শলাকাবিদ্ধ সেই সুরসুন্দরীকে পাশ কাটিয়ে অন্যদের সাথে ঈশান এগোল সামনের দিকে ৷
বোবা রাজপুত্র – সৈকত মুখোপাধ্যায়
জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল মুনিয়া ৷ ঘরে এখন সে একা ৷ কৌশিক বিকেল হতেই সেই যে কোথায় টহল মারতে বেরিয়েছে, এখনও ফেরার নাম নেই ৷ অবশ্য বিয়ের পর থেকে গত চারবছরে একা থাকতেই সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে ৷ রাতে শোয়ার সময়টুকু ছাড়া কৌশিকের সঙ্গে তার দেখা হয় না, তা সে আসানসোলে নিজের বাড়িতেই হোক বা এই তুষকাঠি গ্রামের বাপের বাড়িতে ৷ কৌশিক এইরকমই ৷ নির্মম ৷ ধান্দাবাজ ৷
জানলা দিয়ে অজয় নদের বালির চড়া দেখতে পাচ্ছিল মুনিয়া ৷ রাত বেশি হয়নি, হয়তো সন্ধে সাতটা হবে ৷ তবু এর মধ্যেই নদীর বুকে ঘন হয়ে উঠেছিল কুয়াশার চাদর ৷
হঠাৎ কানের কাছে বীভৎস এক চিৎকারে মুনিয়ার বুকটা কেঁপে উঠল ৷ উঃ, বাবা গো, বলে সে তাড়াতাড়ি জানলার সামনে থেকে পিছিয়ে এল ৷ খুব কাছেই কোথাও ডাকছে শিয়ালগুলো ৷ এখন জন্তুগুলোকে দেখা যাচ্ছে না, তবে কাল ওদের দেখেছিল মুনিয়া ৷ কাল গভীর রাতে ৷
সেই কথা মনে পড়তেই আবার একটা তীব্র অস্বস্তি তার বুকে পাথরের মতন চেপে বসল ৷ কাল পাশের বাড়ির রঞ্জুদা শিবাভোগ দিচ্ছিল ৷ এই জানলায় দাঁড়িয়েই মুনিয়া চাঁদের আলোয় ওকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল ৷ মুনিয়ার বাড়ি আর রঞ্জুদাদের বাড়ির মাঝখানে যে বাগানটা, সেটার বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে রঞ্জুদা প্রসাদের মন্ড ছুড়ে দিচ্ছিল অন্ধকারে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকা শেয়ালগুলোর দিকে ৷ হুটোপাটি লেগে গিয়েছিল জন্তুগুলোর মধ্যে ৷ জোড়ায় জোড়ায় জ্বলন্ত চোখ ছুটে বেড়াচ্ছিল ওকে ঘিরে ৷ আজকেও রঞ্জুদা শিবাভোগ দেবে নিশ্চয় ৷ রাতচরা জন্তুগুলো ওর প্রতীক্ষাতেই ঘোরাফেরা করছে ওদের বাড়ির আশেপাশে, আর মুনিয়ার বুক কাঁপিয়ে দিয়ে হঠাৎ হঠাৎ ডেকে উঠছে উল্লাসে ৷
জানলার ধার থেকে সরে গিয়ে বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল মুনিয়া ৷ চোখটা বার বার জলে ভরে উঠছিল তার ৷ মনে মনে সে ভাবছিল— এ কী হল! রঞ্জুদা সন্ন্যাসী? খ্যাপা? উদাসীন? রঞ্জুদা পাগল হয়ে গেছে?
মুনিয়ার মনে পড়ল, ছোটবেলায় তার ঠাকুমাকে প্রায়ই একটা কথা বলতে শুনত ৷ মেয়েরা বিয়ের পর প্রথমবার বাপের বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার সময় যে আকুল কান্নাটা কাঁদে, তার মধ্যে না কি আসলে অনেকগুলো কান্না আলাদা-আলাদাভাবে মিশে থাকে ৷ একদম ঠিক ৷ মুনিয়া যখন এই তুষকাঠি ছেড়ে কৌশিকের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে আসানসোলের দিকে রওনা হয়েছিল, তখন সে-ও কেঁদেছিল ৷ মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে ফুলে ফুলে কেঁদেছিল অনেকক্ষণ ধরে ৷ আর কেউ না জানুক, সে নিজে তো জানে, সেই কান্নার মধ্যে অনেকটাই ছিল রাস্তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মুখচোরা ছেলের জন্যে, যে কোনোদিন তাকে সাহস করে বলে উঠতে পারল না, ভালোবাসি ৷ সেই ছেলেটার নাম রঞ্জন ভট্টাচার্য, ডাকনাম রঞ্জু ৷
মুখচোরা রঞ্জুদা সময় থাকতে তাকে বলতেই পারল না ভালোবাসার কথা ৷ না বললে মুনিয়া বুঝবে কেমন করে? অথচ কত সুযোগ ছিল ওর ৷ একদম পাশের বাড়ির ছেলে, তাই ছোটবেলা থেকেই মুনিয়াদের বাড়িতে রঞ্জনের অবাধ যাওয়া-আসা ৷ গাঁ-গঞ্জে একটা কাঁচা-বয়সের মেয়ের কাছাকাছি পৌঁছনোর মধ্যে যে হাজারটা বিধি নিষেধ থাকে, রঞ্জনের ক্ষেত্রে তা তো একবারেই ছিল না ৷ তবু ও কিছু বলতে পারল না ৷
এত কেয়ারিং ছিল রঞ্জুদা ৷ এত আগলে আগলে রাখত মুনিয়াকে ছোটবেলা থেকে ৷
আর তার বদলে ও কী করেছে?
এত দুঃখের মধ্যেও ছোটবেলার সেই সব বদমায়েশির কথা ভেবে মুনিয়ার ঠোঁটে একটা আলগা হাসি ফুটে উঠল৷ রঞ্জুদার সঙ্গে তার মেলামেশার ইতিহাস আসলে লাগাতার অ্যাডাম-টিজিং-এর ইতিহাস ৷ খুব ছোটবেলায় পিঠে কালি ছিটিয়ে দেওয়া, চুলে বাঘনখ ফল কিংবা চুইংগাম চিপকে দেওয়া ৷ আর একটু বড় হলে, গ্রামের অন্য মেয়েদের সামনে ওকে আজেবাজে নাম ধরে ডাকা, কিংবা সাইকেলের পাম্প খুলে দেওয়া ৷ ও কিন্তু কোনোদিন মুনিয়ার নামে কাউকে নালিশ করেনি ৷ বরং মুনিয়াই করেছিল ওর নামে নালিশ ৷ অতিচালাকের ছদ্মবেশের আড়ালে সে নিজে যে আসলে কী ভীষণ কী ভীষণ বোকা, সে কথা ভেবে আজ এতদিন বাদেও কানদুটো লাল হয়ে উঠল মুনিয়ার ৷
নালিশ করেছিল কেন? রঞ্জুদা তার ফোটো চুরি করেছিল বলে ৷ একটা গ্ৰুপ ফোটো ৷ বন্ধুদের সঙ্গে কলেজ পিকনিকে গিয়ে তোলা ৷ খাটের ওপর রেখে গিয়েছিল, তারপর থেকে আর খুঁজে পাচ্ছিল না ৷ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল ফোটোটার কথা ৷ হঠাৎই একদিন রঞ্জুদার পড়ার ঘরে ঢুকে দেখে সেই ছেলে টেবিলে বসে মাথা ঝুঁকিয়ে মন দিয়ে কী যেন দেখছে ৷ পেছন থেকে পা টিপে টিপে গিয়ে উঁকি মেরে মুনিয়া দ্যাখে তাদের সেই গ্ৰুপ ফোটোটা ৷ মুনিয়া তৎক্ষণাৎ চেঁচিয়ে তাদের বাড়ি এবং রঞ্জনদের বাড়ি দুটো বাড়িই মাথায় তুলেছিল ৷
রঞ্জন সে দিন ওর হাতে পায়ে ধরতে বাকি রেখেছিল ৷ কিন্তু মুনিয়া ছাড়বে কেন? সে অনেকদিন ধরেই সন্দেহ করছিল ওর বন্ধু তপতীর প্রতি রঞ্জুদার বেশ একটু দুর্বলতা আছে ৷ এইবার হাতে নাতে প্রমাণ পাওয়া গেছে ৷ ওই গ্ৰুপ ফোটোর একদম মাঝখানেই তো তপতী দাঁড়িয়ে আছে, তাই না? ইসস! কী বকুনি আর প্যাঁক-ই না সেদিন খেতে হয়েছিল রঞ্জুদাকে!
