আর যদি বেশ কয়েকদিন অ্যাডিক্টদের হাতে ড্রাগ দেওয়া না হয়?
কৌশিক শুনেছে রিহ্যাবিলিটেশন- সেন্টারের দেয়াল নখ দিয়ে আঁচড়ে আঁচড়ে দশটা আঙুল রক্তাক্ত করে ফেলে সেখানকার ইন-মেটস-রা ৷ দেয়ালে মাথা খুঁড়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলে এক পুরিয়া চরস কিংবা হেরোইনের একটা শট-এর জন্যে ৷
কৌশিক বুঝতে পারে তার জন্যেও সেই দিন আর খুব বেশি দূরে নেই ৷ কিন্তু আপাতত মাথার ভেতরের ধোঁয়াটে ভাবটা কাটাবার জন্যে চাই… ৷
কৌশিক রাস্তার ধারে একটা রাঙচিতার ঝোপের পেছনে গিয়ে বসল ৷ তারপর কাঁধের ব্যাগ থেকে একে একে বার করল ট্যাবলেট, জলের বোতল, তুলোর টুকরো ৷ ট্যাবলেটটা অল্প জলে গুলে তুলোর টুকরোর মধ্যে দিয়ে ছেঁকে নিল৷ সবশেষে বার করল ছোট একটা ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ৷ অভ্যস্ত হাতে সল্যুশনটাকে কনুইয়ের একটু ওপরে মাসলের মধ্যে ইনজেক্ট করে দিল ৷
আঃ! এবার শান্তি ৷ ক্রমশ কৌশিকের হাতের কাঁপুনি থেমে গেল, কিন্তু বুকের কাঁপুনিটা তখনই থামল না ৷ খবরের কাগজে যা পড়ল, তাতে সে বেশ বুঝতে পারছে, এখন কিছুদিন তাকে এখানেই থাকতে হবে ৷ শ্বশুর যতক্ষণ আছে খাওয়াদাওয়ার অসুবিধে হবে না ৷ কিন্তু খাওয়াদাওয়ার চিন্তা সে করেও না ৷ যত দিন যাচ্ছে তার খিদে কমে আসছে৷ সব রকমের খিদে ৷ ভাত দেখলে গা গুলোয় ৷ মেয়েমানুষ দেখলেও গা গুলোয় ৷ শুধু একটা জিনিসের জন্যেই মনপ্রাণ আকুল হয়ে থাকে ৷ ট্যাবলেট ৷ কিন্তু বড় দাম শালা ট্যাবলেটের ৷ পয়সা থাকলে এই অজগ্রামেও সাপ্লাই ঠিক চলে আসবে ৷ ওই পাণ্ডবেশ্বর মোড়ে গিয়ে দাঁড়ালে আসানসোল থেকে হকার এসে মাল দিয়ে চলে যাবে ৷ কিন্তু পয়সাটাই তো ফুরিয়ে আসছে ৷ মুনিয়ার কাছে চাইবে? বলবে, তোমার বাবাকে বলো ধার দিতে? হারগিস দেবে না মুনিয়া ৷ মহা ঠ্যঁাটা মেয়েছেলে ৷ তার ওপর এখন নিজের জায়গায় আছে ৷
কিন্তু আর বেশিক্ষণ এসব জাগতিক ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাতে পারল না কৌশিক ৷ তার মাথার ভেতর রঙিন আলোর নাচানাচি শুরু হয়ে গেল ৷
বেসামাল পায়ে কৌশিক উঠে দাঁড়াল, তারপর ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে পা দিল রাস্তায় ৷ আকাশে এখনো আলো আছে ৷ এখনই বাড়ি ফেরার কোনো মানেই হয় না ৷ বাড়ি ফেরা মানেই তো সেই মুনিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ানো ৷
নিজের বউ হলেও এই মেয়েটাকে দেখলে কেমন যেন অস্বস্তি হয় কৌশিকের ৷ ও পরিষ্কার বুঝতে পারে মুনিয়া তাকে ঘেন্না করে, ভীষণ ঘেন্না করে ৷ মুশকিল হচ্ছে, মুনিয়া ঘেন্না ছাড়া আর কিছুই করে না ৷ ও যদি চিৎকার করত, ঝগড়া করত, গড়পড়তা মেয়েরা যেমন করে, তাহলে কৌশিকও একটা প্রতিক্রিয়া দেখাবার সুযোগ পেত ৷ সে মুনিয়ার কব্জি মুচড়ে দিতে পারত, চুলের গোছা টেনে ছিঁড়ে দিতে পারত, এমনকী তার পিঠে সিগারেটের ছ্যাঁকাও দিতে পারত ৷ কিন্তু কৌশিক কিছুই করতে পারে না ৷ মুনিয়া তাকে কোনো সুযোগ দেয় না ৷
কৌশিক তাই যতক্ষণ পারে মুনিয়াকে এড়িয়ে চলে ৷
আর সেইজন্যেই কৌশিক তখনই বাড়ি ফিরল না ৷ সে হাঁটা লাগাল নদীর দিকে ৷ কিছুটা যাবার পর তার চোখে পড়ল নদীর চরে সারি সারি হোগলা আর দরমার ছোট ছোট ঝুপড়ি ৷ নেশার ঘোরে পুরো ব্যাপারটাই তার একটা স্বপ্নের মতন মনে হচ্ছিল, যেন একটা রূপকথায় পড়া বামনের দেশ ৷ ওটা কী? কারা থাকে ওখানে?
কিছু না বুঝেই মেলার দিকে হাঁটা লাগাল কৌশিক ৷
কৌশিক বাড়ি ফিরল রাত বারোটায় ৷ মুনিয়া দরজা খুলে দিল ৷
নেশা করে এসেছে ৷ সেটা নতুন কিছু নয় ৷ আসানসোলেও ও প্রতিদিন ড্রাগ নিয়েই বাড়ি ফিরত ৷ মাঝে মাঝে কাঁদত, মাঝে মাঝে হাসত, তবে ঘুমিয়ে পড়ত খুব তাড়াতাড়ি ৷
এ সব নোংরা ব্যাপার নিয়ে খুব বেশিক্ষণ মাথা ঘামাতে চায় না মুনিয়া ৷ সত্যি কথা বলতে কি, কৌশিক নামে ওই লোকটার অস্তিত্বই সে ভুলে যেতে চাইছে ৷
এমনিতে তাতে খুব একটা অসুবিধে ছিল না, কারণ কৌশিকের সঙ্গে তার সারাদিনে কতবার দেখা হয়, ক’টা কথা হয়, তা হয়তো হাতের একটা আঙুলে গুনেই বলে দেওয়া যায় ৷ কিন্তু কৌশিকের অস্তিত্ব ভুলতে দেয় না তার পাওনাদারেরা ৷ সারাদিনের মধ্যে চোদ্দোবার তাদের ফ্ল্যাটের কলিংবেল বাজে আর মুনিয়া দরজা খুলে পাওনাদারদের গালাগাল শোনে ৷ রান্না নয়, খাওয়া নয়, সেলাই নয়, ফোঁড়াই নয়, সংসারের কোনো কাজই নয়— একেকদিন নির্জন দুপুরে চোখের জলে ভাসতে ভাসতে মুনিয়া ভাবে— তার একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে পাওনাদার ঠেকানো ৷ কী বিচ্ছিরি কথা যে বলে যায় গুন্ডার মতন লোকগুলো সে বলার মতন নয় ৷ যাবার সময় তারা প্রায় সকলেই দেয়ালকে শুনিয়ে বলে যায়, শুয়োরের বাচ্চা হালদার যদি এমনিতে টাকার জোগাড় না করতে পারে তো এমন ছমকছল্লু বউটাকে বাজারে নামিয়ে দিক না ৷ দুদিনে ধার শোধ হয়ে যাবে ৷
বিয়ের আগে মুনিয়ারা শুনেছিল, কৌশিক ইঞ্জিনিয়ার ৷ বিয়ের পরে শুনল ঠিকাদার ৷ আরো পরে জানল, জমি-বাড়ির দালাল ৷ কিন্তু আসলে কৌশিক হালদার নামে লোকটা যে কী, তা মুনিয়া এই চার বছরেও বুঝতে পারল না ৷ যেটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায় তা হল সে ড্রাগ-অ্যাডিক্ট, জুয়াড়ি এবং সপ্তাহে অন্তত দুবার লছিপুরের ঢালে না গেলে তার চলে না ৷ বেশ্যাবাড়ি যাওয়ার অভ্যেসটা অবশ্য ক্রমশ কমে আসছে ৷ মুনিয়া বুঝতে পারে পাতা খেয়ে খেয়ে কৌশিক ক্রমশ ঢোড়া হয়ে যাচ্ছে ৷ আরো একটা ব্যাপার বুঝতে পারে মুনিয়া ৷ এইসব কাজে যে টাকার দরকার হয় তা জোগাড় করবার জন্যে কৌশিক ভিক্ষে থেকে শুরু করে যে-কোনো পথ নিতে পারে ৷ লোকটা কতটা নিচে নামতে পারে তার কোনো লিমিট নেই ৷
