সিঁড়ির নীচে আলো ধরলেন পাগলাবাবা ৷ এ সব এলাকায় ইলেকট্রিক লাইন থাকলেও সারাদিন এক ঘণ্টাও কারেন্ট থাকে কি না সন্দেহ ৷ পাগলাবাবা এই রাতে মাথায় একখানা তালপাতার টুপি পরে বসে আছেন ৷ গলায় রুদ্রাক্ষের মালা ৷ কোটরের ভেতর ধকধক করছে একজোড়া চোখ ৷ হট করে দেখলে ভয় ধরে যায় ৷ লোকটি নিদ্রাহীনতার ক্রনিক পেশেন্ট ৷ রোগের জ্বালা থেকে বাঁচবার জন্য তিন-তিন বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু প্রতিবারই অবিশ্বাস্যভাবে প্রাণে বেঁচে যান ৷ একবার তো লাইনের মধ্যে শুয়ে পড়েছিলেন, এক্সপ্রেস ট্রেন চলে যায় ওপর দিয়ে, গায়ে আঁচড়টি লাগেনি তাঁর ৷
পাগলাবাবা হ্যাজাকটা ঘরের দেওয়ালের শিকে ঝুলিয়ে ধপাস করে বসে পড়লেন চেয়ারে ৷ শঙ্খকে দেখতে দেখতে বললেন, শোনো হে ছোকরা, আসল কথাটা তোমায় খুলেই বলি ৷ যাকে দেখলে, ও কিন্তু মোটেই বাঘ নয় ৷ ও আমার ফিয়াসেঁ ৷ ফিয়াসেঁ মানে জানো তো?
আবার শুরু হল পাগলামি ৷ এই জন্যই এখনকার লোকেরা এঁকে পাগলাবাবা নাম দিয়েছে ৷ সেই সূত্রে এটার নাম পাগলাবাবার কুঠি ৷ পাগলামির সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোক কিছু কিছু সমাজসেবাও করে থাকেন ৷ রোগে-অসুখে গ্রামবাসীদের তাবিজটা-কবজটা ধরে দেন, এক-আধ দাগ ওষুধও মেলে ৷
শঙ্খ ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল ৷ হাই উঠছে ৷
পাগলাবাবার নাক কুঁচকে গেল, হাই তুললে হবে না, ব্রাদার ৷ সোজা কথা, ও রাক্ষসীকে মারা তোমার কর্ম নয় ৷ তবে তুমি যদি আমার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করে বসো, আমি নেই ৷ চ্যালেঞ্জের নাম করে আর একটা রাত এখানে থেকে যাবে সেটি হচ্ছে না, বাবা ৷
পাগলাবাবা অনেক দিন হল কলকাতার পাট চুকিয়ে দিয়ে এই আধাপাহাড়ি জঙ্গলে ডেরা পেতেছেন ৷ ভদ্রলোকের ছেলেপুলে নেই, স্ত্রীও মারা গেছেন ৷ একজন আদিবাসী বুড়ো তাঁর দেখাশোনা করে ৷
—বাঘটা কি আপনার এখানে রোজ আসে? বন্দুকটা বিছানায় শুইয়ে শঙ্খ প্রশ্নটা ছুড়ে দিল ৷
পাগলাবাবা খুকখুক করে হাসলেন, না এসে যাবে কই সোনা? আসলে ওই রাক্ষসীর স্বভাবচরিত্র ভালো ছিল না ৷ বটে তুমি আমার অনেক জুনিয়ার, তবু তোমাকে বলতে লজ্জা নেই, তাকে আমি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতাম ৷ তার একটু সুখের জন্য কী না করেছি আমি? উদয়াস্ত মুখে রক্ত তুলে খেটে মরেছি ৷ ঘরে ক’দিন থাকতাম? এক মাস, দু’ মাস, কখনও কখনও টানা তিন মাস বাইরেই পড়ে আছি ৷ কী চমৎকারই না তার প্রতিদান দিয়েছিল মহিলা!
মনে মনে বিরক্ত হলেও শঙ্খ না বলে পারল না, আমি আপনার ছকটা ঠিক ধরতে পারছি না ৷ চিতাবাঘিনীটা আপনার আগের জন্মের কেউ ছিল?
—এগজ্যাক্টলি! পাগলাবাবা চেঁচিয়ে উঠলেন, তবে মাইন্ড ইট, আমার নয়, ওর ৷ মরে গিয়ে আমার বউ চিতাবাঘ হয়ে জন্মেছে ৷ হবে না? খিদের তো শেষ ছিল না মহিলার ৷ এত এত এনে দিয়েছি, তবু তার খিদে মেটেনি ৷ তাই মরে ডাইরেক্ট বাঘ ৷ নে, এ বার কত খাবি খা ৷ পেট ভরে রক্ত খেয়ে মর ৷
বলতে বলতে গলার স্বর বদলে গেল পাগলাবাবার, ইয়াংম্যান, ওটাকে যে করে হোক নিকেশ করতে হবে তোমায়৷ আমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে ৷
—আমি? শঙ্খ মাথা দোলাল, এই তো বললেন, কেউ ওকে মারতে পারবে না ৷
—বলেছি না কি, অ্যাঁ? পাগলাবাবার চেহারা বদলে গেল চোখের নিমেষে, বেশ করেছি বলেছি ৷ আমার সঙ্গে চালাকি? বাড়াবাড়ি করবে তো ঘাড়টি ধরে বাইরে বের করে দিয়ে আসব ৷
সর্বনাশ, যত রাত বাড়ছে ভদ্রলোক তত ফেরোসাস হয়ে উঠছেন ৷ ইশ, কী কুক্ষণে যে আজ সকালে এখানে একটা আস্তানা খুঁজতে বেরিয়ে বেছে বেছে এই বাড়িটাই তার পছন্দ হয়ে যায়! পছন্দ হওয়ার কারণ, পাগলাবাবার কুঠির ছাদটা ৷ একটা মানুষখেকো বাঘকে জন্মের মতো ঘুম পাড়িয়ে দিতে একজন শিকারির কাছে এর চেয়ে লোভনীয় জায়গা আর হয় না ৷
সকালে ভদ্রলোককে তো ভালোই লাগছিল ৷ মন দিয়ে তার প্রস্তাব শুনে মুচকি হেসে বলেছিলেন, আমার এখানে? বেশ তো ৷ কিন্তু আগেই বলে রাখছি, আমি লোক সুবিধের নই ৷ এখানকার কেউ তোমায় বলেনি?
—বলেছে ৷ আমি কেয়ার করিনি ৷
—বটে? ব্রেভ ইয়ংম্যান, তুমি স্বচ্ছন্দে এখানে থেকে যেতে পারো ৷ তোমায় আমার ভালোই লাগছে ৷ মোর ওভার, কেমন চেনা চেনাও ঠেকছে ৷
শঙ্খ একদৃষ্টে দেখছিল পাগলাবাবাকে ৷ ঘাড় দুলিয়ে বলল, আমারও ৷ আপনাকে আগে কোথায় যেন দেখেছি ৷
—বটে? পাগলাবাবা অন্য কথা পেড়েছিলেন, তবে মাইন্ড ইট ব্রেভ ইয়ংম্যান, তুমি কত বড় শিকারি আজ রাতে তার পরীক্ষা দিতে হবে তোমায় ৷ রাজি?
—আনন্দের সঙ্গে ৷ বুক ঠুকে বলে দিয়েছিল শঙ্খ ৷
একে পরীক্ষায় ডাহা ফেল, তার ওপর পাগলাবাবাকেও দিল চটিয়ে ৷ শঙ্খ জড়সড় হয়ে গেল ৷ বাইরে খটাস করে একটা আওয়াজ হল ৷ পাহাড়ে-জঙ্গলে অনেক ঘুরেছে শঙ্খ, তবু চমকে গেল ৷
পাগলাবাবা একটু যেন নরম হলেন ৷ গলা নামিয়ে বললেন, ও পাতা পড়ার আওয়াজ ৷ তুমি শিকারি না ছাই ৷ খালি বড় বড় কথা ৷
শঙ্খ চেয়ে রইল ৷ আর মুখ খুলছে না ৷
পাগলাবাবার গলার স্বর খাদে নেমে এল, বললাম তো, ও রাক্ষসী পিশাচিকে মারা তোমার সাধ্য নয় ৷ আমাকে না খাওয়া পর্যন্ত ওর শান্তি নেই ৷ সারারাত ধরে দরজা আঁচড়ায়, বারান্দায় ওত পেতে বসে থাকে ৷ একদিন রাতে দরজাটা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েছিল আর কী! পরের দিন কোলাপসিবল গেট লাগিয়ে তবে হাঁফ ছাড়ি ৷
