ফার্স্ট পোলিং চঞ্চলবাবু প্রৌঢ় মানুষ। অভিজ্ঞ। এর আগে অন্তত চারবার পঞ্চায়েত ইলেকশন করার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। কম—বয়সি সদ্য চাকরি পাওয়া রঙ্গনকে প্রথম ট্রেনিং—এর দিন থেকেই অভয় দিয়ে আসছিলেন তিনি। বুথে পৌঁছে কাঁধের ব্যাগ আর ভোটের মালপত্র নামিয়ে রাখল রঙ্গন। বুথ মানে ছোট্ট ছোট্ট দুটো প্লাস্টারবিহীন ইটের ঘর। মেঝে মাটির, অ্যাসবেস্টসের ছাউনি। ঘরে গ্রিল লাগানো জানলা আছে, কিন্তু পাল্লা নেই। এই দু—কামরাঅলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটা ঘরেই কাল ভোট দিতে হবে। ইলেকট্রিক নেই। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বেশ ঢিলেঢালা। ভোটিং কমপার্টমেন্টের গোপনীয়তা নিশ্চিত করাটাই বেশ কঠিন। রঙ্গন ঘরের বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। সামনে বিস্তৃত ফাঁকা মাঠ, মাঠের ওপারে নদী। নদীর দিক থেকে একটা জোলো জোলো ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে সর্বক্ষণ। স্কুলবাড়ির ডানদিকে মাঠের ওপাশে গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে দু—চারটে বাড়ি দেখা যাচ্ছে। কাঁচাবাড়ি। টালির ছাউনি। বাঁ পাশে মাঠের শেষ থেকে কৃষিজমি শুরু হয়ে গেছে। আগে এ জমিতে ভালো চাষ হত। আয়লার পর থেকে জমিটা নাকি ততখানি ফসল দিচ্ছে না আর। রঙ্গন মাঠে দাঁড়িয়ে চারপাশটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। খুব ভালো লাগছিল তার। রুক্ষ, ধূসর স্কুল মাঠটুকু বাদ দিলে চারদিকেই সবুজের কোনো খামতি নেই। নদীর দিক থেকে একটানা এত হাওয়া দিচ্ছে যে গরম মালুমই হচ্ছে না তেমন। চারদিক শান্ত চুপচাপ। একদল কচিকাঁচা ছেলেমেয়ে এসে জুটেছে মাঠে। একটু তফাতে দাঁড়িয়ে হাঁ করে রঙ্গনদের দেখছিল ওরা। একটু আগে একজন পুলিশকর্মী এগিয়ে গিয়ে ‘কী চাই তোদের’ বলে হেঁকে উঠতেই দুদ্দাড় করে দৌড়ে পালিয়েছিল ওরা, সেই ভদ্রলোক সরে যেতেই গুটি গুটি পায়ে আবার এসে জুটেছে ছেলেমেয়েগুলো। রঙ্গনের বেশ মজা লাগছিল ওদের দেখে। স্কুলবাড়ির পাশেই মাঠের ধুলোর ওপরে অনেকক্ষণ থেকে একটা মেয়ে চুপচাপ বসে আছে। গায়ের মলিন সালোয়ার কামিজে ধুলো মেখে একসা। একদৃষ্টে সে তাকিয়েছিল রঙ্গনের দিকে। মেয়েটি যুবতী। স্বাস্থ্য মন্দ না। তার ওড়নাবিহীন বুকের দিকে চোখ পড়তেই চোখ ফিরিয়ে নিল রঙ্গন অন্যদিকে। মেয়েটি নির্বিকার। তার চোখে চোখ পড়তে গা শিরশির করে উঠল রঙ্গনের। মেয়েটার চাউনিটা বড় অদ্ভুত। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না। চঞ্চলবাবু ঘরের মধ্যে থেকে ডাক দিলেন এই সময়েই, ‘স্যার আসুন, সময় নষ্ট করে লাভ নেই। আলো মরে আসার আগে কাজ যতটা এগিয়ে রাখা যায় ততই ভালো। সাইকেল মেসেঞ্জার একটার বেশি হ্যারিকেন জোগাড় করতে পারবে না বলে দিয়েছে। কাজে কাজেই—’
‘আসছি—”বলে কমবয়সি ছেলেমেয়েগুলোর দিকে তাকায় রঙ্গন। গলাটা ইচ্ছে করে দাবী করে বলে, ‘আমরা কাজ করব। তোরা এখন যা। পালা এখান থেকে—’ ছেলেগুলো রঙ্গনের মুখের দিকে তাকাতে তাকাতে একটু তফাতে সরে যায়। চলে যায় না। রঙ্গন মাটিতে বসে থাকা মেয়েটির সামনে এসে দাঁড়ায়। খুব নরম গলায় বলে, ‘আপনি এভাবে বসে আছেন কেন এখানে? আপনি এবার আসুন। এখানে বসে থাকবেন না এভাবে।’ মেয়েটি রঙ্গনের মুখের দিকে তাকায়। তাকিয়েই থাকে। কোনো কথা বলে না। নড়েও না সেখান থেকে।
রঙ্গন আবার বলে, ‘কী হল, উঠুন আপনি—’
মেয়েটা গা দোলাতে দোলাতে খিল খিল করে হেসে ওঠে। সেই হাসিতে কেন যেন গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে রঙ্গনের। ছেলের দল দূর থেকে বলে ওঠে, ‘ও এখন আর সহজে কথা কয় না। ও কেবল হাসে আর কখনও কখনও কাঁদে। চৈতিদিদি পাগল হয়ে গেছে—’
মেয়েটা ঘাড় বেঁকিয়ে ছেলেগুলোর দিকে চায়। হাত নেড়ে বলতে থাকে ‘যা: যা:’—তারপর আবার হেসে ওঠে, খিলখিল করে।
চঞ্চলবাবু আবার ডাকেন, ‘স্যার আসুন। সব পেপারে ডিস্টিংগুইশিং মার্ক লাগিয়ে দিচ্ছি। আপনি পেপারগুলোর কমপ্লিট করতে শুরু করুন। অনেক ভাইটাল কাজ পড়ে রয়েছে। সময় নষ্ট করা যাবে না আর—’ মাঠ ছেড়ে স্কুলের মাটির বারান্দায় উঠে এল রঙ্গন। প্লাসটিক বিছিয়ে বসে পড়ল অন্যদের সাথে কাজে শামিল হতে।
সন্ধে গড়ানোর পরে সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে বুথের ভিতরে ঢুকলেন একজন হোমরা চোমরা গোছের মানুষ। সুঠাম ঋজু চেহারা। পরনে চেক লুঙ্গি এবং শার্ট। হ্যারিকেনের আলোয় একমনে তখন পেপার রেডি করছিল রঙ্গন। প্রথমটা অল্প আলোয় অসুবিধা হচ্ছিল খুব। কাজের গতি কমে যাচ্ছিল ক্রমাগত। এখন এই আলোয় চোখ অনেকটা সেট করে গেছে। কাজ করতে আর অসুবিধা হচ্ছে না তেমন। ভদ্রলোক ঘরে ঢুকেই ভরাট গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রিসাইডিং অফিসার কে আছেন?’
রঙ্গন উঠে দাঁড়াল। ভদ্রলোকের সামনে এসে দাঁড়িয়ে সে বলল, ‘বলুন—’
‘আপনি?’
‘হ্যাঁ। বলুন।’ আবার বলে রঙ্গন।
আপনার তো বেশ কম বয়েস—’ বলেই ফস করে একটা সিগারেট ধরালেন ভদ্রলোক। তারপর একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘আগে ভোট করার অভিজ্ঞতা আছে, নাকি এই প্রথম?’
‘প্রথম।’ বলে হাসে রঙ্গন। মনে মনে বোঝে লোকটা পরোক্ষে চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে তার ওপর। খুব স্বাভাবিক গলায় সে বলে, ‘আমার অসুবিধা হবে না, ইনফ্যাক্ট সব কাজই তো একবার না একবার শুরু করতে হয়—’অসুবিধা হবে না। আমরা আছি তো—কোনো দরকার হলে বলবেন আমাদের, সঙ্কোচ করবেন না—’ ভদ্রলোক হাসলেন।
