অনেকটা মন্ত্রমুগ্ধর মতোই সোপানশ্রেণি বেয়ে ওপরে উঠে এল ঈশান ৷ মন্দিরের ভিতর থেকে কোনো আলো ভেসে আসছে না, কোথাও কোনো লোকজন নেই ৷ শুধু ঘি আর ধূপমিশ্রিত মৃদু সুবাস ছড়িয়ে আছে বাতাসে ৷ রিসর্টের সেই লোকটা সম্ভবত ঠিকই বলেছিল ৷ সন্ধ্যারতি শেষ করে পূজারি মন্দির ছেড়ে চলে গেছেন অনেকক্ষণ আগে ৷ উঁচু বেদি থেকে একবার দূরে চারদিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল ঈশান ৷ কিন্তু কোথাও কিছু দেখা যাচ্ছে না ৷ চারপাশে কুয়াশাবৃত্তর আড়ালে যেন পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন মন্দিরটা ৷ মাথার ওপর পূর্ণচন্দ্র যেন শুধু ওপর থেকে মায়াবী আলো ফেলছে মন্দিরের ওপরেই ৷ গর্ভগৃহ অন্ধকার হলেও মন্দিরের শীর্ষবিন্দু থেকে বেদি পর্যন্ত বহিঃগাত্রর সব কিছু স্পষ্ট দৃশ্যমান ৷ ঈশানের কিছুটা তফাতেই বেদিমণ্ডপে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক শার্দূল মূর্তি ৷ বিভিন্ন পশুপাখির শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মিলিয়ে প্রাচীন ভাস্করের দল রচনা করেছিল সেই কল্পিত শার্দূল ৷ ঈশান তার কাছে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে দেখল মূর্তিটাকে ৷ সত্যিই কী অসম্ভব সুন্দর কল্পনা ছিল সে সময়ের শিল্পীদের! তারপর সে ধীর পায়ে প্রদক্ষিণ শুরু করল মণ্ডপ ৷ বয়সের ভারে কিছু কিছু মূর্তি ভেঙে গেলেও মহাকাল তার থাবা সম্পূর্ণ বসাতে পারেনি এই মন্দিরের ওপর ৷ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কত ঝড় জলকে উপেক্ষা করে, মহাকালকে অগ্রাহ্য করে আজও মন্দির গাত্রে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন ভাস্কর্যগুলো ৷ চাঁদের দিকে তাকিয়ে তারা যেন হাসছে ৷ ঈশান ঘুরে ঘুরে দেখতে শুরু করল মন্দির গাত্রের ভাস্কর্যগুলো ৷ অসংখ্য দেবদেবী, সুরসুন্দরী, অপ্সরা, যক্ষ, জীবজন্তুর মূর্তি ছড়িয়ে আছে চারদিকে ৷ আর আছে বিভিন্ন ভঙ্গিমার অগুনতি মিথুনমূর্তি ৷ চাঁদের আলোতে তারা সব যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে ৷ তারা যেন কেউ পাথরের তৈরি নয়, রক্তমাংসের মানুষ সব! ঈশান অবাক হয়ে ধীরে ধীরে দেখতে লাগল সেসব ৷
প্রাচীন শিল্পীরা সেসময়ের মানুষদের দৈনন্দিন জীবন যাপনের চিত্রও খোদিত করে গেছেন মন্দির গাত্রে ৷ বিশেষত নারীদের অঙ্গ সজ্জার দৃশ্য ৷ ঘুরতে ঘুরতে তেমনই এক দৃশ্যর সামনে এসে দাঁড়িয়ে ছিল ঈশান ৷ দেওয়াল-গাত্রে খোদিত সেই ছবিতে এক অপরূপা সুরসুন্দরী বসে আছে ৷ তার এক পা বুকের কাছে, অন্য পা সামনে প্রশস্ত ৷ সে-পায়ে মল পড়িয়ে দিচ্ছে একজন পরিচারিকা ৷ অন্য দুজন পরিচারিকার একজন তাঁর কবরীবন্ধনে ব্যস্ত, আর একজন তার সামনে দর্পণ ধরে আছে ৷ সেই সুরসুন্দরীর দেহসৌষ্ঠব যেন ম্লান করে দিচ্ছে আকাশের চন্দ্রিমাকে ৷ কবরীবন্ধন আর মল পড়ানো শেষ হলেই উঠে দাঁড়াবে উন্নত বক্ষদেশ ম্লান কটির সেই অপরূপা ৷ মূর্তিটার দিকে স্থির দৃষ্টে তাকিয়ে ঈশান ভাবছিল, কীভাবে ভাস্কররা কল্পিত করত এই সব নারীদের! এরা কি সত্যিই ছিল? এই যে দেওয়ালগাত্রে খোদিত এত নারী ৷ মূর্তি, মিথুনরত নারীমূর্তি এ সবই কি নিছক প্রাচীন শিল্পী ভাস্করদের কল্পনা, নাকি সত্যিই একদিন রক্তমাংসর ছিল এই নারীরা? নইলে কীভাবে এত জীবন্তভাবে তাদের রচনা করলেন সে সময়ের শিল্পীরা?
‘মগধ, মালব, কামরূপ, বঙ্গ-সমতট থেকে বিশেষ শারীরিক লক্ষণযুক্ত নারীদের সংগ্রহ করে আনা হত এখানে ৷ তারপর তাদের মধ্যে থেকে আবার পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচিত করা হত কাদের সুরসুন্দরী বা দেবদাসী বানানো হবে ৷ যাদের দেখে মূর্তি নির্মাণ করতেন ভাস্করের দল ৷’ — কথাটা কানে যেতেই চমকে উঠে ফিরে তাকাল ঈশান ৷ যেন মনে মনে নয়, ঈশান প্রশ্নটা কাউকে করে ছিল, আর সে তার জবাব দিল! ঈশানের কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে আছে একজন মহিলা ৷ শাড়ির ওপর শাল জড়ানো ৷ শালের অবগুণ্ঠনের আড়ালে চন্দ্রালোকে তার মুখমণ্ডল যতটুকু দৃশ্যমান, তাতে তাকে যুবতী বলেই মনে হয় ৷ এই নির্জন মন্দিরপ্রাঙ্গণে এত রাতে একাকী তাকে দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল ঈশান ৷ কোথা থেকে এলেন এই মহিলা? তারপর তার মনে হল তিনিও হয়তো অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছেন ৷ যখন তিনি বাংলায় কথা বলছেন ৷ আর তাকে দেখে অবাক হবার কিছু নেই ৷ আর মেয়েরা এখন অনেক সাহসী ৷ ঈশান নিজে যদি এত রাত্রে একলা এখানে মন্দির দেখতে আসতে পারে তবে সে-ও আসতে পারবে না কেন?
ঈশান প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে একটু ইতস্তত করে তাকে প্রশ্ন করল, ‘আপনি কোথা থেকে এখানে এসেছেন?’
‘তিনি মৃদু হেসে জবাব দিলেন ‘ঐ যে বঙ্গ সমতট ৷’
ঈশান বলল, ‘আমার নাম ঈশান ৷ একটু আধটু লেখালেখি করি ৷ আপনি?’
মহিলা জবাব দিলেন, ‘আমার নাম সোমদত্তা ৷ এ মন্দির যে সময় তৈরি হয়েছিল সে সময় হলে আমাকে ‘‘নটী’’ বলত, এখন বলা হয় ‘‘নর্তকী’’ ৷’ বেশ জবাব দিচ্ছেন ভদ্রমহিলা ৷ ঈশান এবার হেসে ফেলে বলল, ‘হ্যাঁ, শুনেছি, কলকাতা থেকে একটা ডান্সট্রুপ এসেছে ৷ যদিও তাদের কারো সাথে পরিচযের সুযোগ হয়নি ৷ আপনার সাথেই প্রথম আলাপ হল ৷ এত রাতে একলা এখানে আপনার ভয় করছে না?’
মুহূর্তর জন্য যেন প্রশ্নটা শুনে চুপ হয়ে গেল সোমদত্তা ৷ তারপর কুয়াশার পর্দা ভেদ করে দূরে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করে বলল, ‘সত্যি কথা বলতে কি ভয় যে করছে না তা নয়, তবে আপনাকে পেয়ে কিছুটা আশ্বস্ত হলাম ৷ চলুন মন্দিরটা এবার ঘুরে দেখা যাক ৷’
