আরও অসহিষ্ণু কণ্ঠে নিশীথ বলে উঠল, কাল শুনব’খন ৷
না, আজই শোনো ৷
প্রতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে নিশীথের গলা কেমন যেন দুর্বল হয়ে এল ৷ শুধু বললে, বলো—
বারবারা স্মিথকে তুমি সত্যিই খু-ন ক-রে-ছ নিশীথ!
অন্ধকারে সাপ দেখার মতো চমকে উঠল নিশীথ ৷ পরক্ষণেই তার গলা দিয়ে বিশ্রী বীভৎস এক অট্টহাসি রোল বেরিয়ে এসে ঘরের খিলানে খিলানে ধাক্কা খেয়ে ঘুরে ঘুরে ফিরতে লাগল ৷ তারপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে বললে, সাবাস ডিটেকটিভ! বলিহারি তোমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা!
শান্ত-কঠিন স্বরে প্রতুল বললে, মিথ্যে স্বপ্ন দিয়ে সত্য ঘটনাকে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা কোরো না নিশীথ ৷ আমি জানি, এক বছর আগে ১৩ ডিসেম্বরের রাত্রে বারবারা স্মিথ তোমার এই স্টুডিয়োতে এসেছিল, আর তুমিই তাকে খুন করেছ ৷
বটে! … প্রমাণ?
প্রতুল নিঃশব্দে কোটের পকেট থেকে সেই বস্তুটা বের করে নিশীথের সামনে ধরলে ৷ জিনিসটা আর কিছুই নয়, নীল সিল্কের একটা রুমালের ছিন্ন অংশ ৷ এক বছরের রোদে-জলে নীল রং অনেকখানি বিবর্ণ হয়ে গেছে ৷ এক কোণে পুরোনো রক্তের মতো কালচে লাল সুতো দিয়ে বোনা একটি অক্ষর—B.
প্রতুল বললে, উত্তরের জানলা টপকে পালাতে গিয়ে বারবারার হাতের নীল রুমাল ছিটকিনির হুকে আটকে যায়, সে-রাত্রে তুমি তা লক্ষ করোনি নিশীথ ৷ কিন্তু কে জানত, তারই ছিন্ন অংশ আজ এক বছর আগেকার এক হত্যা-রহস্যের সূত্র ধরিয়ে দেবে ৷
নীল রুমালটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিশীথের গরিলাকৃতি মুখখানা রক্তহীন হয়ে গেল ৷ নিচেকার পুরু ঠোঁট ঝুলে পড়ল কদাকারভাবে ৷ তারপর দেখতে দেখতে তার চোখে এল বন্য হিংস্রতা ৷ রোমশ দুই বাহু বাড়িয়ে ক্রুদ্ধ গরিলার মতো সে নিমেষে প্রতুলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল, কিন্তু তার আগেই প্রতুলের অপর হাতে দেখা দিয়েছে তার নিত্যসঙ্গী পিস্তল ৷
এক পা-ও এগিয়ো না নিশীথ!
ক্রুদ্ধ জানোয়ারের মতোই নিশীথ একটা চাপা গর্জন ক’রে উঠল ৷
পিস্তলটা তার দিকে উঁচু করে ধরে প্রতুল শান্ত বেদনাহত কণ্ঠে বলতে লাগল, তোমার আমার বন্ধুত্ব আজ আঠারো বছরের ৷ দিনে দিনে এই বন্ধুতা নিবিড় অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছে ৷ তবু, খুনি যে, তাকে বন্ধুতার খাতিরে আমি ছেড়ে দিতে পারব না নিশীথ ৷— হাত তোলো! চলো—
দুই হাত তুলে পিছন ফিরে নিশীথ আস্তে আস্তে দরজা দিয়ে বেরোলে ৷ প্রতুলের পিস্তলের নলটা তার পিঠ রইল ছুঁয়ে ৷
পিছন ফিরেই নিশীথ বললে, স্টুডিয়োর দরজা চাবি বন্ধ করে দিও প্রতুল ৷
মুখ ফিরে চাবি বন্ধ করতে দু’সেকেন্ডের বেশি লাগেনি, কিন্তু তারই মধ্যে কুয়াশা আর অন্ধকারে ভারী জুতোর আওয়াজ পেয়ে প্রতুল চিৎকার করে উঠল, পালি না নিশীথ—পালাবার চেষ্টা কোরো না! নিশীথ—নিশীথ—
ভারী জুতোর আওয়াজ ক্রমশ খালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ৷ উদ্যত পিস্তল হাতে আওয়াজ লক্ষ্য করে প্রতুল ছুটল৷
পালিয়ো না নিশীথ—নিশীথ—
ভারী জুতোর আওয়াজ কাঠের সাঁকোর ওপর গিয়ে পৌঁছেছে ৷ সাঁকোর ওপর কালো ওভারকোট মোড়া আবছা মূর্তি লক্ষ্য করে প্রতুলের পিস্তল গর্জে উঠল, দুম … দুম …
আবছা কালো মূর্তিটা একবার সাঁকোর রেলিঙের ধারে স্থির হয়ে দাঁড়াল ৷ তারপর শুধু ঝপ করে একটা শব্দ হল মাত্র ৷
প্রতুল ততক্ষণে সাঁকোর ওপরে গিয়ে পৌঁছেছে ৷ নীচের দিকে তাকিয়ে দেখল, তরল কালো মৃত্যুস্রোত মুহূর্তের জন্যে অশান্ত হয়ে উঠে আবার শান্তবেগে বয়ে চলেছে—ঠিক যেমন হয়েছিল এক বছর আগে এই ১৩ ডিসেম্বরের রাত্রে ৷
সাঁকোর ওপর প্রতুল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল ৷ তার এক হাতে পিস্তল, অপর হাতে আর্টিস্ট নিশীথ সেনের স্টুডিয়োর দরজার চাবি ৷
সে-দরজা হয়তো আর কোনোদিনই খুলবে না!
পাগলাবাবার কুঠি – শুভমানস ঘোষ
চিতাবাঘটা এল রাত এগারোটা নাগাদ ৷ ছাদের ওপর থেকে ক্ষয়া চাঁদের আলোয় শঙ্খ স্পষ্ট দেখল, লেজ নাড়াতে নাড়াতে কাঁটাতারের বেড়া টপকে বাঘটা হুশ করে চলে এল পাগলবাবার কুঠির হাতায় ৷ বাঘ নয়, বাঘিনী ৷ এর ভয়ে কিছুদিন হল আশপাশের গ্রামের আদিবাসীদের চোখ থেকে ঘুম উবে গেছে ৷ গৃহপালিত প্রাণীর সংখ্যা বাদ দিলেও এ পর্যন্ত কাচ্চাবাচ্চা সমেত হাফডজন মানুষ এর পেটে গেছে ৷ চোখের পলকে শঙ্খদ্যুতি হেভি রাইফেলখানা তুলে নিল ৷ ৩৭৫ ম্যাগনাম রাইফেল ৷ ঠিকমতো লাগাতে পারলে এক গুলিতে হাতিকে পর্যন্ত শুইয়ে দেওয়া যায় ৷
শঙ্খদ্যুতি সরকারি শিকারি ৷ শু্যটিংয়েও তার নাম আছে ৷ এখানকার বিট অফিসার শুভ্রকান্তি শঙ্খর বন্ধু ৷ চিতাটাকে গুলি করে মারার সরকারি অনুমতিপত্র নিয়ে কাল সকালে সে আসছে ৷ কিন্তু তার আগেই এটাকে নিকেশ করে কাজ হালকা করে ফেললেই তো হয় ৷ ট্রিগারের ওপর আস্তে আস্তে বেঁকে যাচ্ছিল শঙ্খর হাতের আঙুল ৷ কিন্তু ট্রিগারের ওপর তা চেপে বসার আগেই আচমকা একটা চাপা গর্জন করে বাঘটা নেমে গেল খাদের মধ্যে ৷
মিনিট দুই ৷ হাতে হ্যাজাক নিয়ে পাগলাবাবা দেখা দিলেন ৷ নীচে থেকে গলা তুলে শঙ্খকে বললেন, দেখলে তো? এ বার নেমে এসো বাছাধন ৷ তোমার দৌড় বোঝা গেছে ৷
উত্তেজনায় শঙ্খর হাত দু’টো তখনও থরথর করে কাঁপছিল ৷ বাংলোর হাতার নীচেই খাদের বিকট গড়ান ৷ জঙ্গলের শুরু সেখান থেকে ৷ স্থানীয় লোকেরা বলে চৈতলবিলের জঙ্গল ৷ এক সময় দুর্ভেদ্য ছিল ৷ এখনও ফুরিয়ে যেতে যেতে যা আছে তা বিশাল ৷ একটু আগে চিতাবাঘটা ওখান থেকেই উঠে এসেছিল ৷
