অনেকদিন বাদে মুনিয়ার খেয়াল হয়েছিল, শুধু তপতী কেন, সে নিজেও তো ছিল ওই ফোটোটার মধ্যে ৷ তখনই জীবনে প্রথমবার সে রঞ্জনের চোখের দিকে সত্যিকারের চোখ মেলে তাকিয়েছিল, আর সেখানে যা দেখেছিল তাতে তার মন অসাড় হয়ে গিয়েছিল ৷ কোনো মানুষের চোখে এতটা কষ্ট জমে পাথর হয়ে থাকতে পারে?
কিন্তু তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে ৷ বাবা আসানসোলের ব্যবসায়ী-পাত্র কৌশিকের সঙ্গে তার বিয়ের কথা পাকা করে ফেলেছেন ৷ অন্যদিকে রঞ্জন এক অল্পশিক্ষিত বেকার ৷
স্মৃতি থেকে হঠাৎই মুনিয়াকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনল অদ্ভুত এক আওয়াজ ৷ চিৎকার নয়, শেয়ালগুলো এখন খুশিতে মুখ দিয়ে কেমন একটা কুঁক কুঁক শব্দ করছে ৷ মুনিয়া বিছানা ছেড়ে আবার জানলার কাছে গিয়ে দেখল যা ভেবেছিল, ঠিক তাই ৷ রঞ্জন শিবাভোগ দিচ্ছে ৷ কী ভীষণ রোগা হয়ে গেছে মানুষটা! সাদা ধুতি আর সাদা উড়নিতে একটুকরো জমাট বাঁধা জ্যোৎস্নার মতনই মনে হচ্ছিল ওকে ৷
কাজ শেষ করে রঞ্জন ফিরে যাচ্ছিল বাড়ির দিকে ৷ হঠাৎ কী মনে হতে চোখ তুলে তাকাল পাশের বাড়ির দোতলার জানলার দিকে ৷ দেখল মুনিয়া দাঁড়িয়ে রয়েছে ৷ অনেকক্ষণ নড়তে পারল না রঞ্জন ৷ তার পা দুটো যেন মাটিতে গেঁথে গেল ৷ মুনিয়ার বুকটা ধক করে উঠল ৷ এ তো সন্ন্যাসীর দৃষ্টি নয় ৷ উন্মাদের তো নয়ই ৷ মুনিয়া পরিষ্কার বুঝতে পারল, রঞ্জনের দুটো চোখের কাজলকালো মণি ওকে আদর করছে ৷ বলছে, কতদিন বাদে এলি মুনিয়া!
মুনিয়া রঞ্জনের চোখ থেকে চোখ সরাল না ৷ সেও মনে মনে বলল, আমি তোমার জীবনটা নষ্ট করে দিলাম রঞ্জুদা৷ কিন্তু বিশ্বাস করো, আমিও ভালো নেই ৷ একদম ভালো নেই ৷ আমার বরটা মানুষ নয় ৷
বলল, তোমাকে সব কথা বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু তুমি কী বুঝবে?
বলল, কত ভালো হত, যদি আমাদের দুজনের বিয়ে হত? সে তো এজন্মে আর হবে না, তাই না রঞ্জুদা?
কিছুক্ষণ মুনিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে রঞ্জন নিজের বাড়ির দিকে চলে গেল ৷ মুনিয়া শুনল কাজের মাসি কমল তাকে নিচ থেকে ডাকছে ৷ ও দিদি, রাতে কী রান্না হবে একটু বলে দিয়ে যাও না ৷
আঁচল দিয়ে ভালো করে চোখদুটো মুছে নিয়ে মুনিয়া সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল ৷
.
কৌশিক হালদারের স্নায়ুগুলো কেমন যেন অবশ হয়ে আসছিল ৷ মাথার মধ্যে নানান চিন্তা তালগোল পাকিয়ে একাকার ৷ এখানে খবরের কাগজ পৌঁছয় বিকেলে ৷ সেই কাগজ পড়বার জন্যই দেড় কিলোমিটার হেঁটে সে পাণ্ডবেশ্বরের বাসরাস্তায় গিয়েছিল ৷ সেখানে একটা ঝুপড়ি চায়ের দোকানে বসে চায়ের ভাঁড়টা সামনে রেখে কাগজের দ্বিতীয় পাতাটা ওল্টাতেই তার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল ৷ কেসটা রাজ্য পুলিশ ট্রান্সফার করেছে সি আই ডি-কে ৷
তার মানে মেয়েটার সেই পলিটিশিয়ান জ্যাঠা আসরে নেমে পড়েছেন ৷ সুতো টানছেন পেছন থেকে ৷ ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিল কৌশিক ৷
এমনিতে ব্যাপারটা যে বেশিদূর গড়াত না, সে ব্যাপারে কৌশিক নিশ্চিত ছিল ৷ জেট-এজের এই একটা সুবিধে ৷ কেউ বেশিদিন কিছু মনে রাখে না ৷ মিডিয়া মনে না রাখলে পুলিশের দায় পড়েছে ব্যাপারটা নিয়ে বেশি নাড়াঘাটা করার ৷ আর এ ক্ষেত্রে দেবযানীর বাবা-মাও বোধহয় চাইত স্ক্যান্ডালটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ধামাচাপা পড়ুক, কারণ ওদের আরেকটা মেয়ে আছে ৷ কিন্তু এখন ব্যাপারটা সহজে মিটবে না ৷
যদিও কৌশিক যতটা সম্ভব পেছনের সমস্ত প্রমাণ লোপাট করতে করতে এগিয়েছে, তবু, কোথাও কি সে কোনো সূত্র ফেলে আসেনি?
বেকার এই টেনশন নিতে গেল সে ৷ শালা, শয়তান ভর করেছিল মাথায় ৷ চায়ের খালি ভাঁড়টাকে এক লাথিতে ছিটকে দিয়ে রাস্তায় নামল কৌশিক ৷ কোনো ক্ষতি তো করেনি তার দেবযানী ৷ কেন যে শুধু শুধু দেবযানীকে সে . . . ৷
বুকের ভেতর একটা ছোট্ট কাঁটার খোঁচা টের পায় কৌশিক ৷ ও ছিল মেয়েটার প্রথম প্রেম ৷ ওঃ! ভাবা যায়? কী আকুলতা, কী তীব্র প্যাশন সেই আঠেরো বছরের হৃদয়ের! কৌশিককে দেখলেই ওর মুখে যেন একশো – আট প্রদীপের আলো জ্বলে উঠত ৷
কৌশিক আবার ভাবল, কেন অমন পাপ সে করল? সে কি রাগের মাথায়?
নাঃ ৷ দালালি করে যাকে পয়সা রোজগার করতে হয় তার রাগলে চলে না ৷ যে তাকে শুয়োরের বাচ্চা বলে, তাকেও কৌশিক সেলাম বাজায়, যদি সে তার ক্লায়েন্ট হয় ৷ কাজেই রাগের অনুভূতিটা তার অনেকদিন আগেই ভোঁতা হয়ে গেছে ৷
তাহলে?
এই তাহলে’র জবাবটা কৌশিক খুব ভালো করে জানে ৷ ইচ্ছে করলেও সেটাকে সে এড়িয়ে যেতে পারছে না ৷ উত্তরটা এই যে, সেদিন কৌশিক যা করেছে, নেশার ঝোঁকে করেছে ৷
খুব বেশিদিন কোডেনের শট নিলে যে নিজের অ্যাকশনের ওপর থেকে কন্ট্রোল চলে যায় এই কথাটা সে এতদিন কানে শুনেছিল ৷ রিসেন্টলি, তার নিজের কেসে ঠিক সেটাই হচ্ছে ৷ হরদম নানান বাওয়ালি করে ফেলছে সে ৷ কৌশিক জানে আর কিছুদিন পরে বাওয়ালিগুলোকে বাওয়ালি বলে চেনার ক্ষমতাটুকুও তার চলে যাবে ৷ তারপর? তারপর সে একটা ঘুমতা-ফিরতা লাশ হয়ে যাবে, যেরকম জ্যান্ত-লাশ মাঝে মাঝে দেখা যায় পার্কস্ট্রিট কবরখানার সামনে কিংবা ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ফুটপাথে — আকাশের দিকে ফাঁকা চোখ তুলে বসে আছে ৷
আপাতত চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে কৌশিক দেখল তাঁর হাতের আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে ৷ কিছুতেই সে সেই কাঁপুনি থামাতে পারছে না ৷ কৌশিক নিজের মনেই হাসল ৷ সে জ্ঞানপাপী, তাই জানে যে এই কাঁপুনিকে পাতাখোরদের ল্যাঙ্গুয়েজে বলে ‘টার্কি’ ৷ বেশিক্ষণ ড্রাগ না পেলে নার্ভের এই খিঁচুনি শুরু হয়ে যায় ৷
