তাঁর কথা শুনে একটু লজ্জা পেয়ে বললেন, হ্যাঁ, পার্শ্বনাথের মন্দিরের গায়েই অমন মূর্তি আছে ৷ আমি আসলে ঠিক আপনার কথা বলতে চাইনি ৷ আপনি এত বড় সাহিত্যিক ৷ আপনি যে দেশবিদেশের সর্ব্রত্র ঘুরেছেন ৷ এই খাজুরাহো আপনার নিশ্চয়ই দেখা থাকবে ৷ আসলে অন্য এমন অনেকে আসবেন যাদের এ জায়গা দেখা নেই ৷’
দিবাকরদা লোকটার কথার প্রতুত্তরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ঈশানকে দেখতে পেয়ে হুইস্কির গ্লাসটা উচিয়ে ধরে প্রথমে বললেন, এসো, এসো, বসে পড়ো ৷ লজ্জা কোরো না ৷ আরও একটা গ্লাস আছে ৷’ তারপর অন্যদের উদ্দেশে বললেন, ঈশান কিন্তু খুব ভালো লিখছে ৷ আমরা আর কতদিন লিখব, ওরাই এখন বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ ৷ তাই আপনারা যখন কোনো তরুণ লেখককে সঙ্গে আনার কথা বললেন, তখন ওর কথা আমার মাথায় এল ৷ আপনারা কেউ পড়েছেন ওর লেখা?
সুতরাং একটা নিস্তব্ধতাই ঈশানকে বুঝিয়ে দিল তারা পড়েনি ৷ অবশ্য পড়ার কথাও নয়, আসলে প্রথমত কলকাতার সব বাংলা কাগজ আসে না ৷ তাছাড়া মাত্র বছর চারেক লিখতে শুরু করেছে ঈশান ৷ মাত্র তিনটে বই তার ৷ কলকাতায় তার লেখা কিছুটা পরিচিতি পেলেও এত তাড়াতাড়ি এত দূরে তার নাম ছড়াবে তা ঈশান আশা করে না ৷ সেটাই স্বাভাবিক ৷ কিন্তু ঘরের লোকগুলো ঈশান যাতে ব্যাপারটাতে অপ্রস্তুত না হয় সে জন্য তার লেখা পড়েছে কিনা সে জবাব না দিয়ে একসাথে বলে উঠল, ‘ওখানে দাঁড়িয়ে কেন? ভিতরে আসুন, ভিতরে আসুন?’
এখানে আসার পর ভোপালের বঙ্গভাষী সমিতির আয়োজকরা ঈশানের প্রতি আতিথেয়তার ত্রুটি না রাখলেও ঈশানের নিজের মনের ভিতর কেমন যেন লজ্জা বোধ হচ্ছে ৷ তার খালি মনে হচ্ছে নিজের যোগ্যতায় নয়, দিবাকরদার সঙ্গী বলেই সবাই খাতির করছে তাকে ৷ আরও অনেক অতিথি অভ্যাগত এসেছেন এই সাংস্কৃতিক বঙ্গ সম্মেলনে ৷ তাদের কেউ চিত্রকর, কেউ নাট্যকর্মী, কেউ অধ্যাপক, কেউ বা নৃত্যশিল্পী ৷ এই রিসর্টেরই নানা ঘরে তাঁরা আছেন ৷ কিন্তু নাম আর খ্যাতির বিচারে উদ্যোক্তাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু দিবাকরদাই ৷ আর দিবাকরের আলোকছটা ঈশানের গায়েও লাগছে ৷ তাই উদ্যোক্তারা তাকেও খাতির করছে ৷’
দিবাকরদা ও অন্যদের কথা শুনে ঈশান বলল, ‘না, না, আপনারা বরং গল্প করুন ৷ জানলা দিয়ে দেখলাম কিছুটা দূরে একটা মন্দির দেখা যাচ্ছে ৷ ওদিকটায় একবার দেখে এলে অসুবিধা হবে?’
একজন লোক, সম্ভবত স্থানীয় কেউ হবেন, তিনি হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আটটা বাজে ৷ রাত হলেও এখানে তেমন কোনো অসুবিধা নেই ৷ চোর-ডাকাতের ভয় নেই ৷ ওটাই কান্তরিয় শিব মন্দির ৷ যেতে পারেন ৷ তবে কাল তো দুপুরে আমাদের অনুষ্ঠান শুরু, সকালবেলায় আপনাদের এখানকার প্রধান মন্দিরগুলো ঘুরিয়ে দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে ৷ গাইডও থাকবে সঙ্গে ৷ সব বুঝিয়ে দেবে ৷
ঈশান বলল, ‘তখন তো দেখবেই ভালো করে ৷ আসলে দেখলাম বাইরে জ্যোৎস্না ফুটেছে ৷ মন্দিরটাও দেখা যাচ্ছে, তাই ভাবলাম… তার কথা শেষ হতে না হতেই দিবাকরদা হেসে বললেন, ‘যাও তবে ঘুরে এসো, বুঝতে পারছি তোমার আর ওসব দেখার তর সইছে না ৷ তোমার বয়সে আমি যখন এসেছিলাম তখন আমারও এমন আগ্রহ ছিল ঐ মূর্তিগুলো নিয়ে ৷ বহুদিন ধরে শুনতাম ওদের কথা ৷ দেখে এসো, তারপর স্বপ্নে আহ্বান করো ওদের ৷’ এই বলে চোখ মটকালেন তিনি ৷’
তাঁর কথা শুনে একটা চাপা হাসির রেখা খেলে গেল উপস্থিত সকলের ঠোঁটের কোণে ৷ দিবাকরদার ইঙ্গিতটা স্পষ্ট ৷ এই খাজুরাহোর মন্দিরগুলোর গায়ে অসংখ্য মিথুনমূর্তি আছে ৷ অনেকে সেই মূর্তিগুলোর টানেই এখানে ছুটে আসেন ৷ বসনহীন নারী-পুরুষের মুর্তি সব ৷ এ ব্যাপারটা না দেখলেও শোনা আছে ঈশানের ৷ এখানে আসার পর এক ফাঁকে একটা পোস্টকার্ড পিকচার বুক কিনেছে ঈশান ৷ তাতেও ছবি আছে তেমন কিছু ভাস্কর্যের ৷ দিবাকরদার মুখে এতগুলো লোকের সামনে এ কথা শুনে বেশ লজ্জা পেল ঈশান ৷ সে আর কথা না বলে এগোল রিসর্ট ছেড়ে বাইরে বেরোবার জন্য ৷ রিসর্টের গেটে দাঁড়িয়ে ছিল সিকিউরিটির একজন লোক ৷ বাইরে বেরোবার আগে ঈশান তবু তাকে একবার বলল, ‘ঐ যে মন্দিরটা দেখা যাচ্ছে ওখানে একবার যাচ্ছি, কোনো অসুবিধা হবে না তো?’
লোকটা হিন্দিতে জানাল, ‘না, কোনো অসুবিধা নেই, রাতে মাঝে মাঝে পুলিশ পেট্রল হয় ৷ তারা জিজ্ঞেস করলে বলবেন আপনি এখানে উঠেছেন ৷ আপনার গলায় আইডেন্টিটি কার্ড তো ঝুলছেই ৷ কোনো সমস্যা হবে না ৷ ওই কান্তারিয় মন্দিরেই একমাত্র পূজা হয় ৷ তবে মন্দিরের পুরোহিত সন্ধ্যারতি শেষ করে এতক্ষণে মনে হয় চলে গেছেন ৷ যান দেখে আসুন ৷ লোকটার কথায় আশ্বস্ত হয়ে রিসর্ট ছেড়ে বাইরে বেরোল ঈশান ৷
শীতের রাত ৷ ফাঁকা রাস্তা ৷ ট্যুরিস্টপার্টি যারা খাজুরাহো দেখতে এসেছিল তারা হয় ফিরে গেছে অথবা হোটেল রিসর্টে কম্বলের তলায় রাত্রিবাস করছে ৷ কুয়াশা নামতে শুরু করলেও চাঁদের আলোতে মোটামুটি সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ৷ দূরে দূরে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন সব মন্দিরের চুড়ো ৷ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ওভাবেই চাঁদের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে তারা ৷ কান্তারিয় মন্দির রির্সর্ট থেকে যত কাছে মনে হয়েছিল ঠিক তত কাছে নয় ৷ নির্জন পথে হাঁটতে মন্দ লাগছিল না ঈশানের ৷ এক সময় পিছনের হোটেল রিসর্ট থেকে ভেসে আসা ক্ষীণ শব্দটুকুও মিলিয়ে গেল ৷ মিনিট পনেরো চলার পর মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছতেই ঈশানের সামনের সব কিছু হঠাৎ যেন ঝাপসা হয়ে গেল ৷ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ঈশান ৷ ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল ৷ আসলে একটা কুয়াশার চাদর হঠাৎই যেন নেমে এসেছে মন্দিরের চারপাশে, তাই কুয়াশার আড়ালে প্রায় অদৃশ্য মন্দিরটা ৷ গায়ে চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে কুয়াশা ভেদ করে সামনে এগোতে লাগল ঈশান ৷ আর তারপর সামনের কুয়াশার পর্দা যেন কেটে গেল ৷ ঈশান দেখতে পেল সুবিশাল প্রাচীন এক মন্দিরের বেদিমূলে এসে দাঁড়িয়ে সে ৷ প্রাচীন পাথরের তৈরি সোপানশ্রেণি তার সামনে থেকে উঠে গেছে বেদির ওপর ৷ আর সেখান থেকে মন্দিরগাত্র পর্বতমালার মতো ধাপে ধাপে পিরামিডের মতো উঠে গেছে চন্দ্রালোকিত আকাশের দিকে ৷ মন্দিরের গায়ে চাঁদের আলোতে জেগে আছে অসংখ্য ভাস্কর্য, অলংকরণ, মূর্তি ৷ অদ্ভুত সুন্দর হাজার বছরের প্রাচীন এক মন্দির! খাজুরাহোর কান্তরিয় মন্দির ৷ চান্দেলা রাজবংশের অতুলনীয় কীর্তি ৷
