সোমদত্তা সেকথা শুনে প্রথমে যেন মৃদু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, মর্মবেদনা ৷’ তারপর যেন একটু উৎসাহিত হয়ে বলল, ‘আর কিছু, আর কিছু মনে পড়ছে আপনার এই নারী-মূর্তিগুলো দেখে? বিশেষত ওই গোলকগুলোর ব্যাপারে?’
ভালো করে মূর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে ঈশান বলল, ‘না, তেমন কিছু নয়, তবে এই মূর্তিগুলো দেখে কেন জানি মনে হচ্ছে এদের আগে আমি দেখেছি ৷ এমনও হতে পারে কবির বিবরণ পড়ে মনের কল্পনায় ৷ তাই হয়তো একটু চেনা মনে হচ্ছে এই রমনীদের ৷’
ঈশানের কথা শুনে মৃদু চুপ করে থাকার পর সোমদত্তা বলল, ‘ওই ছোট গোলকগুলো কিন্তু অন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজেও ব্যবহার করা হত ৷ বক্ষ সৌন্দর্য এই নারীমূর্তিগুলোর অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল ৷ যেসব নারীদের মগধ, কামরূপ, বঙ্গ সমতট থেকে সংগ্রহ করে আনা হত তাদের সুরসুন্দরী রূপে নির্বাচন করা হবে কিনা তার জন্য এক অন্তিম পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল ৷ ওইসব নারীদের বক্ষ উন্মুক্ত করে দাঁড় করিয়ে কিছুটা তফাত থেকে আকাশের দিকে এমনভাবে ওই ছোট গোলক ছুড়ে দেওয়া হত যা ওপর থেকে এসে নারীর দুই বক্ষের মাঝে পড়ে ৷ গোলক যদি ফাঁক গলে গড়িয়ে নীচে পড়ে তবে সে নারীকে সুরসুন্দরী হবার অনুপযুক্ত ধরা যেত ৷ তারা দাসী হত সুরসুন্দরীদের ৷ আর যে নারী ওই গোলক তার দুই বক্ষের মাঝখানে ধারণ করতে পারত, সে হত সুরসুন্দরী ৷ তাকে দেখে মূর্তি নির্মাণ করত ভাস্করের দল ৷ এই মন্দিরে যত সুরসুন্দরীদের মূর্তি আছে তাদের সবাইকেই এই পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে ৷
সম্পূর্ণ অজানা এক কথা শুনলেও ঈশানের কেন জানি মনে হল এ কথাটাও তার জানা ৷ সে শুধু বলল, ‘যদি মন্দিরের আরও ওপরে ওঠা যেত তবে মন্দিরের শীর্ষগাত্রে যেসব মূর্তিগুলো আছে তাদেরকেও কাছ থেকে ভালোভাবে দেখা যেত ৷’
সোমদত্তা বলল, ‘চলুন তবে ৷ আমি ওপরে ওঠার পথ চিনি ৷ ওই পথ বাইরে থেকে বোঝা যায় না ৷ মন্দির যখন নির্মিত হয়েছিল তখন ভাস্করের দল ওই পথে ওপরে উঠে কাজ করত ৷’
তার কথা শুনে ঈশান বলল, ‘আপনি এ মন্দিরের এত কিছু চেনেন কী করে? কতবার এসেছেন এখানে?
সোমদত্তা তার কথা শুনে হাসল ৷ তারপর এগোল সামনের দিকে ৷ অগত্যা ঈশান অনুসরণ করল তাকে ৷
গর্ভগৃহ সংলগ্ন একটা কক্ষ থেকে সংকীর্ণ একটা সোপানশ্রেণি ওপরে উঠে গেছে ৷ সোমদত্তা উঠতে শুরু করল সেই সিঁড়ি বেয়ে ৷ আর তার পিছন পিছন ঈশান ৷ দেওয়ালের ফাটল দিয়ে মাঝে মাঝে আলো এসে পড়ছে সিঁড়িতে ৷ বাকি জায়গাগুলো অন্ধকার ৷ ছমছম নূপুর বাজছে সোমদত্তার পায়ে ৷ সিঁড়ির অন্ধকার বাঁকগুলোতে যেখানে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে সোমদত্তা, সেখানে ওই নূপুরধ্বনিকেই অনুসরণ করছে ঈশান ৷ বেশ কিছুক্ষণ ধরে ওপরে ওঠার পর এক সময় সামনেটা বেশ আলোকিত হয়ে উঠল ৷ সোমদত্তার পিছন পিছন ঈশান এসে প্রবেশ করল ঘরের মতো একটা জায়গাতে ৷ মাথায় ছাদ থাকলেও তার চারপাশ খোলা ৷ চারদিক থেকে মন্দিরগাত্রের পাথুরে থাক এসে মিশেছে সে-জায়গার সাথে ৷ চন্দ্রালোকে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুরসুন্দরীরা ৷ ঈশান বুঝতে পারল সে সম্ভবত মন্দিরের শীর্ষদেশের কোনো জায়গায় উঠে এসেছে ৷ নীচের মন্দির চত্বরটা পুরো দেখা যাচ্ছে সেখান থেকে ৷ আর মন্দিরকে ঘিরে থাকা কুয়াশাবলয়ের মাথার ওপর দিয়েও এদিক-ওদিকে দেখা যাচ্ছে মন্দির-নগরীর সার সার চূড়া ৷
ঘরের মতো জায়গাটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে সোমদত্তা প্রশ্ন করাল ‘এই জায়গাটা চেনা মনে হচ্ছে আপনার?’
ঈশান ভালো করে তাকাল চারপাশে ৷ ঘরের মতো জায়গাটার এখানে-ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে নানা প্রকারের প্রস্তরখণ্ড, কিছু অর্ধসমাপ্ত মূর্তি ৷ জায়গাটার এক কোণে কিছু লৌহ কীলক, হাতুড়ি ইত্যাদি প্রাচীন যন্ত্রপাতিও পড়ে আছে ৷
ঈশান কোনো দিন এ জায়গাতে আসেনি ৷ কিন্তু এবার হঠাৎ তার মনে হতে লাগল জায়গাটা তার পরিচিত ৷ সে বলল, ‘আচ্ছা এখানে সিক মূর্তি বানানো হত?’
সেমদত্তা বলল ? হ্যাঁ, তারপর সে মূর্তিগুলো স্থাপন করা হত এ জায়গা সংলগ্ন মন্দির-শীর্ষের তাকগুলোতে ৷ এ জায়গা দেখে আর কিছু মনে পড়ছে আপনার?’
চারদিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি শুরু হল ঈশানের মনে ৷ ঈশান স্পষ্টভাবে জবাব দিল, ‘কেমন যেন চেনা মনে হচ্ছে এ জায়গা…’
সোমদত্তা আবার জানতে চাইল, ‘আর কিছু আর কিছু?’
জায়গাটা দেখে ঈশানের মনের ভিতর অস্পষ্ট কিছু ফুটে উঠে আবার যেন মিলিয়ে যাচ্ছে ৷ ঈশানের মনে হচ্ছে সে যেন কিছু একটা এবার বুঝেও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না!
ঈশানকে চুপ করে থাকতে দেখে সোমদত্তা যেন একটু বিষণ্ণভাবে বলে উঠল, ‘এই মন্দির, গোলক নিয়ে ক্রীড়ারত সুরসুন্দরীদের মূর্তি, ভাস্করদের এই জায়গা দেখে এখনও তোমার কিছু মনে পড়ছে না ঈশান?’
কথাগুলো বলা শেষ করে সোমদত্তা ঘরের কোণ থেকে তুলে নিল একটা লৌহ কীলক আর হাতুড়ি ৷ তারপর বলল, ‘এসো আমার সঙ্গে’ ৷ ঈশান খেয়াল করল সোমদত্তার সম্বোধন এবার পাল্টে গেছে ৷ ঈশানের কপালের দু-পাশের রগগুলো কেমন যেন দপদপ করতে শুরু করেছে ৷ কীলক আর হাতুড়িটা নিয়ে সে জায়গা ছেড়ে একটা তাকের দিকে এগোতে শুরু করল সোমদত্তা ৷ তাকে অনুসরণ করল ঈশান ৷
