মন্দিরের শীর্ষদেশের সংকীর্ণ তাক! কোনো প্রাকার নেই তার ৷ অনেক নীচে মন্দির প্রাঙ্গণ ৷ উন্মুক্ত তাকগুলোর মাঝেমাঝে শুধু বিভিন্ন ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে সুরসুন্দরীদের দল ৷ চাঁদের আলোতে তাদের ঠোঁটের কোণে যেন আবছা হাসি লেগে আছে ৷ যেন কিছুর জন্য প্রতীক্ষা করছে তারা ৷ তাক ধরে এগিয়ে চলছে সোমদত্তা ৷ তার পিছনে ঈশান যত এগোচ্ছে তত যেন ঈশানের মনে হচ্ছে এ জায়গা তার খুব চেনা, খুব চেনা! কিন্তু তা কী করে সম্ভব? তাকের শেষ প্রান্তে এক সময় এসে পৌছল সোমদত্তা ৷ সেখানে অন্য মূর্তিগুলোর তফাতে একাকী দাঁড়িয়ে আছে এক সুরকন্যার মূর্তি ৷ সেখানে এসে থামল তারা দুজন ৷
সোমদত্তা ঈশানকে বলল, ‘এবার ভালো করে তাকাও মূর্তিটার দিকে ৷’
ঈশান তাকাল ৷ চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে সেই সুরকন্যা, গ্রীবাটা ঈষৎ আনত ৷ চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকা ঘন সন্নিবেষ্ট বক্ষদেশ, ক্ষীণ কটির সেই সুরসুন্দরীর গা বেয়ে যেন জ্যোৎস্না চুইয়ে পড়ছে ৷ মৃণাল লতার মতো তার বাহুযুগলের করপল্লব দুটো বুকের ঠিক মাঝখানে চেপে ধরা ৷ হাত দুটো কি লজ্জা নিবারণের জন্য বুকের মাঝখানে ওভাবে চেপে ধরেছে, নাকি সেখানে লুকিয়ে রেখেছে অন্য কিছু?
ঈশান বলল এ মূর্তি যে আমার চেনা মনে হচ্ছে?
সোমদত্তা সেই লৌহ-শলাকা আর হাতুড়িটা ঈশানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এ মূর্তি তো তুমিই বানিয়ে ছিলে একদিন ৷ বঙ্গসমতট থেকে এসেছিল এক নারী ৷ ভাস্করশ্রেষ্ঠ তুমিও বঙ্গ সমতটেরই লোক ছিলে ৷ এই মন্দিরের প্রধান ভাস্কর ৷ তোমার কাছেই থাকত সেই দুর্মূল্য স্ফটিক গোলক ৷ যা বক্ষের মাঝখানে ধারণ করেছিল এই নারী, আর তার সাথে সাথে তোমার হৃদয়ও …’
কী বলছে সোমদত্তা! মাথার ভিতরটা যেন কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে ঈশানের ৷ যেন বাস্তব আর পরাবাস্তবতার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঈশান ৷ সোমদত্তা বলে চলল, ‘তারপর তোমাকে আর এই নারীকে নিয়ে রচিত হল কত ভাস্কর্য ৷ তুমিও ভালোবেসেছিলে তাকে ৷ কিন্তু একদিন তোমার কার্যে্যাপলক্ষে কিছু দিনের জন্য দেশে ফেরার প্রয়োজন হল ৷ নারীর সৌন্দর্য নির্বাচনের জন্য ওই স্ফটিক গোলক ছিল হীরকখণ্ডর চেয়েও দামি ৷ যাবার আগে তুমি সেই গোলক গচ্ছিত রেখে গেলে এই নারীর কাছে, তোমার সৃষ্ট এই মূর্তির মধ্যে ৷ বলে গেলে তুমি যত দিন ফিরে না আসো ততদিন সে যেন বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখে সেই গোলক ৷ কিন্তু তুমি আর ফিরলে না ৷ রাজ নির্দেশে একদিন তল্লাশি শুরু হল সেই গোলকের ৷ তারা অনুমান করল তোমার প্রেয়সী নিশ্চয়ই সন্ধান জানে সেই গোলকের আর তারপর … ৷’
সোমদত্তার কথাগুলো যেন তছনছ করে দিচ্ছে ঈশানের মাথার ভিতরটা ৷ ঈশানের ভিতর থেকে যেন জেগে উঠেছে অন্য এক ঈশান ৷ তবু সে শেষ একবার বলার চেষ্টা করতে যাচ্ছিল, ‘এ সব আবোলতাবোল কী বলছেন আপনি!’
সে কথা বলার জন্য ঈশান তাকাল সোমদত্তার দিকে ৷ কখন যেন শালের আবরণ খসিয়ে ফেলেছে সোমদত্তা ৷ ঈশান দেখতে পেল পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা সুরসুন্দরী আর সোমদত্তার মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই ৷ তারা দুজন যেন একই নারী!
সে দৃশ্য দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ঈশানের মনের ভিতর থেকে যেন খসে পড়ল হাজার বছরের খোলস ৷ ঈশান চিৎকার করে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি ৷ সব মনে পড়ে গেছে আমার ৷ সংসারবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বঙ্গ সমতট থেকে এ দেশে আর ফেরা হয়নি আমার ৷’
তার মূর্তিটার মতোই তার ঠোঁটের কোণে একটা বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল সোমদত্তার ৷ সে বলে উঠল, ‘কিন্তু আমি যে হাজার বছর ধরে তোমার প্রতীক্ষায় এখানে দাঁড়িয়ে আছি ভাস্করশ্রেষ্ঠ ৷ তোমারই সেই স্ফটিক গোলক বুকে নিয়ে, তোমার ভালোবাসাকে বুকের মধ্যে আগলে ধরে ৷ আমি কাউকে জানতে দিইনি তার কথা ৷ কারো হাতে তুলে দিতে পারিনি তোমার-আমার ভালোবাসাকে ৷
ঈশান আর্তনাদ করে বলে উঠল, ‘আমাকে তুমি ক্ষমা করো ৷ আমি ভুলে গেছিলাম তোমাকে ৷’
বিষণ্ণ হেসে সোমদত্তা বলল, ‘ক্ষমা নয়, আমি যে তোমায় ভালোবাসি ৷ সেজন্যই তো আমি সে-গোলক তুলে দিতে পারিনি রাজরক্ষীদের হাতে ৷ সে গোলক যে ভাস্করের হাতে যেত সেই হত তোমার জায়গায় প্রধান ভাস্কর ৷ সে কেমন করে সইতাম আমি ৷ কিন্তু হাজার বছর ধরে বুকের মাঝখানে লুকিয়ে রাখা এ গোলকের ভার আমি আর সহ্য করতে পারছি না ৷ সামান্য সুরসুন্দরী আমি ৷ হাজার বছর আগে তুমি যদি আমাকে ভালোবেসে থাকো তবে মুক্তি দাও আমাকে ৷’
বিস্মিত ঈশান বলে উঠল, ‘মুক্তি? কী ভাবে?’
সোমদত্তা বলে উঠল ওই মূর্তি আর আমি অভিন্ন নই ৷ তোমার হাতের ওই লৌহশলাকা হাতুড়ি দিয়ে বিদ্ধ করে আমার বুকে ৷ খুন করে আমাকে ৷ আমার বুকের ভিতর থেকে উৎপাটিত করো তোমার স্ফটিক গোলক ৷ এই বলে নীচের দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখার চেষ্টা করল সে ৷ এক মুহূর্তর জন্য একখণ্ড কালো মেঘ এসে ঢেকে দিল চাঁদকে ৷ ঈশান দেখতে পেল মূর্তিটা অদৃশ্য হয়েছে তার জায়গাতে দাঁড়িয়ে আছে সোমদত্তা!
ঈশান বলল, ‘এ কী বলছ তুমি ৷ চলো আমরা এখান থেকে পালিয়ে যাই ৷’
সোমদত্তা বলে উঠল, ‘পালানো হবে না আমার ৷ আমাকে নিয়ে পালাতে গেলে তোমারও বিপদ হবে ৷ রক্ষীরা ঠিক ধরে ফেলবে দুজনকে ৷ আমাকে তুমি খুন করে মুক্তি দাও এই সুরসুন্দরীর জন্ম থেকে ৷ কীলক বসিয়ে দাও আমার বুকে, কথাগুলো বলতে বলতে এবার কেমন যেন সে চঞ্চল হয়ে উঠল ৷
