মাঠের পাশে একটা অটো এসে থামল। অটো থেকে জনাছয়েক লোক নেমে এগিয়ে এল মাঠের দিকে। এরপর অটোর পিছনে এসে থামল তিনটে মোটর বাইক। আরো ছজন। ওরা সকলেই লাইনের সামনের দিকে এগিয়ে গেল। ‘পল্টন—’ বলেই হি হি করে কাল রাতের সেই অদ্ভুত গা শিরশির করা হাসিটা হেসে উঠল চৈতি।
লাইনের সামনের দিকে একটা জটলা এবং হালকা হৈ চৈ শুরু হল। রঙ্গনের মনে হল ধীরে ধীরে এগোতে থাকা ভোটদাতাদের দীর্ঘ লাইন হঠাৎ যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। রঙ্গন বুথের ভেতরে ঢোকার জন্যে দ্রুত পা চালাল।
.
বুথে ঢুকে স্তম্ভিত হয়ে গেল রঙ্গন। ভোটকেন্দ্রের দখল নিয়ে নিয়েছে বহিরাগতরা। চঞ্চলবাবুসহ সমস্ত ভোটকর্মীই প্রতিবাদহীন হুকুম তামিল করে যাচ্ছে ওই লোকগুলোর। চারজন পুলিশকর্মীর মাত্র একজনকে দেখতে পেল রঙ্গন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি উদাস দৃষ্টিতে বাইরের দিকে চেয়ে। তাঁকে দেখে মনেই হল না ভিতরে অন্যায় এবং অসাংবিধানিক একটা ঘটনা ঘটছে এবং সেটা আটকানোর দায়িত্ব তাঁর। রাগে ফেটে পড়ল রঙ্গন। ভদ্রলোকের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল সে, ‘এমন ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে করছেনটা কী আপনি? ভিতরে কী চলছে দেখছেন না—’
ভদ্রলোকের চোখেমুখে বিরক্তি ফুটে উঠল। চাপা গলায় রঙ্গনকে পরামর্শ দিলেন তিনি, ‘আপনিও চেপে গিয়ে বসে পড়ুন নিজের জায়গায় এভাবে। ঢাল তরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দার হয়ে এসব আটকানো যায় না। সবাই জানে। এমনই তো চলে আসছে—’
‘ছিঃ ছিঃ, পুলিশ হয়ে আপনি একথা বলছেন,’ বিরক্ত হয় রঙ্গনও, ‘আর নিধিরাম সর্দার বলছেন ক্যানো নিজেকে, হাতে তো রাইফেল রয়েছে আপনার—’
‘খবর্দার যেন আবার ফায়ারিং অর্ডার দিয়ে বসবেন না—’পাতলা একটা হাসি ফুটে ওঠে ভদ্রলোকের মুখে, ‘এসব রাইফেলে গুলি সহজে বেরোয় না। ‘
‘মানে?’
‘আরে মশাই এসব মান্ধাতার আমলের জিনিস। ভোটের সময় এগুলো বেরোয় একজিবিট করার জন্য। চালানোর জন্যে নয়। তাছাড়া আমার এই বন্দুক ঘাড়ে তুলে গুলি করার জন্যে রেডি করতে করতে সব এসে ঠাস করে চড় মেরে বন্দুকটি কেড়ে নেবে। তখন আরো বড় কেলো। আমার চাকরিটি যাবে—’ভদ্রলোকের সঙ্গে আর কথা বলার ইচ্ছে হল না রঙ্গনের। সামনের মাঠের দিকে চেয়ে সে দেখল ভোটদাতাদের দীর্ঘ লাইন ভেঙেচুরে গেছে। ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে মানুষ। দু—একজন প্রতিবাদ করতে গিয়ে বকা খাচ্ছেন পুলিশকর্মীদের কাছেও। খুব কাছেই কোথাও ধ্রাম করে বোমা ফাটার আওয়াজ হল একটা। রঙ্গনের চোখের সামনেই খুব দ্রুত মাঠটা ফাঁকা হয়ে গেল। ও দেখল চৈতির হাত ধরে দ্রুত পায়ে ফিরে যাচ্ছে ওর মা। পাছে ওর চোখে চোখ পড়ে যায়, তাই তাড়াতাড়ি বুথের মধ্যে ঢুকে পড়ে নিজের চেয়ারে বসে পড়ল রঙ্গন।
তুহিন সরকার রঙ্গনের দিকে চেয়ে হাসলেন। তাকে আশ্বস্ত করার ঢঙে বললেন, ‘ব্যস আর কোনো ঝামেলা নেই স্যার। আপনি নিশ্চিত হয়ে বসে রিল্যাক্স করুন। আর পারলে পেপারগুলো রেডি করে ফেলুন, বাকিটা আমরা সামলে নিচ্ছি। চিন্তা করবেন না, সেন্ট পারসেন্ট পোল আমরা করব না। জানি আপনি অসুবিধেয় পড়তে পারেন তাতে। তবে এইট্টি এইট্টি ফাইভ পারসেন্ট পোল হতেই পারে। এগজ্যাক্ট নাম্বারটা একটু পরে আপনাকে জানিয়ে দিচ্ছি, আপনি বসিয়ে নেবেন ওটা—’
অসহায় আক্রোশে বুকের মধ্যেটা জ্বালা জ্বালা করছিল রঙ্গনের। পোলিং পার্টির বাকি লোকগুলোকে দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছিল সে। কারো মধ্যে কোনো বিচলন নেই। যেন এটাই স্বাভাবিক। এই লোকগুলোর হুকুম তামিল করাই যেন একমাত্র কর্তব্য তাঁদের।
রঙ্গন উঠে দাঁড়াল। প্রতিবাদে ফেটে পড়ল সে, ‘এটা হতে পারে না। আমি এ হতে দিতে পারি না—’
চঞ্চলবাবু চোখের ইশারায় থেমে যেতে বললেন ওকে। সেকেন্ড ও থার্ড পোলিং অফিসারও বোঝালেন, ‘স্যার আপনার অভিজ্ঞতা কম। দীর্ঘদিন ভোট করছি আমরা। আপনি থেমে যান। না হলে আমরা সবাই বিপদে পড়ে যাব।’
রঙ্গন কথা শুনল না। মোবাইল বের করল পকেট থেকে। বলল, ‘আপনি বসে থাকুন হাত—পা গুটিয়ে। আমি পারব না। আমি সেক্টরে ফোন করব। দরকার হলে সেন্ট্রাল ফোর্স আনিয়ে ভোট করাব। আমি—।’
রঙ্গনকে কথা শেষ করতে না দিয়েই একটা ষণ্ডা—মতন ছেলে এসে দাঁড়াল তার সামনে। কোমরে গোঁজা আগ্নেয়াস্ত্রটা একটানে পাঞ্জাবির নীচ থেকে বের করে এনে রঙ্গনের নাকের সামনে দোলাতে দোলাতে সে বলতে লাগল, ‘কর্তব্যবোধ যে একেবারে উথলে উঠছে দেখছি। দুটো দানা শরীরে ভরে দিয়ে এক্ষুনি যদি গাঙের জলে ভাসিয়ে দিই, এসব বোলচাল কোথায় যাবে চাঁদু—’
তুহিন সরকার ছদ্ম ধমক দিয়ে ওঠেন, ‘তুই বড্ড অল্পে মাথা গরম করিস পল্টন। ভুলে যাস না উনি অতিথি আমাদের। এক্ষুনি দানা টানার কথা ক্যানো তুলছিস—তুই বরং এক কাজ কর। ওঁর মোবাইলটা আপাতত নিয়ে আমার কাছে গচ্ছিত রাখ। দু’ঘণ্টা অন্তর রিপোর্ট পাঠাতে হবে ওই মোবাইল থেকে। ওনার যা মনের অবস্থা তাতে ওনার ওপরে কাজের চাপ দিয়ে আর কাজ নেই। আমিই বরং সময়ে সময়ে রিপোর্টগুলো পাঠিয়ে দেব’খন—’
এই তাহলে পল্টন। চৈতি এই ছেলেটার বিষয়েই একটা কিছু ইঙ্গিত করতে চাইছিল কাল। ভাবতে ভাবতে অসহায়ের মতন নিজের চেয়ারে বসে পড়ে রঙ্গন। একটা অদ্ভুত কান্নার ভাব হচ্ছে বুকের মধ্যে। পরাজিত মনে হচ্ছে নিজেকে। নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেরই দুয়ো দিতে ইচ্ছে হচ্ছে বার বার। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। কবে যে সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে! ভারতবর্ষের মানুষ সত্যি সত্যি গর্ব করতে পারবে নিজেদের গণতন্ত্র নিয়ে, তুহিন সরকার বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘টিফিনে লুচি আলুর দম আর মিষ্টি বলে এবার আনাই?’
