা দেখে আসি।
সঙ্গে-সঙ্গেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল জারিন। সারিকার দিকে চেয়ে হাসল ও চলো৷ নিশীথের খোঁজ নেওয়া উচিত। আই লাইক হিম।
সারিকা অবাক চোখে ঘাড় ফিরিয়ে দেখল জারিনের দিকে।
চুপচাপ ওরা দুজনে পাশাপাশি সিঁড়ি ভাঙতে লাগল। সারিকার বুক দুরুদুরু–যদি সত্যিই নিশীথের ঘরে কেউ ঢুকে থাকে, তা হলে! ওরা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। এই রাতের আগন্তুক যদি কোনও অস্ত্র নিয়ে ওদের আক্রমণ করে। তা ছাড়া পিসিমা-পিসেমশাই জানতে পারলেই বা কী ভাববেন!
এই সব এলোমেলো কথা ভাবতে-ভাবতে নিশীথের ফ্ল্যাটের দরজায় এসে দাঁড়াল ওরা। এক মুহূর্ত এ-ওর দিকে তাকিয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। তারপর বুক ভরে এক গভীর শ্বাস টেনে নিয়ে দরজায় নক করল সারিকাই।
কোনও উত্তর নেই।
নিশীথ-নিশীথ কিন্তু জারিনের ডাকের কোনও উত্তরই ভেসে এল না ঘরের ভেতর থেকে।
অগত্যা দরজায় হাতল ঘোরাল সারিকা। এবং ওদের অবাক করে দিয়ে বিনা বাধায় দরজা খুলে গেল।
ঘরের ভেতরটা অন্ধকার–শুধু বাইরের ল্যান্ডিংয়ের একফালি আলো গিয়ে পড়েছে ঘরের ভেতরে। নিশীথের ফ্ল্যাটের ওপরেই বাড়ির ছাদ। সুতরাং সাতনম্বর তলায় ফ্ল্যাটের সংখ্যা একটাই। সাহায্য করার মতো প্রতিবেশী সাততলায় কেউ নেই।
একইসঙ্গে পা ফেলে ঘরের ভেতর পা রাখল জারিন ও সারিকা। হাত বাড়িয়ে জারিন আলোর সুইচ অন করল। উজ্জ্বল আলো ঠিকরে পড়ল ঘরের মেঝেতে। এবং সেই আলোর ঘরের অভ্যন্তরীণ দৃশ্য দেখে একটা অস্ফুট চাপা আর্তনাদ করে উঠল সারিকা।
ঘরটা যেন আধুনিক কুরুক্ষেত্র। সমস্ত আসবাবপত্র জামাকাপড় খুশিমতো যেখানে-সেখানে ছড়ানো। টেবিলের ড্রয়ার, আলমারি সব ভোলা। একটা ভারি চেয়ার ঘরের এক পাশে উলটে পড়ে আছে।
জারিনের দিকে চোখ ফেরাল সারিকা। দেখল, জারিন স্তম্ভিত।
তা হলে দেখছি আমার কথাই ঠিক। নিশীথবাবুর ঘরে কেউ ঢুকেছিল। আলতো গলায় বলল সারিকা।
