শঙ্খ থরথর করে কেঁপে উঠল ৷ সঙ্গে সঙ্গে আলগা হয়ে গেল তার হাতের আঙুলগুলো ৷ রাইফেলটা কেড়ে নিয়ে পাগলাবাবা ছিটকে গেলেন দূরে ৷
—আরে কী করছেন? দিন ওটা! শঙ্খ চেঁচিয়ে উঠল ৷
পাগলাবাবা নিঃশব্দে রাইফেলের নলটা ঘুরিয়ে দিলেন শঙ্খর দিকে ৷ দেখতে দেখতে বদলে যাচ্ছিল তাঁর চেহারা ৷ চোখের ভেতরে গনগন করে উঠল আগুন ৷ চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, দৃশ্য, অ্যাঁ? কাল জানতে চাইছিলে না? তোমাকে কাল দেখেই দৃশ্যটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল ৷ আমার ঘরে বিছানায় তুমি শুয়ে আছ আমারই স্ত্রীর সঙ্গে ৷
শঙ্খর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল ৷ হুঁ, মনে পড়েছে এতক্ষণে ৷ অনেক দিন আগের কথা ৷ শঙ্খ তখন স্কুলের পাট চুকিয়ে কলেজে ঢুকেছে ৷ কাছেই থাকতেন পাগলাবাবারা ৷ ফিল্ম কোম্পানির রিপ্রেজেন্টিটিভ হিসেবে পাগলাবাবা বছরের অর্ধেক সময় বাইরে বাইরেই ঘুরতেন ৷ মাঝে মাঝে পাশ দিতেন শঙ্খকে ৷ তা দিয়ে সে বিনা পয়সায় হল থেকে ছবি দেখে আসত বন্ধুবান্ধব নিয়ে ৷
পাগলাবাবার স্ত্রীর বয়েস খুবই কম ছিল ৷ বাচ্চাকাচ্চাও হয়নি তার ৷ ফলে শেষের দিকে সময় কাটানোই মুশকিল হয়ে পড়েছিল মেয়েটির ৷ তারই সুযোগ নিয়েছিল শঙ্খ ৷ সেই দুপুরে পাগলাবাবার হাত থেকে শঙ্খ পালাতে পারলেও তাঁর স্ত্রী পারেনি ৷ হাতুড়ি দিয়ে তার মাথা ফাটিয়ে পাগলাবাবা ফেরার হয়ে যান ৷
শঙ্খর গলা কাঁপতে আরম্ভ করল, হুঁ, মনে পড়েছে ৷ আপনি ফিল্মবাবু ৷
—অ্যাই অ্যাই এতক্ষণে হয়েছে! পাগলাবাবা প্রচণ্ড জোরে হেসে উঠলেন, বেড়ে একখানা নাম আমায় দিয়েছিলে ৷ আমার বউও আমায় এই নামে মাঝে মাঝে ডেকে ফেলত ৷ বয়েসটা নেহাতই কাঁচা ছিল, একদম ইনোসেন্ট ৷ অথচ তাকেই কিনা আমি টাকা দিয়ে ভোলাতে চেয়েছিলাম! একজন নারী তো পুরুষের কাছে কেবল টাকা চায় না ৷
পাগলাবাবার বন্দুকের নল আস্তে আস্তে নেমে এল ৷ গলা বুজে আসছিল তাঁর, আমি আমার স্ত্রীকে শুধু প্রাণে মারিনি, আমারই জন্য সে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল ৷ আমি জানি আমাকে না মারা পর্যন্ত সে জন্মজন্মান্তর আমাকে তাড়া করে ফিরবে ৷
পাগলাবাবা বন্দুক ফেলে দিলেন ৷ বসে পড়ছেন নীচে ৷ আবার মাথা কুটছেন ৷ পাগল পাগল! একেবারে বদ্ধ পাগল হয়ে গেছে লোকটা ৷
—উঠে পড়ুন ৷ শঙ্খ এগিয়ে গিয়ে পিঠে হাত রাখল তাঁর, মিছিমিছি আপনি কষ্ট পাচ্ছেন ৷ মেন কালপ্রিট তো আমিই ৷ আমিই আপনার স্ত্রীকে নীচে নামিয়েছিলাম ৷ মহাপাপ মহাপাপ ৷ আমার জন্য আপনার স্ত্রী অকালে প্রাণ হারিয়েছিল শুধু নয়, আপনার জীবনটাও নষ্ট হয়ে গেছে ৷ দেখছি তো কী কষ্টে আছেন আপনি!
পাগলাবাবা কেঁদে ফেললেন, বড় কষ্ট, বড় কষ্ট! স্ত্রীকে খুন করে বছরের পর বছর তাড়া খাওয়া কুকুরের মতো আমি পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছি, অনুশোচনায় জ্বলেপুড়ে মরেছি দিনের পর দিন ৷ সুইসাইড করতে গিয়েছি, সেখানেও ব্যর্থ হয়েছি বারবার ৷ কেন মারলে ওকে? ও-ই হয়তো আমাকে চিরমুক্তি দিতে পারত ৷
এর পরেই একটা অতি স্বাভাবিক ঘটনা ঘটল ৷ নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ছেয়ে গেল ঘর ৷ লোডশেডিং ৷ অন্ধকারে ঠান্ডাটা কি একটু বেশিই লাগে? গা’টা শিরশির করে উঠল শঙ্খর ৷ পাগলাবাবা তো তাঁর পাপের প্রায়শ্চিত্ত শেষ করেই এনেছেন একরকম ৷ কিন্তু তার নিজের তো এখনও পর্যন্ত শুরুই হল না ৷ ওই মহাপাপের তো একটাই বেতন হয়, মৃত্যু ৷
—পাগলাবাবা, পাগলাবাবা, আপনি কোথায়? শঙ্খ চিৎকার করে উঠল, হ্যাজাকটা একবার জ্বালান না!
পাগলাবাবার সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না ৷ বাইরে সমানে পাতা খসে পড়ার খটাস খটাস শব্দ ৷ কিন্তু তার মধ্যে ও কীসের শব্দ আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠছে? চিতাবাঘিনীর গলার ৷ ও কি চৈতলবিলের জঙ্গল থেকে আবার উঠে আসছে? গুলিটা ঠিক মতো লাগাতেই পারেনি শঙ্খ, অ্যাঁ?
বন্দুকটা কোথায় গেল? কোথায়? শঙ্খ বসে পড়ল ৷ পাগলের মতো হাতড়াচ্ছে সারা ঘর ৷ বন্দুকও নেই, পাগলাবাবাও নেই ঘরে ৷ কোথায় গেলেন ভদ্রলোক? দরজা খুলে বাইরে চলে গেলেন না তো? চিরমুক্তির জন্য সত্যি সত্যি পাগল হয়ে গিয়েছিল লোকটা ৷
পাগলাবাবার কুঠি কাঁপিয়ে বাইরে হুঙ্কার দিয়ে এসে পড়ল চিতাবাঘিনী ৷ আগের জন্মে চরম সুখের মুহূর্তে তাকে মাথায় করে নিতে হয়েছিল হাতুড়ির ঘা ৷ তাই পাগলাবাবা নয়, আসলে সেই অসমাপ্ত সুখকে পূর্ণ করবার জন্যই সে আবার ফিরে এসেছে ৷ কিন্তু একটা জখম নরখাদকের জন্মান্তরের অতৃপ্ত খিদে একটা ছাব্বিশ বছরের যুবকের পক্ষে মেটানো কি সত্যি সম্ভব?
শঙ্খর গায়ের লোম একটা একটা করে দাঁড়িয়ে যেতে লাগল ৷
পালটানো যায় না – জয়দীপ চক্রবর্তী
রঙ্গনদের বুথে পৌঁছতে পৌঁছতেই প্রায় বিকেল হয়ে গেল। আসলে ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারেই সময় লেগে গেল অনেকখানি। মালপত্র নেওয়া, মিলিয়ে দেখে পোলিং পার্টির সকলকে একত্র করে পুলিশ ট্যাগিং করা, তারপর লঞ্চ নাম্বার দেখে ঠিকঠাক লঞ্চে চেপে বসা। আবার লঞ্চে চাপলেই তো হল না, ওই লঞ্চে অন্য যেসব বুথের ভোটকর্মীদের যাওয়ার কথা তাঁদের জড়ো হতে হবে। আর সবশেষে নদীর জোয়ার—ভাটার ব্যাপার। লঞ্চ মানুষের মর্জিতে চলে না, সে চলে নদীর স্রোত অনুযায়ী। রঙ্গনরা ভোটকর্মী পাঁচজন, সঙ্গে চারজন পুলিশকর্মী আছেন। বন্দুকধারী। ডি.সি—তে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার ডিকোডিং করার সময়েই, ওঁরা বলে দিয়েছিলেন, ‘বুথটা সেনসিটিভ, ট্যাক্টফুলি ম্যানেজ করবেন—’ লঞ্চে আসার সময়ে পুলিশের লোকগুলোও তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন যাতে অযথা এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয় যে তাঁদের লোকাল সব এর সাথে কনফ্রনটেশনে যেতে হয়। রঙ্গনের অবাক লাগছিল। এঁরা পুলিশের লোক, তবু এত ভয়—অন্যায়কে রুখে দেবার মানসিকতা থেকে এঁরাই যদি এতখানি দূরে অবস্থান করেন তাহলে সাধারণ মানুষ কী করবে! চওড়া নদী আর বাণী গাছের সবুজ জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রঙ্গন ভাবছিল অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে করতে ক্রমশ ক্লীব হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর দলে নিজেকে সচেতনভাবে ভেড়াতে পারবে না সে। আইন অনুযায়ী যে দায়িত্ব সব পালন করা উচিত, সে তাই করার চেষ্টা করবে।
