পাশের একটি ছেলে এতক্ষণে রঙ্গনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল তাঁর, ‘ইনি আমাদের অঞ্চলের পঞ্চায়েত প্রধান—’
‘নমস্কার—’রঙ্গন দু’হাত জড়ো করে তুলে আনে বুকের কাছে।
‘নমস্কার—’সিগারেট ধরা ডানহাতটা কপালে ছোঁয়ান ভদ্রলোক ‘কাল দেখা হবে—’
‘নিশ্চয়ই।’ রঙ্গন বলে, ‘একটা কথা মাথায় রাখবেন। এজেন্টরা যেন কাল সকালে সময় মতন চলে আসেন। আমি কিন্তু ঠিক সাতটায় পোল স্টার্ট করব।’
‘আপনি একদম চিন্তা করবেন না এসব নিয়ে—’
আশা করি আপনাদের সকলের সহযোগিতা পাব কাল—’
‘একশোবার। আমাদের এখানে ভোট করাতে এসেছেন। আপনারা এখন আমাদের অতিথি। আপনাদেরে সুবিধে—অসুবিধে তো আমাদের দেখতেই হবে—’ বলে পাশের আর একটা ষণ্ডা মতন ছেলের দিকে চাইলেন প্রধান মশাই, ‘প্যাটকা, কাল সকাল থেকে থাকিস এদিকে। সকাল থেকে বিকেল স্যারদের খাওয়াদাওয়ার কোনো সমস্যা যেন না হয়। দায়িত্ব তোর।’
‘হ্যাঁ দাদা। আজই আমি তরুণকে দিশি মুরগির অর্ডার দিয়ে দিয়েছি—’
‘গুড। আর শোন। ভালো দেখে কিছু কচি ডাব পাড়িয়ে রাখিস। যা গরম—’
‘হয়ে যাবে দাদা—’বশংবদ ভঙ্গিতে বলে ছেলেটা।
‘এসবের দরকার হবে না—’ গম্ভীর হবার চেষ্টা করে রঙ্গন, কনটিজেন্সির টাকা থেকে ওটা আমরা ব্যবস্থা করে দেবখন—’
‘তা তো হবে না। বলেই তো দিয়েছি আপনারা আমাদের অতিথি এখন—’ ভদ্রলোকের আপাত শান্ত ভাবটা ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। রঙ্গন বুঝতে পারল লোকটার চোখমুখ ক্রমশ শীতল আর কঠিন হয়ে উঠছে এবার। প্রধান বলে চললেন, ‘এখানে আমি ঠিক করি কী হবে আর কী হবে না। আমাদের দিক থেকে সবরকম সহযোগিতা আপনারা পাবেন কোনো অসুবিধা হবে না আপনাদের। তবে হ্যাঁ, আমরাও কিন্তু কাল আপনাদের কাছ থেকে সহযোগিতা আশা করব—’
‘সে তো বটেই। শুধুমুধু ঝামেলা পাকিয়ে তো লাভ নেই। আমরাও তো চাই নির্ঝঞ্ঝাটে ভোটটা করে বাড়ি ফিরতে—’ রঙ্গনকে কিছু বলতে না দিয়েই ওর পাশ থেকে সেকেন্ড পোলিং অফিসার বলে উঠলেন। ‘একশোবার—’থার্ড পোলিং অনাথবন্ধুবাবুও সমর্থন করলেন তাঁকে।
‘মনে থাকে যেন,’ পঞ্চায়েত প্রধান বললেন, ‘এখানে আসাটা আপনাদের ইচ্ছেয়, কিন্তু ফেরাটা আমাদের ইচ্ছে অনুযায়ী—’ ভদ্রলোক সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। রঙ্গন যাবার সময় তাঁকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, চঞ্চলবাবু ইশারায় চুপ করতে বললেন তাকে।
ভদ্রলোক বেরিয়ে যাবার পর ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে ফাঁকা মাঠে এসে দাঁড়াল রঙ্গন।
নদীর দিক থেকে ছুটে আসা হাওয়ার গতি আরো বেড়েছে এখন। বিকেলে নদীর ও পাশে আর ধানজমির ওই দিকে সবুজ পাঁচিলের মতন বিছিয়ে থাকা গাছগুলো ভারী সুন্দর লাগছিল। এখন ছায়া ছায়া ঝুপসি অন্ধকারের মধ্যে মিশে থাকা আরো গাঢ় অন্ধকার হয়ে থাকা গাছগুলির দিকে চাইলে অকারণেই যেন গা ছম ছম করে ওঠে। কী অদ্ভুত রকম নিস্তব্ধ চারদিক! কাল এই স্কুলবাড়ির আশপাশের এলাকাগুলো থেকেই প্রায় হাজার মানুষ ভোট দিতে আসবে এই বুথে, এই নৈঃশব্দ্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে যেন একথা বিশ্বাসই করা যায় না। আকাশে আধখানা চাঁদ উঠেছে। কিন্তু আলোর জোর নেই একটুও। মাঝে মাঝে ছেঁড়া ছেঁড়া কালো মেঘের টুকরো উড়ে এসে চাঁদকে ঢেকে ফেলছে যেই, অমনি সেই মৃদু আলোটুকুও মুছে যাচ্ছে। মেঘ সরে গেলে আবার আলো ঠিকরে আসছে আকাশ দিয়ে। পঞ্চায়েত প্রধান তাঁর দলবল নিয়ে মাঠ পার হয়ে যেতেই একখণ্ড ‘বড়’ কালো মেঘ চাঁদটাকে ঢাকা দিয়ে দিল। আর তখনি একটানা খিল খিল খিল খিল করে হাসির শব্দ উড়ে এল রঙ্গনের কানে। সেই হাসির মধ্যে শুধুমাত্র অসংলগ্নতা নয়, রঙ্গনের মনে হল, যেন একটা তীব্র বিদ্রুপ খেলা করে বেড়াচ্ছিল পুরো মাঠ জুড়ে। চমকে সেদিকে ফিরে তাকাল সে।
সন্ধের আগে যেমন বসেছিল, চৈতি এখনও ঠিক তেমন ভঙ্গিতেই বসেছিল মাটির ওপর। একই জায়গায়। বসে বসে ঘাড় ঘুরিয়ে পঞ্চায়েত প্রধান যে দিকে চলে গেলেন সেদিকে চেয়ে সে হাসছিল। রঙ্গন ধীর পায়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে হঠাৎ হাসি থামিয়ে রঙ্গনের মুখের দিকে চাইল। তারপর রঙ্গনকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠল, ‘তোমরা সবাই শয়তান। তোমরা সবাই একইরকম আমি জানি তোমরা কেউ আমাদের ভোট দিতে দেবে না কাল—’
রঙ্গন অবাক হয়ে গেল। মেয়েটা তার সাথে কথা বলছে। কিন্তু এমন কথা বলছে কেন ও? ওর কথাগুলো কি নিছকই পাগলের প্রলাপ?
মেয়েটা আবারও মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে প্রধানের চলে যাওয়া— পথের দিকে। রঙ্গন একটুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে খুব শান্ত গলায় মেয়েটিকে বলে উঠল, ‘চৈতিদিদি, অন্ধকার হয়ে গেছে। তুমি বাড়ি যাবে না?—’
কী বললে আমায়, দিদি—চকিতে রঙ্গনের দিকে ঘুরে তাকাল মেয়েটা। ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল মাটি থেকে। তারপর রঙ্গনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে বলে উঠল ঠান্ডা গলায়, ‘আমি বিশ্বাস করি না। নতুন গাঁয়ের পল্টনকেও তো আমি দাদা বলে ডাকতাম। কিন্তু—’
‘কিন্তু কী?’ জিজ্ঞেস করে রঙ্গন।
চৈতি এ কথার উত্তর দেয় না। নিঃশব্দে হাসে। তারপর ঘাড় বে�কিয়ে দাঁড়িয়ে রঙ্গনের দিকে চেয়ে ডানহাত দিয়ে চুলের বিনুনিটা নাড়াতে নাড়াতে বলে, ‘তুমি তো ভোটবাবু, কাল আমায় তুমি ভোট দিতে দেবে?’
