শঙ্খ তা-ও মুখ খোলার দিকে গেল না ৷ তবে যত অদ্ভুতই লাগুক, পাগলাবাবার কথাগুলো শুনতে মন্দ লাগছে না৷
—একটা পুরোনো হিসেব মেটানো এখনও বাকি আছে ৷ বলতে বলতে হঠাৎ পাগলাবাবা কেমন উদাস হয়ে গেলেন, তার জন্যই বেটি এখনও ছোঁকছোঁক করে মরছে ৷ হয় ও মরবে, নয় আমি ৷
আচমকা ফোঁস করে হ্যাজাকের আলোর পিণ্ড থেকে একটা আগুনের জিব বেরিয়ে এসে মিলিয়ে গেল ৷ সঙ্গে সঙ্গে পাগলাবাবা আবার বদলে গেলেন ৷ এগিয়ে এসে শঙ্খর হাত চেপে ধরে ভেঙে পড়লেন, তুমি আমায় বাঁচাও! আমার এক্ষুনি মরে যেতে ইচ্ছা করছে না ৷ বলো বাঁচাবে আমায়? বলো বলো!
—আরে, এ কী করছেন! মুখ খুলতেই হল শঙ্খকে, হাত ছাড়ুন!
—না, ছাড়ব না ৷ আমার কী দোষ? চোখের সামনে ওরকম একটা দৃশ্য দেখলে কার মাথার ঠিক থাকে?
—দৃশ্য!
—হ্যাঁ ৷ সেদিন আমি হঠাৎই বাড়ি ফিরে এসেছিলাম ৷ ঘরে ঢুকে ওই দৃশ্য দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারিনি৷ একটা হাতুড়ি দিয়ে—৷
থেমে গেলেন পাগলাবাবা ৷ পরক্ষণেই শঙ্খকে ছেড়ে ছিটকে গিয়ে গলা চড়িয়ে দিলেন আবার, অ্যাই অ্যাই এ কী কাণ্ড, একফোঁটা ছেলে, হাঁ করে বসে বসে বড়দের কথা গিলছ? আবার বলছ, দৃশ্য? কেমন ছেলে হে তুমি? খবরদার, যা শুনেছ শুনেছ, কারুর কাছে বলেছ কি, একদম খুন করে ফেলব ৷
প্রলাপ! পাগলের প্রলাপ ৷ কিন্তু সবটাই কি প্রলাপ? শঙ্খর কেমন চেনা চেনা লাগছে কথাগুলো ৷ এই লোকটা যে সত্যি সত্যি খুন করে ফেলতে পারে সেটাও যেন বিশ্বাস করে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে ৷ কিন্তু কেন?
শঙ্খ হঠাৎ বন্দুকটা টেনে নিল কোলে ৷
.
অনেক রাতে পাগলাবাবার ঠেলায় ঘুম ভেঙে গেল শঙ্খর ৷ বাইরে সোঁ সোঁ আওয়াজ হচ্ছে ৷ খটাখট করে পাতা ঝরে যাচ্ছে ৷ সেই সঙ্গে বিশ্রী একটা আঁশটে গন্ধ ৷ টেনে ধরা গার্টারের মতো বিছানায় সিধে হয়ে বসল শঙ্খ ৷ তার পর খুব সাবধানে জানলার একটা পাল্লা ফাঁক করে একেবারে আঁতকে উঠল ৷
এসব এলাকায় কারেন্ট থাকাটাই আশ্চর্য ৷ সেই আশ্চর্য ঘটনাটা ঘটিয়ে দিয়ে বাইরের বারান্দার ডুমটা জ্বলছে ৷ বারান্দার ঠিক সিঁড়ির নীচে গুটিসুঁটি মেরে বসে আছে চিতাবাঘিনীটা ৷ কানদুটো তার খাড়া হয়ে আছে ৷ জ্বলজ্বলে চোখ দরজার দিকে স্থির ৷ যেন কারুর বাইরে বেরোনোর অপেক্ষা, চক্ষের নিমেষে তুলে নিয়ে চলে যাবে মুখে করে ৷
—সাহসখানা দ্যাখো একবার! আবার এসেছে ৷ পাগলাবাবা ফিসফিস করে উঠলেন ৷
কাল রাতে একটু বিগড়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত মহা গোলমাল কিছু করেননি ভদ্রলোক ৷ তবে বকবক করে গেছেন অনেক রাত অবধি ৷ পাগলের কথার তো মাথামুন্ডু নেই ৷ একবার এই বলছে, পরক্ষণে আর এক ৷ তবে তার মধ্যে একটা কথা শুনে শঙ্খ ভয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল ৷ স্ত্রীকে রিয়েলি ভালোবাসলেও তাকে পাগলাবাবা নিজের হাতেই খুন করেছিলেন ৷ যে ভালোবাসার জন্য তিনি মুখে রক্ত তুলে খেটে মরেছিলেন, সেখান থেকে এত বড় আঘাত তিনি সহ্য করতে পারেননি ৷
—মার মার! চালিয়ে দে! সোজা চালিয়ে দে! পাগলাবাবা শঙ্খর কাঁধ চেপে ধরলেন ৷
শঙ্খ কেঁপে উঠল ৷ যতই লোকটা পাগল সেজে থাকুক, আদতে তো একটা খুনি ৷ ফেরারি আসামি ৷ বন্দুকটা খপ করে আঁকড়ে ধরে চট করে সরে গেল সে ৷
—আরে কী করছ! পাগলাবাবা হুমড়ি খেয়ে পড়ে শঙ্খর রাইফেলের নল চেপে ধরলেন, দাও ৷ আমায় দাও বন্দুকটা ৷
সর্বনাশ, এ লোক দেখছি একটা অঘটন না ঘটিয়ে ছাড়বেন না ৷ তাড়াতাড়ি বন্দুকটা পাগলাবাবার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে শঙ্খ নলটা দিয়ে জানালার পাল্লাটা পুরো খুলে দিল ৷ হু হু করে ঠান্ডা ঢুকছে ভেতরে ৷ ঝিঁকি ডাকছে অবিশ্রাম ৷ বাঘটা আগের মতোই হাঁ করে তাকিয়ে বসে আছে দরজার দিকে ৷
হঠাৎ তড়াক করে উঠে পড়ল বাঘটা ৷ গন্ধ পেয়েছে নির্ঘাত ৷ আর এক সেকেন্ড দেরি করা যায় না ৷ নিপুণ হাতে ক্যাচটা সরিয়ে ট্রিগারটা টেনে দিল শঙ্খ ৷ লেগেছে ৷ বাঘিনীটা বিকট গর্জন করে ছিটকে গেল দূরে ৷ কিছুক্ষণ ফোয়ারার মতো ধুলোবালি উড়িয়ে কাঁটাতারের বেড়া ছিঁড়েখুঁড়ে গড়িয়ে পড়ল খাদে ৷ গাছে গাছে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠা পাখিদের চিৎকারে মুখর হয়ে উঠল পাগলাবাবার কুঠি ৷
শঙ্খ বিছানা থেকে নেমে ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিল ৷ এবার সে পরীক্ষায় পাশ করেছে ৷ কিন্তু এ কী! পাগলাবাবা যে মাথার চুল ছিঁড়তে আরম্ভ করেছেন!
—ওরে শয়তান, এ কী সর্বনাশ করলি আমার! পাগলাবাবা চিৎকার করে উঠলেন, কেন মারলি ওকে? ও তোর কী ক্ষতি করেছিল? আমার জন্য বেচারি ঘুরে ঘুরে আসত, আর আসবে না ৷
পাগলাবাবা টান মেরে ছিঁড়ে ফেললেন গলার রুদ্রাক্ষের মালা ৷ হাহাকার করে বলতে থাকলেন, কতদিন ভেবেছি দরজাটা খুলে চলে যাই, সাহস হয়নি ৷ যদি না ও আমাকে মারতে পারে, আবার যদি বেঁচে যাই ৷ এ পাপের বোঝা নিয়ে দিনের পর দিন না ঘুমিয়ে আমি বাঁচতে চাই না ৷
পাগলাবাবা চোখের পলকে উঠে দাঁড়িয়ে টেবিল থেকে তুলে নিলেন বন্দুকটা ৷ তখনও তার নল থেকে সরু সুতোর মতো ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে ৷ আবার সেই পাগলামি ৷
শঙ্খ ঝাঁপিয়ে পড়ে চেপে ধরল পাগলাবাবার হাত ৷ তৎক্ষণাৎ অদ্ভুত একটা অনুভূতি তার সারা শরীরে কাঁটার মতো বয়ে গেল ৷ এইরকম রোমে ভরা হাত আর একবার সে চেপে ধরেছিল না? সে হাতে রাইফেলের বদলে ছিল বড় একটা হাতুড়ি ৷
