ঈশান বলল, ‘হ্যাঁ, চলুন ৷’
ধীর পায়ে মন্দির প্রদক্ষিণ করা শুরু করল তারা দুজন ৷ চারপাশে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য সব মূর্তি ৷ তার মধ্যে অধিকাংশই সব মিথুনমূর্তি, অথবা স্বল্পবসনা বা বিবসনা নারীমূর্তি ৷ সুন্দর মুখশ্রী, কোমলবাহু, ঘন সন্নদ্ধ স্তনদ্বয়, মাংসল উদরে গভীর নাভিকূপ, ক্ষীণ কটিদেশের নারীমূর্তিগুলো যেন তাকিয়ে দেখছে তাদের দুজনকে ৷ সঙ্গে মহিলা থাকায় প্রাথমিক অবস্থায় ঈশানের যে একটা মৃদু অস্বস্তি হচ্ছিল না তা নয়, তবে চুপচাপ মূর্তিগুলো দুজন মিলে ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে সে অস্বস্তি এক সময় কেটে গেল ৷ ক্রমশ মন্দিরের গোলকধাঁধায় প্রবেশ করল তারা দুজন ৷ মন্দিরের গর্ভগৃহকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট ছোট মন্দির ৷ তার ভিতর আছে অসংখ্য দেবদেবী লক্ষ্মি গণেশ-নারায়ণ ইত্যাদির মূর্তি, স্তম্ভগাত্রে খোদিত আছে শৃঙ্গার দৃশ্য ৷ ঈশান খেয়াল করল সম্ভবত ভদ্রমহিলার পায়ে মল বা নূপুর পরা আছে ৷ মাঝে মাঝে মৃদু ঠুং টাং শব্দ হচ্ছে ৷ এতবড় মন্দির চত্বরে শব্দ বলতে শুধু ওইটুকুই ৷ বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়াবার পর মৌনতাভঙ্গ করার জন্য ঈশান বলল, ‘অদ্ভুত সুন্দর মন্দির ৷ এসব ভাস্কর্য কোনারক মন্দিরে কিছুটা দেখা যায়, কিন্তু শুনেছি আর অন্য কোথাও দেখা যায় না ৷ কারা কেন দেবালয়ে তৈরি করল এসব মূর্তি?’ শেষ বাক্যটা স্বগতোক্তির স্বরেই বলল ঈশান ৷
সোমদত্তা বেশ স্পষ্টভাবে বলল, আপনি ওই মিথুনমূর্তিগুলোর কথা বলছেন তো ৷ দেবালয়ে মিথুনমূর্তি নির্মাণের পিছনে বেশ কয়েকটা কারণ ছিল ৷ সেসময় মানুষের বিশ্বাস ছিল মন্দিরে মিথুন মূর্তি থাকলে বজ্রপাত হয় না ৷ বজ্র স্পর্শ করে না মিথুনরত নারী পুরুষকে ৷ আবার কেউ কেউ বলেন ওই যুগল মূর্তিগুলোর মিলনের মধ্যে দিয়ে দেহের সাথে আত্মার মিলনকে বোঝানো হয়েছে ৷ তাছাড়া সেসময়ের ভাস্কর-শিল্পীরা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে গোপন রাখতে চাননি ৷ তা খোদিত করে গেছেন মন্দিরগাত্রে ৷ এক সময় চান্দেল রাজাদের রাজধানী ছিল এই মন্দির নগরী খাজুরাহো ৷ আর এই কান্তরিয় মহাদেব মন্দির-নির্মাণ করিয়েছিলেন মহারাজ বিদ্যাধর ৷ কী আমি ঠিক বলছি তো?’
ঈশানের খাজুরাহো নিয়ে তেমন কোনো পড়াশোনা নেই ৷ তবে সঙ্গিনীর কথা শুনে কেন জানি তার মনে হল এ কথাগুলো তার জানা, যে গাইডবুকটা সে কিনেছিল তাতে একবার ইশান চোখ বুলিয়েছিল ৷ হয়তো-বা সেখানেই লেখাছিল এই কথাগুলো ৷ তবে মেয়েটা যে এই জায়গা সম্বন্ধে বেশ কিছু জানে তা অনুমান করে ঈশান তাকে প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি ইতিহাসের ছাত্রী ছিলেন? আগে এসেছেন এখানে?’ সোমদত্তা জবাব দিল, ‘এ মন্দিরের আমি সব কিছু চিনি-জানি ৷’
‘ঈশান হেসে বলল, ‘বুঝলাম, তার মানে আপনি আগে এসেছেন এখানে ৷ বিনা পয়সায় তাহলে একজন গাইড পেলাম আমি ৷’
ঈশানের কথায় সোমদত্তা যেন মৃদু হাসল মনে হয় ৷ তারপর বলল, ‘আচ্ছা, এ জায়গা আপনার চেনা মনে হয় না? মনে হয় না আপনিও কোনো দিন এখানে এসেছেন?’
ঈশান জবাব দিল, ‘আমি এখানে প্রথম এসেছি ৷ তবে এক জায়গাতে বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ালে মনে হয় সে জায়গা আমার চেনা ৷ যেন আগে কোনোদিন এসেছি সেখানে ৷ সে অনুভূতি কিছুটা আমার হচ্ছে ৷’
সোমদত্তা বলল, ‘আসুন আপনাকে একটা জিনিস দেখাই ৷’ এই বলে সে এগোল গর্ভ মন্দিরের দিকটাতে ৷ ঈশান তাকে অনুসরণ করল ৷ গর্ভমন্দিরের প্রবেশ মুখের কাছাকাছি পৌঁছে ঈশান থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ‘ভিতরে যাওয়া কি ঠিক হবে? যা অন্ধকার!’
মন্দিরের ভিতরে ঢোকার মুখটাতে ঈশানের কথা শুনে মুহূর্তর জন্য পিছনে ফিরে তাকিয়ে সোমদত্তা বলল, ‘ভয় পাচ্ছেন?’
ঈশানের এবার বেশ লজ্জাবোধ হল তার কথা শুনে ৷ সে যখন ভিতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছে তখন ঈশান পারবে না কেন? ‘আচ্ছা, চলুন’ বলে ঈশান প্রবেশ করল গর্ভমন্দিরে ৷
বিশাল গর্ভমন্দির ৷ তার ভিতরেও নানা অলিগলি ৷ সেখানে আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে আছে নানা দেবদেবী বা সুরসুন্দরীদের মূর্তি ৷ ছাদের ফাটল গলে বা অন্য কোনোভাবে কিছুটা চাঁদের আলো ঢুকছে ভিতরে ৷ আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে থাকা নারী-পুরুষের মূর্তিগুলোকে কেমন যেন রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে ৷ ঈশানের কয়েক পা আগে চলেছে সোমদত্তা ৷ তার শান্ত ধীর পদচারণা দেখে ঈশানের মনে হল, সত্যি যেন সে মন্দিরটা চেনে ৷ ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছে সে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ৷
ঈশানকে সঙ্গে নিয়ে এক সময় এক জায়গাতে এসে থামল সোমদত্তা ৷ কোথা থেকে যেন চাঁদের আলো এসে পড়েছে সামনের দেওয়ালটার ওপর ৷ আর সেই আলোতে তাদের সামনে জেগে আছে একসার ক্রীড়ারত নারীমূর্তি ৷ ছোট ছোট বল বা গোলক নিয়ে তারা খেলা করছে ৷ কারো হাতের তালুতে গোলক রাখা, কেউ আবার গোলক স্থাপন করেছে তাদের উন্মুক্ত বক্ষ বিভাজিকার খাঁজে ৷
অদ্ভুত সুন্দর নারীমূর্তি সব ৷ প্রত্যেকেই যেন জীবন্ত ৷ ছোট গোলক নিয়ে নারীদের খেলার ব্যাপারটা খুব প্রাচীন প্রথা ৷ মূর্তিগুলোকে দেখে একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল ঈশানের ৷ সাহিত্যের কথা ৷ একটু ইতস্তত করে ঈশান বলল, ‘জানেন মহাকবি কালিদাসের রচনায় এই বলের উল্লেখ আছে — ‘‘ছোট্ট গোলক তুমি আমার প্রিয়ার করকমলের ছোঁয়ায় লাফাও ৷ উঁচুতে আরও উঁচুতে লাফাও ৷ ছুঁতে চাও তার ওষ্ঠ ৷ অথচ প্রতিবারই ভুল করে নেমে আসো মাটিতে ৷ আমি সাক্ষী থাকি সেই মর্মবেদনার ৷’’
