তখন ভোর হয়ে আসছে ৷ তবু ঘন কুয়াশার চারদিক ধোঁয়াটে, অস্পষ্ট ৷ ঠাওর করে চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম, কেউ কোথাও নেই ৷ সামনে খালের ধারে ল্যাম্প- পোস্টটার নীচে কনস্টেবলটাও নেই ৷ কে থাকবে এই ঝোড়ো শীতের ভোররাত্রে?
নিশ্চিন্ত আশ্বাসে বাগানের ফটক খুলে বেরিয়ে পড়লাম ৷ আস্তে আস্তে গিয়ে দাঁড়ালাম খালের ওই কাঠের সাঁকোটার ওপর ৷ নীচের দিকে তাকালাম—কালো জলস্রোত অন্ধকার মৃত্যুর মতো বয়ে চলেছে ৷ দম-দেওয়া যন্ত্রের মতো আমার হাত দুটো কাঁধের বোঝাটিকে নামিয়ে একবার খালের ওপরে শূন্যে তুলে ধরল—
তারপর শুধু ঝপ করে একটা শব্দ ৷ মুহূর্তের জন্যে অশান্ত হয়ে উঠল তরল মৃত্যুস্রোত ৷ তারপর আবার স্তব্ধতা ৷
এতক্ষণে বোধ হয় সানফ্রান্সিসকোর জাহাজ ছাড়বার শেষ ঘণ্টা বাজছে!
সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে জনহীন সাঁকোর ওপর কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম, তা জানি না ৷ আর আমার কিছুই মনে নেই প্রতুল ৷ এইখানে এসে আমার স্মৃতি গেছে হারিয়ে ৷
পরদিন যখন ঘুম ভাঙল, তখন অনেক বেলা ৷ মাথা অসহ্য ভারী, দারুণ পিপাসায় গলা উঠেছে শুকিয়ে ৷ গতরাত্রের ঘটনাটা মনে পড়তেই মাথার ভেতরটা গোলমাল হয়ে গেল ৷ তাড়াতাড়ি হলের মধ্যে গিয়ে দেখি, না, সব ঠিকই আছে, কোথাও এতটুকু বিশৃঙ্খলা নেই ৷ বুঝতে পারলাম, দুঃস্বপ্ন দেখেছি—নিছক একটা দুঃস্বপ্ন! নিমেষে দেহ-মন সুস্থ হয়ে উঠল ৷ মাথাটাও হালকা হয়ে গেল ৷ বেরিয়ে এলাম বাগানে ৷ প্রশান্ত দিন, উজ্জ্বল রোদ দেবদারু শাখায় শাখায় ঝলমল করছে ৷ গতরাত্রির দুঃস্বপ্নটা ভুলে যেতে চেষ্টা করলাম ৷ ভুলে গিয়েও ছিলাম, কিন্তু আজ ১৩ ডিসেম্বর, এক বছর পরে সেই স্বপ্ন-কাহিনি আবার নতুন করে মনে পড়ল ৷
কাহিনি বলা শেষ করে নিশীথ থামল ৷ পকেট থেকে সিগারেট বার করে ধরাল একটা ৷
পাইপের আগুনটা নিভে গিয়েছিল ৷ তবু সেই নিভন্ত পাইপ মুখে প্রতুল বড় সোফাটায় হেলান দিয়ে পূর্ণাবয়ব ছবির মতো স্থির হয়ে বসেছিল ৷ কপালে অল্প একটু কুঞ্চন-রেখা ছাড়া তার সারা মুখে চাঞ্চল্যের আর কোনো চিহ্ন নেই ৷ এতক্ষণে পাইপটা মুখ থেকে নামিয়ে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, তোমার স্বপ্ন-দেখার পরের দিন বারবারা স্মিথ তার ছবিখানা ডেলিভারি নিতে আসেনি?
নিশীথ বললে, না ৷ আর সবচেয়ে আশ্চর্য, এই দীর্ঘ এক বছরের মধ্যে বারবারা স্মিথ কোনোদিনই ছবিখানা নিতে আসেনি ৷
হুঁ, না আসাই স্বাভাবিক ৷—পাইপ ঠুকে পোড়া তামাকটা ফেলে দিতে দিতে প্রতুল বললে, ঠিক এক বছর আগে খবরের কাগজে একটা রিপোর্ট বেরিয়েছিল: বারবারা স্মিথ নামে সানফ্রান্সিসকোর একটি মেয়ে ১৩ ডিসেম্বর রাত্রে পার্ক স্ট্রিটে তার ফ্ল্যাট থেকে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়েছে ৷ পুলিশ বহু চেষ্টাতেও তার কোনো সন্ধান পায়নি ৷ তোমার স্বপ্ন-কাহিনির সঙ্গে এই ঘটনাটার অদ্ভুত যোগাযোগ রয়েছে, না নিশীথ? খবরটা তুমিও নিশচয় পড়েছিলে?
এক মুহূর্ত প্রতুলের মুখের দিকে চুপ করে তাকিয়ে থেকে নিশীথ জবাব দিলে, না, আমি পড়িনি প্রতুল ৷—তারপর হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে ভারী ওভারকোটটা গায়ে দিয়ে বললে, যাকগে ও-কথা ৷ রাত অনেক হল, ঝড় আজকে আর থামবে বলে মনে হয় না ৷ চলো, যাওয়া যাক ৷
প্রতুলের ওভারকোটটা গায়েই ছিল, টুপিটা মাথায় গিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে বললে, চলো ৷
হলের আলো নিভিয়ে দুজনে বাইরে এল ৷ স্টুডিয়োর দরজা বন্ধ করার জন্যে নিশীথ পকেট থেকে চাবি বার করতেই প্রতুল বললে, একটু দাঁড়াও, তামাকের পাউচটা টেবিলের ওপর ফেলে এসেছি ৷
ওভারকোটের কলার তুলে দিয়ে নিশীথ বললে, নিয়ে এসো ৷ বেশি দেরি কোরো না কিন্তু ৷ আজ মারাত্মক শীত পড়েছে হে, ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি!
প্রতুল একা হলের মধ্যে ঢুকে বাতি জ্বাললে ৷ তারপর টেবিলের ওপর থেকে পাউচটা নিয়ে পকেটে পুরলো ৷ ফিরে আসতে গিয়ে হঠাৎ নজরে পড়ল, উত্তরের জানলাটা খোলা ৷ কী অন্যমনস্ক এই নিশীথ, বন্ধ করতে ভুলে গেছে! কিংবা এমনও হতে পারে যে, তার দুঃস্বপ্নের মধ্যে বারবারা স্মিথ এই জানলা দিয়ে পালাতে গিয়ে খুন হয়েছিল বলে নিশীথ এদিকটায় বড়-একটা আসে না ৷ জানলাটায় গরাদ নেই, বন্ধ করে যাওয়াই ভালো ৷ নইলে সারারাত ঝোড়ো হাওয়া আসবে, চোর আসাও বিচিত্র নয় ৷
প্রতুল জানলার কাছে এগিয়ে গেল ৷ কিন্তু কপাট দুটো বন্ধ করতে গিয়ে সে স্তব্ধ হয়ে গেল ৷ জানলার ছিটকিনির হুকে কী যেন একটা বস্তু আটকে রয়েছে না? সেটা তুলে প্রতুল আলোয় ভালো করে দেখল ৷ দেখতে দেখতে তার প্রশস্ত কপালে আবার সেই কুঞ্চন-রেখা দেখা দিল ৷ জীবনে এতখানি আশ্চর্য বোধ হয় আর সে কখনও হয়নি! এতখানি আঘাতও সে কমই পেয়েছে জীবনে ৷
উত্তরের জানলাটা আর বন্ধ করা হল না ৷ ছিটকিনি-খোলা কপাটদুটো ঝড়ে বুক-চাপড়ানির মতো আছড়ে আছড়ে পড়ছে, সেদিকে প্রতুলের খেয়াল নেই ৷
কী হে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার দুঃস্বপ্নের ব্যাখ্যা ভাবছ নাকি? আর আমি বেচারি এদিকে ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার দাখিল!—দরজা ঠেলে ঢুকে নিশীথ বললে ৷
চকিতে প্রতুল হাতের বস্তুটা পকেটে পুরে ফেললে ৷ তারপর ফিরে দাঁড়িয়ে বললে, তাই বটে!
অসহিষ্ণু কণ্ঠে নিশীথ বললে, সে-কথা আর একদিন শোনা যাবে ৷ আজকে চলো—
প্রতুল এগিয়ে গিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়াল ৷ তীক্ষ্ণ-গভীর দুই চোখের দৃষ্টি নিশীথের মুখের ওপর ফেলে শান্ত গলায় শুধু বললে, না, আজই শুনে যাও ৷
