ঈশান বলল, ‘কোথায় রক্ষী কেউ তো কোথাও নেই!’
সোমদত্তা বলল, ‘খুন করো, খুন করো আমাকে ৷ কীলক বসিয়ে দাও ৷ দ্বিধা কোরো না ৷ যেমনভাবে কঠিন পাথরের গায়ে এই কীলক আর হাতুড়ির ঘায়ে তুমি আমার প্রাণ সঞ্চার করেছিলে তেমনই ভাবো কোনো প্রস্তরমূর্তির বুকে আঘাত হানছ তুমি ৷ নারী নয়, তুমি প্রস্তর ঘাতক ৷’
আর এরপরই সোমদত্তা চিৎকার করে উঠল, ওই দেখো তারা এসে পড়েছে! আর সময় নেই ৷’
তার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন মশালের আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল মন্দির চত্বর ৷ এখানে-ওখানে মন্দিরগাত্রের নানা জায়গাতেও জ্বলে উঠল মশালের আলো ৷ নীচে তাকিয়ে ঈশান দেখতে পেল ৷ মন্দির চত্বর থেকে পাথুরে দেওয়ালের পথ বেয়ে সার বেঁধে ওপর দিকে উঠে আসছে হাজার বছরের প্রাচীন এক রক্ষীবাহিনী ৷ মশালের আলোতে ঝিলিক দিচ্ছে তাদের হাতে ধরা তলোয়ার, বর্শার ফলা ৷ তাদের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে আদিম জিঘাংসা, নারী লালসা ৷ অতি দ্রুত ওপরে উঠে আসছে তারা!
সোমদত্তা আবারও চিৎকার করে উঠল, ‘আর দেরি কোরো না ৷ খুন করো আমাকে, নইলে তুমিও বাঁচবে না ৷ ওই গোলকের জন্য হাজার বছর ধরে এমন চাঁদনি রাতে ওরা আসে ৷ সবাই মিলে গোলক না পেয়ে চরিতার্থ করে তাদের লালসা ৷ তুমি কি সহ্য করতে পারবে সেই দৃশ্য? গোলক ওদের হাতে তুলে দেব না বলে যুগ যুগ ধরে সহ্য করেছি এই অত্যাচার ৷ দোহাই তোমার ৷ এবার আমাকে মুক্তি দাও ৷ খুন করে মুক্তি দাও আমার প্রাচীন আত্মাকে ৷ তারপর আবার আমার তোমার মতো নবজন্ম হবে ৷ দোহাই তোমার দেরি কোরো না ৷’
ভাস্কর ঈশান চিৎকার করে অসহায়ভাবে বলে উঠল— ‘না, এ দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারব না ৷’
ক্রমশ উঠে আসছে পিশাচের দল ৷ কানে আসছে তাদের অস্পষ্ট উল্লাসধ্বনি ৷
না, আর দেরি নয় ৷ মন শক্ত করল ভাস্কর ৷ তার দু-হাতের মাংসপেশী শক্ত হয়ে উঠল ৷ স্তনের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছে সোমদত্তা ৷ মনের সব শক্তিকে একত্রিত করে সোমদত্তার বুকের ঠিক মাঝখানে লৌহ কীলক প্রতিস্থাপিত করল ঈশান ৷ মুহূর্তর জন্য এবার যেন হাসি ফুটে উঠল সেই সুরসুন্দরীর ঠোঁটের কোণে ৷ মুক্তির হাসি ৷ কোলাহল আরও কাছে উঠে এসেছে ৷ আর দেরি না করে ঈশান হাতুড়ির ঘা দিল কীলকে ৷ ঠং করে একটা শব্দ হল ৷ তার আঘাতে কী যেন একটা ছোট্ট উজ্জ্বল গোলকের মতো জিনিস তার স্তনের ভিতর থেকে নিক্ষিপ্ত হল আকাশের দিকে ৷ লৌহ শলাকাটা আমূল প্রেথিত হল সুরসুন্দরীর স্তনে ৷ থরথর করে কেঁপে উঠল সুরসুন্দরী ৷ তারপর টাল খেয়ে উন্মুক্ত তাক থেকে ছিটকে পড়ল নীচের দিকে ৷ তার দেহ নীচে আছড়ে পড়ার সাথে মিশে গেল ঈশানের আর্তনাদ ৷ আর সঙ্গে সঙ্গেই সব কোলাহল থেমে গেল, সব আলো নিভে গেল ৷ নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ ৷ একদম নিস্তব্ধ যে বৃত্তাকার কুয়াশার স্তর কান্তরিয় মন্দিরকে ঘিরে ছিল তা যেন মন্দিরকে গ্রাস করতে শুরু করেছে ৷ ওপরে উঠে আসছে কুয়াশা ৷ ঈশান এরপর যে-পথ বেয়ে সেখানে পৌঁছেছিল পাগলের মতো ছুটতে শুরু করল সেদিকে ৷
পরদিন বেলা আটটা নাগাদ দিবাকরদার ডাকে ঘুম ভাঙল ঈশানের ৷ ঘুম ভেঙে উঠে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মনে পড়ে গেল, গতরাতের ঘটনার কথা ৷ সেটা কি সত্যি ছিল, নাকি স্বপ্ন? সে দিবাকরদাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কাল কখন ঘরে ফিরেছি আমি?’
দিবাকরদা বললেন, ‘তা তো বলতে পারব না ৷ কাল পানটা একটু বেশি হয়ে গেছিল ৷ ওরাই আমাকে ধরাধরি করে এঘরে পৌছে দেয় ৷ কোনো হুঁশ ছিল না আমার ৷ এখন চটপট তৈরি হয়ে নাও ৷ গাইড এসে গেছে, মন্দির দেখতে বেরোতে হবে ৷’
কিছু সময়ের মধ্যেই মন্দির দেখার জন্য গাইডের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল ঈশানরা ৷ সঙ্গে আয়োজকরাতো আছেই ৷ বেশ বড় দল ৷ তারা প্রথমে এসে উপস্থিত হল কান্তরিয় মন্দিরে ৷ বিশাল মন্দির ৷ অপূর্ব তার শিল্প সুষমা ৷ সকালের সূর্যালোকে তার গায়ে জেগে আছে অসংখ্য সুরসুন্দরী, মিথুন ভাস্কর্য ৷ হাজার বছরের প্রাচীন মন্দিরের গায়ে সেসব ভাস্কর্য দেখলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয় ৷ গাইড তাদের বলল, ‘এই মন্দিরে যেসব সুরসুন্দরীদের আপনারা দেখতে পাবেন তারা কিন্তু কেউ কল্পিত ছিলেন না ৷ মগধ, উজ্জয়িনী, কামরূপ এমনকী আপনাদের বঙ্গসমতট থেকেও তাদের সংগ্রহ করে এনে তাদের মডেল বানিয়ে মূর্তি নির্মাণ করত শিল্পী ভাস্করের দল ৷’
গাইডের সাথে তার কথা শুনতে শুনতে বিমোহিতভাবে মূর্তিগুলো দেখতে দেখতে মন্দির দেখতে শুরু করল সবাই৷ হঠাৎ এক জায়গাতে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল গাইড ৷ তার সাথে সাথে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল পুরো দলটা ৷ সামনেই পাথুরে চাতালের ওপর পড়ে আছে খণ্ডবিখণ্ড এক সুরসুন্দরীর মূর্তি ৷ গাইড একবার মন্দির শীর্ষের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সম্ভবত মাথার ওপরের কোনো তাক থেকে রাতে খসে পড়েছে মূর্তিটা ৷ গতকালও এখানে এটা দেখিনি ৷ মাঝে মাঝে এমন হয় ৷ হাজার বছরের প্রাচীন স্থাপত্য তো ৷ মাঝে মাঝে এটা-ওটা খসে পড়ে ৷ সবাই গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়াল মূর্তির খণ্ডিত অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে ৷ তার বুকটা অক্ষত আছে ৷ আর তার মধ্যে প্রোথিত আছে একটা প্রাচীন লৌহ শলাকা ৷ একজন বলল, ‘এ শলাকাটা দিয়েই মনে হয় দেওয়ালের গায়ে আটকে রাখা হয়েছিল মূর্তিটাকে ৷ কিন্তু এখন দেখে মনে হচ্ছে ঠিক যেন কেউ বুকের মধ্যে শলাকা বিঁধে খুন করেছে সুরসুন্দরীকে ৷’ তার কথা শুনে মৃদু চমকে উঠল ঈশান ৷ আর তারপরই তার পায়ের কাছে একটা জিনিস পড়ে থাকতে দেখে সেটা কুড়িয়ে নিল ঈশান ৷ পাথরের তৈরি নিটোল একটা গোলক ৷ অনেকটা পায়রার ডিমের আকৃতির ৷ হয়তো হাজার বছর ধরে পাথরের মধ্যে থাকার কারণে: স্ফটিক গোলক রূপান্তরিত হয়েছে লালচে পাথরের গোলকে ৷ গাইড গোলকটা দেখে বলল, ‘এ ধরনের বল মাঝে মাঝে এখানে কুড়িয়ে পাওয়া যায় ৷ চলুন এগোনা যাক ৷ এ মন্দির দেখা শেষ করে অন্য মন্দিরে যেতে হবে ৷ আরও অন্য মন্দির আছে এখানে৷’
