আরও কত কত ইতিহাস রয়েছে এই ঘরে। আমার এই ঘরদুটোতে। এই তো বছর চারেক আগে অম্লান যখন পুলিশের গুলি খেয়ে উপুড় হয়ে পড়ে গেছিল, রক্তে ভেসে যাচ্ছিল আমার এই ঘরের মেঝে। আমি নিজে হাতে সারা রাত ধরে বালতি বালতি জল ঢেলে সেই রক্ত ধুয়েছি। রক্তের আঁশটে গন্ধে ভরে গেছিল ঘর। মেঝে ধুয়ে আমি যখন উঠে দাঁড়িয়েছি দেখি খাটের এককোণে গুটিয়ে বসে বুলা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। আমাকে দেখে ভীষণ ভয় পাচ্ছিল ও। অর্চিও কখন যেন নিজের ঘর ছেড়ে এ-ঘরের দরজার সামনে এসে আমার দিকে একই দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। আমার দিকে কেন? মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা মাওবাদী নেতা অম্লানের দিকে ওরা একেবারের জন্যও কেউ তাকাচ্ছিল না কেনও?
আমাকে ওরা দুজনে মিলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছে বেশ কয়েকবার। আমি গেছিও। ওরা যাতে শান্তি পায় করুক না। শুধু ওষুধগুলো না খেলেই হল। আমি জানি ওই ওষুধগুলো খেলে আমি শুধু ঘুমোব, আর ঘুমোব। আর এই লোকগুলো যারা আমার সঙ্গে মাসের পর মাস বছরের পর বছর থাকে, আমার কথায় ওঠে, বসে, সিগারেট খায় ওরা কেউ আর থাকবে না। আর আমি পারব না ওদের ছেড়ে থাকতে।
বুলা অশান্তি করতে শুরু করেছিল অনেকদিন আগে থেকেই। অর্চি বড় হতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে ও যেন একটা সাপোর্ট পেয়ে অশান্তিটা আরও বাড়তে থাকছিল। আমি ওদের বেশ কয়েকবার বলেছি অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে। শোনেনি। শুধু অশান্তি আর অশান্তি। এবারে যেন সবথেকে বেশি। অরণ্য, বিদিশা, তপন, পুষ্পল, নীল ওরাও বিরক্ত হচ্ছিল বুলা অরা অর্চির ওপর। বিশেষ করে অরণ্য খুব রেগে উঠছিল বুলার ওপর। অরণ্য এমনিতেই খুব রাগী। আমিও যথেষ্ট সমঝে চলি ওকে। অনেক সময়ই আমারও কথা শোনে না ও। নিজের ইচ্ছেমতো চলে। আর আমি অসহায় হয়ে চেয়ারে বসে তাকিয়ে থাকি টেবিলের দিকে।
সেদিন রাত্রে এমনই অশান্ত ছিল অরণ্য। মদ খেয়ে বাড়ি ফিরেছিল। টলছিল। আমি গন্ধ পাচ্ছিলাম দিশি মদের। সেদিনই সন্ধেবেলা বুলা আবার আমার সঙ্গে খুব ঝগড়া করল। আমাকে পাগল, ব্যর্থ, অসামাজিক ইত্যাদি আরও অনেক শব্দ বলল। শব্দগুলো পীড়া দিচ্ছিল আমাকে। শরীর খারাপ লাগছিল আমার। মাথার ভেতর ঝনঝন শব্দ হতে শুরু করেছিল। তবু নিজের টেবিল চেয়ার ছেড়ে উঠিনি। আমি বুলার করা সব অপমান সহ্য করে নিয়েছিলাম, কিন্তু অরণ্য পারেনি। আসলে ওরা কেউ কোনোদিনই আমার লাঞ্ছনা সহ্য করতে পারে না। আমি স্পষ্ট দেখলাম মাঝরাতে অরণ্য বেরিয়ে এল। বুলাকে খুন করে আবার ঢুকে গেল।
জানি কেউ বিশ্বাস করবে না এসব কথা। এই যেমন আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি অর্চির ব্যবহারে বেশ কিছুদিন ধরে ভীষণ ক্ষুব্ধ হচ্ছে বিদিশা। আমাকে বারবার বলছে, তুমি একজন প্রতিভা। কেন এত অপমান সহ্য করছ মুখ বুজে? ওকে সরিয়ে দাও। ও তোমাকে পছন্দ করে না।
আমি জিজ্ঞেস করি, তাহলে আমার কাছে থাকে কেন?
থাকে কারণ ওর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই এই মুহূর্তে।
কেন, ওর মা-র কাছে গিয়েই তো থাকতে পারে!
আমার এমন কথায় সামান্য ঠোঁট হেলিয়ে হাসে বিদিশা। সেই হাসিতে ওর ভরা শরীর সামান্য কেঁপে ওঠে। আমার সামনে ঘন হয়ে এসে বলে, বেশ তো, তাহলে ওর মায়ের কাছেই পাঠিয়ে দাও ওকে। ওখানেই থাকুক। আমি বিদিশার মুখের ভেতর থেকে এলাচের গন্ধ পাই। ওকে এলাচ খাওয়া আমিই অভ্যাস করিয়েছি। বিদিশার কাঁধে হাত রাখি আমি। গত আড়াই বছর ধরে একটু একটু করে ওকে গড়ে তুলেছি আমি। নিজের মনের মতো করে। ও আমার সামনেই স্নান করে, শাড়ি পড়ে, চুল আঁচড়ায়। এতটুকু লজ্জা পায় না। শুধু ও কেন, এই ঘরে বছরের পর বছর ধরে যে ওরা থাকে, ঘোরে ফেরে খায়, ঘুমোয় তারা কেউ কোনোকিছু করতেই লজ্জা পায় না আমার সামনে। ওদের আগে যারা থেকেছে তারাও পায়নি কোনোদিন। কারণ ওরা পুরোটাই আমার। একমাত্র আমার। ওদের প্রতিটা নিঃশ্বাসে শুধুমাত্র আমার অধিকার। আমি ঠিক করি ওরা কতদিন কতক্ষণ কীভাবে নিঃস্বাস ফেলবে। আমার হুকুম ছাড়া ওরা কিচ্ছু করতে পারে না। অথচ এই ঘরের মধ্যেই বুলা আমাকে অস্বীকার করত। আমাকে উন্মাদ বলত, অপদার্থ বলত। আমাকে ওদের সামনে যখন-তখন অপমান করত। ওরা হাঁ করে তাকিয়ে দেখত ওদের ঈশ্বর তার স্ত্রী, পুত্রের কাছে দিনের পর দিন লাঞ্ছিত হচ্ছে। তাই একদিন রাত্রে আমার অরণ্য, যাকে আমি সব থেকে ভালোবাসি, বুলাকে আমারই সামনে খুন করল। আমি তখন লিখছিলাম। লিখছিলাম, অরণ্য হাতে একটা বালিশ নিয়ে ঝুঁকে দেখল একবার। তারপর আচমকা বালিশটা ঠেসে ধরল ওর মুখে…।
ইদানীং অর্চিও একেবারে সহ্য করতে পারছে না আমাকে। একেবারে ওর মায়ের স্বভাব পেয়েছে। বিদিশা আমাকে বারবার বলে আমি কোনোদিন অর্চিকে কিছু একটা করে ফেলব। আমি সামলে রাখি বিদিশাকে। কতদিন পারব এভাবে জানি না।
.
অর্চিও এভাবে চলে যাবে আমি ভাবতে পারিনি। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। আমি প্রাণপণ বিদিশাকে আটকানোর চেষ্টা করেছি যাতে অর্চিকে আজ রাত্রে ও খাবার না বেড়ে দেয়। আমি জানতাম কিছু একটা ঘটবে। ঠিক তাই ঘটল। রুটি, তরকারি, ডাল ডাইনিং টেবিলে বেড়ে দিল বিদিশা। আর ডাল তরকারির মধ্যে মিশিয়ে দিল বিষ। তীব্র বিষ। খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ছটফট করতে করতে ওই টেবিলের মধ্যেই মাথা গুঁজে পড়ে রইল অর্চি। বিদিশা হাসছিল। এমনভাবে অর্চির শরীরটার দিকে তাকিয়ে হাসছিল যেন বহুদিন পর ও জিতে গেছে। আমার কান্না পাচ্ছিল খুব। আমার একমাত্র ছেলে আমারই সামনে মৃত পড়ে রয়েছে। আর আমি অসহায়, কিচ্ছু করতে পারছি না। ক্রমাগত আমাকে লিখে চলতে হচ্ছে, ‘অর্চির শরীরটাকে দু-হাতে কয়েকবার নেড়ে দেখল বিদিশা। কোনো সাড়া নেই। নিশ্চিন্ত হল। অর্চির চোখদুটো বিস্ফারিত। ভীষণ ভয়।’ বিদিশা আমাকে ক্রমাগত বলে চলেছে, এবার লিখুন, নিজের একমাত্র সন্তানকে নিজেরই চোখের সামনে খুন হতে দেখলে কোন পিতা নিজেকে ঠিক রাখতে পারে? আর আমি লিখছি, লিখেই চলেছি। ঠিক যেভাবে আমাকে লিখতে হয়েছিল ‘অরণ্য হাতে একটা বালিশ নিয়ে ঝুঁকে দেখল একবার। তারপর আচমকা বালিশটা ঠেসে ধরল বুলার মুখে…।’
