‘নিশ্চয়ই—’ রঙ্গন আত্মপ্রত্যয়ের সাথে বলে।
‘তুমি সত্যি কথা বলছ তো’, মেয়েটা বিনুনি থেকে হাত সরায়, ‘আমার না নিজেরটা নিজে দেবার খুব শখ। আগের বারই তো মাত্র ভোটার হলাম সবে—’
‘আগেরবার ভোট দাওনি তুমি?
‘না।’ বলে মুখ ঘুরিয়ে নেয় চৈতি।
‘ক্যানো?’
উত্তর দেয় না চৈতি। খিলখিল করে হেসে ওঠে আবার। তারপর দ্বিতীয়বার দিকে করে রঙ্গনকে, ‘সত্যি সত্যিই কাল তুমি আমায় ভোট দিতে দেবে তো?
‘শুধু তুমি কেন চৈতিদিদি, সবাই কাল নিজের ভোট নিজে দেবে। আমি নিশ্চিন্ত করে বলছি’ রঙ্গন বলে, ‘সেইজন্যেই তো আমরা এসেছি—’
‘এমনি এমনিই ভোট দিতে দেবে আমায়?’
‘মানে?’
‘কিছুই দিতে হবে না তার বদলে?’
‘কী দেবে তুমি আমায় চৈতিদিদি?’
‘আমার যা আছে,’ বলে দীর্ঘ হাসিতে ফেটে পড়ে চৈতি, তারপর দ্রুত হাতে কামিজের বোতাম খুলতে শুরু করে সে।
মেঘের হালকা আবডাল ফুঁড়ে চাঁদের আবছা আলো এসে পড়ছে চৈতির অন্তর্বাসহীন আধখোলা বুকের ওপর। মেয়েটাকে মায়াবী লাগছে ভীষণ। রঙ্গন মারাত্মক ভয় পেয়ে গেল। হাতের আঙুল আড়ষ্ট হয়ে উঠল তার। শরীর ঘেমে উঠল। শুকিয়ে যাওয়া গলায় কোনোক্রমে বলে উঠল সে, ‘কী করছ তুমি চৈতিদিদি, তুমি বাড়ি যাও। আমি কথা দিচ্ছি কাল তোমরা সবাই ঠিকঠাক ভোট দেবে। আমি নিজে দেখব এটা—’ তারপর পিছন ফিরে ছুটতে শুরু করে সে মাঠ পেরিয়ে, স্কুলবাড়ির দিকে।
এজেন্টরা পৌঁছ গিয়েছিল সকাল সাড়ে ছ’টার মধ্যেই। প্রয়োজনীয় কাজকর্ম, সইসাবুদ সেরে কাঁটায় কাঁটায় সাতটাতেই শুরু হয়েছিল ভোট। এই সকালবেলাতেই প্রচুর মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছেন স্কুলের বাইরের ফাঁকা মাঠে। আলো ফোটারও আগে আজ ঘুম থেকে উঠতে হয়েছে রঙ্গনকে। আমার সারারাত ঘুমই হয়নি ভালো করে। বাথরুম—পায়খানার কোনো বন্দোবস্ত এখানে নেই। মাঠে—ঘাটে খোলা জায়গায় প্রাতঃকৃত্য সারার কথা ভাবতেই পারে না সে। কাজেই ও কাজটা হয়নি। পুকুরে স্নান করার অভ্যাসও নেই তার। তবুও অনেক কষ্টে পুকুরে নেমে ভয়ে ভয়ে দু—একটা ডুব দিয়ে নিয়েছে সে সেই কাকভোরে। সকাল থেকেই মনের মধ্যে একটা বিচ্ছিরি অস্বস্তি কাজ করছিল। পোল ঠিকঠাক শুরু হওয়াতে এখন অনেকটা স্বস্তি বোধ করছিল সে।
এজেন্টদের মধ্যে একজন রঙ্গনের চেনা। পঞ্চায়েত প্রধানের সাথে ভদ্রলোক কাকভোরে এসেছিলেন রঙ্গনের সঙ্গে দেখা করতে। আজ ওনার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে রঙ্গনের। উনি তুহিন সরকার। এলাকায় বিল্ডিং মেটারিয়ালের বড় ব্যবসা আছে। তুহিনবাবু মানুষটি বেশ হাসিখুশি। কথাবার্তাও অমায়িক। ভোট শুরু হবার মিনিট দশ—পনেরো বাদেই পাশে বসা কমবয়েসি একটা ছেলেকে তাড়া দিলেন তিনি কীরে, কী আক্কেল বল’তো তোদের, স্যারদের চা টা কিছু খাওয়াবি তো নাকি—এখুনি? বলে হাসে ছেলেটা।
এখুনি কী রে, সাড়ে সাতটা বাজতে চলল তো—’ধমকে ওঠেন তুহিনবাবু’ আরো পরে চা খাওয়ালে টিফিন খাওয়াবি কখন—জানিস তো বাবুদা বারবার করে বলে দিয়েছেন স্যারেদের যত্নআত্তিরে যেন কোনো ত্রুটি না হয়—। আর শোন, পলটন আর প্যাটকাকে এবার চলে আসতে বলে দে। পল্টনদা আটটায় আসবে বলেছে—
‘মানে এক ঘণ্টা এভাবে চলবে? ব্যাপারটা রিস্ক হয়ে যাচ্ছে না?’
‘রিস্কের কী আছে। এক ঘণ্টায় কত আর পোল হবে—আশি, খুব বেশি হলে একশো—হাজার ছাপ্পান্ন ভোটার আছে এই বুথে। অত ভাবছেন ক্যানো দাদা—’ বলতে বলতে উঠে পড়ে ছেলেটা। রঙ্গনের দিকে চেয়ে হাসে। তারপর আসছি একটু স্যার—বলে দরজার দিকে পা বাড়ায়।
রঙ্গনের অস্বস্তি হচ্ছিল। ওদের কথাবার্তার মধ্যে অন্য কিছু একটা ইঙ্গিত আর ইঙ্গিতটা রঙ্গন ধরতে পারছিল না। একটুক্ষণের মধ্যেই চা এসে গেল। সঙ্গে দুটো করে বিস্কুট। তুহিনবাবু রঙ্গনের দিকে চেয়ে একগাল হাসলেন, ‘খেয়ে নিন স্যার।’
চা খেয়ে বুথের বাইরে এসে দাঁড়াল রঙ্গন। ফাঁকা মাঠে ভোটদাতাদের দীর্ঘ লাইন পড়েছে। ধীরে ধীরে এগোচ্ছে সেই লাইন। রঙ্গন একটা সিগারেট ধরাল। চলমান মানুষের সারির দিকে চেয়ে আসমানে ধোঁয়া ছাড়তে লাগে সে সিগারেট থেকে। হঠাৎ লাইনের অনেকখানি পিছন দিকে সে চৈতিকে দেখতে পেল। ভোটদাতাদের লাইনে ভোট দেবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে চৈতি। চোখে মুখে উত্তেজনার ছাপ স্পষ্ট। ওর ঠিক পিছনে ওর কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে এক প্রৌঢ়া। মাথায় ঘোমটা টানা। বিধবা। চৈতির মা হয়তো। রঙ্গন এগিয়ে গেল। ওর ভালো লাগছিল। মেয়েটা কাল ভোট দিতে পারবে কিনা এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছিল চৈতি, কী আশ্চর্য, ঠিক চিনতে পারল রঙ্গনকে। রঙ্গনের দিকে চেয়ে হাসল। হাসিটা কাল রাতের মতন দুর্বোধ্য ও রহস্যময় নয়। পিছনের মহিলাকে রঙ্গনের দিকে ইশারা করে দেখাল চৈতি। বলল, ‘মা এ লোকটা পল্টনদের মতন নয়। ও ভালো লোক। ও আমাকে ভোট দিতে দেবে বলেছে—’
মহিলা ম্লান হাসলেন। ধীর গলায় রঙ্গনের দিকে চেয়ে বললেন, ‘ও ঠিক সুস্থ নয়। ওর কথায় কিছু মনে কোরো না বাবা—’
‘মনে করার কিছু নেই মাসিমা,’ রঙ্গন হেসে বলে, ‘চৈতিদিদির সাথে সত্যিই কাল আমার এ কথা হয়েছে—’
‘ও।’ বলে চুপ করে যান মহিলা। রঙ্গন বলে চলে, ‘আমাদের দেশ ভারতবর্ষ পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র। আর আপনারা সেই গণতন্ত্রের স্তম্ভ। আমাদের তো এটাই কাজ মাসিমা, আপনারা যাতে ঠিকঠাক গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সেটা আমি অবশ্যই দেখব—’
