‘আনান’—সকলে বলল। রঙ্গন কথা বলল না।
‘দুপুরে মাংস আর ভাত থাকছে। বেশি রিচ করতে না করেছি। যা গরম—’ সরকার আবার বললেন।
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। হালকা ঝোলভাতই ভালো—’ সকলে বলল। রঙ্গন কথা বলল না।
তুহিন সরকার রঙ্গনের দিকে চাইলেন, ‘স্যার—’
‘আমি খাব না কিছু—’
‘সে কী, ক্যানো?’
‘আমার রুচি নেই।’
‘দুপুরে ভাত—’
‘খাব না।’
‘একটু চা বলি তবে?’
‘না।’
‘এটা কি আপনার প্রতিবাদ?’
রঙ্গন কথা বলল না। তুহিন সরকার নিঃশব্দে হাসতে লাগলেন।
হালকা জোলো বাতাস বইছিল নদীর দিক থেকে। গাছের পাতায় ধাক্কা খেতে খেতে সেই বাতাস অদ্ভুত এক বিষণ্ণ শব্দ তুলছিল। একটানা ঝিঁঝিঁ ডাকছে আবছা অন্ধকারে। রঙ্গন সেই ফিকে অন্ধকারে নদীর দিকে চেয়ে চুপ করে বসেছিল অন্যদের থেকে খানিকটা তফাতে। সাইকেল মেসেঞ্জার বুথ থেকে জেটিঘাটে পৌঁছে দিয়ে ওর থেকে রিলিজ নিয়ে চলে গেছে। সেক্টর থেকে খবর পাঠানো হয়েছে ওদের লঞ্চ অন্য একটা দ্বীপের পোলিং পার্টিদের তুলতে গিয়ে ভাটায় আটকে পড়েছে, জোয়ার না এলে তার আর নড়ার উপায় নেই। অতএব অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো পথ নেই এখন। সকলেই কম বেশি ক্লান্ত। দুপুরের গুরু ভোজনে আর নদীর দিক থেকে আসা ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া চোখের পাতা ভারী করে দিচ্ছে ক্রমাগত। রঙ্গনের সহকর্মীরা ভোটের জিনিসপত্রের ওপরেই মাথা রেখে শুয়ে পড়েছে কেউ কেউ। এমনকী পুলিশকর্মীরাও জেটিঘাটের নির্জন চাতালে পলিথিন শিট বিছিয়ে নাক ডাকাচ্ছেন নিশ্চিন্তে।
রঙ্গনের চোখে ঘুম আসছিল না। খিদে পেয়ে পেয়ে মরে গিয়ে একটা বিচ্ছিরি অস্বস্তি হচ্ছে শরীরের মধ্যে। মনটাও তুমুল বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। অন্যায়ের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া কিছুই করতে পারল না সে। ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে চেয়ে ওর মনে হচ্ছিল ঠিক এই সময়ে এই দ্বীপে ভোট না দিতে পারা মানুষগুলো একজোট হয়ে এসে যদি ভোটের অরক্ষিত কাগজপত্র সব কেড়েকুড়ে নিত তাহলেও হয়তো রিপোর্ট করানো যেত এখানে। তখনও হয়তো ফল একই হত, কিন্তু রঙ্গনের আর কোনো দায়ভার থাকত না হাতে। ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে ঢকঢক করে খানিকটা জল খেল রঙ্গন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একটা নির্দিষ্ট ধারায় অকারণ পায়চারি করতে লাগল নদীর পাড় বরাবর ইটপাতা রাস্তার ওপর দিয়ে।
আনমনে হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল রঙ্গন। একটা ছায়া—মানুষ পথ বেয়ে ক্রমশ এগিয়ে আসছে এইদিকে। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তার। তবে কি এক্ষুনি যা ভাবছিল তাই সত্যি হতে চলেছে—গ্রামের মানুষ একজোট হয়ে হামলা করতে আসছে তাদের ওপর রাতের অন্ধকারে? রঙ্গন চুপ করে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। ছায়ামূর্তি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে তার থেকে একটু দূরে এসে থামল। সঙ্গীহীন, একা একাই। তারপর কাপড়ের আড়াল থেকে একটা হাত বের করে নিঃশব্দে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকল তাকে।
রঙ্গন অবাক হয়ে গেল। চিনতে একটুও অসুবিধা হল না তার। চৈতির মা। ধীর পায়ে তাঁর সামনে গিয়ে অপরাধীর মতন মুখ করে দাঁড়াল সে। তারপর চাপা গলায় বলল, ‘আমায় ক্ষমা করবেন মাসিমা। আমি পারিনি—’
মহিলা কথা বললেন না। এক হাতে রঙ্গনের হাত ধরে আরো খানিকটা তফাতে নিয়ে গিয়ে শাড়ির আঁচল সরিয়ে আর এক হাতে ধরা টিফিন কৌটোটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘নাও বাবা, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও—’
—রঙ্গন ফ্যাল ফ্যাল করে তাঁর মুখের দিকে চেয়ে রইল। মহিলা আবার বললেন, ‘আমি জানি তুমি কিচ্ছু খাওনি সারাদিন। আমি শুনেছি। অমন করে কেউ—না খেয়ে থাকলে শরীর খারাপ হবে যে—’
‘আমি পারিনি মাসিমা—’ গলা ভারী হয়ে আসে রঙ্গনের, ওদের দেওয়া খাবার—তুমি আমার ছেলেরই মতন। বয়েসেও, স্বভাবেও—তোমার মতনই ও—ও ছিল। তবে বড্ড এক বগ্গা। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে পারত না। আর তোমারই মতন বোকা। বুঝতেই চাইত না যে একা একা সবকিছু পাল্টে ফ্যালা যায় না—’
‘তারপর?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে রঙ্গন।
মহিলা টিফিন কৌটো খুলে মেলে ধরেন রঙ্গনের সামনে, ‘বেশি কিছু নেই বাবা, অভাবের সংসার আমার। রুটি আছে। আর কুমড়োর তরকারি। রঙ্গন হাত দিয়ে রুটি তরকারি নিয়ে মুখে দেয়। মহিলা বলতে থাকেন, ‘সেবার চৈতি প্রথম ভোট দেবে। পাঁচ বছর আগের সে দিনেও পল্টনরা আমাদের সরিয়ে দিয়ে বুথ দখল করে নিয়েছিল। আমার ছেলে তার দিদিকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে প্রতিবাদ করেছিল। বলেছিল দিদির ভোট দিদিই দেবে—’
‘কী হল তারপর?’
‘ভোট দিবি, আয়—বলে চৈতির হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে পঞ্চুদের ভাঙা গোয়ালঘরে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল পল্টন—’ বলে একটু থামলেন উনি। তারপর বড় করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘আমার বোকা ছেলেটা দিদিকে বাঁচাতে তখনও লড়াই করতে গিয়েছিল পল্টনের সাথে। প্রতিবাদ করেছিল সে—আর তাই দুদিন নিখোঁজ থাকার পর সে ওই নদীর জলে ভেসে উঠেছিল। পুলিশে রিপোর্ট লেখা হয়েছিল স্নান করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত জলে ডুবে মৃত্যু—’
‘আর পল্টন?’ বোকার মতন জিজ্ঞেস করে রঙ্গন।
‘দেখলে তো নিজের চোখে। সেদিনও যা করত, এখনও তাই করে। সময়মতন দলটা পাল্টে ফেলেছে শুধু। কে ওকে ছোঁবে বাবা—ওকে যে সবার দরকার। আমরা তো কারো কাছে দরকারি নই—’ বলতে বলতে শূন্য টিফিন কৌটোটা আঁচলের নীচে ঢুকিয়ে নিয়ে আবার রঙ্গনের দিকে চাইলেন তিনি। তারপর আঁচলে চোখ মুছে বললেন, ‘তোমার জন্য ভারী চিন্তা হচ্ছিল আমার। তুমি বেঁচে থেকো আর সাবধানে থেকো বাবা—’
