আজ আমি মরে যাব। কারণ? মরে যাওয়ার জন্য কোনো যথেষ্ট কারণ লাগে বলে আমি মনে করি না। আমার আজকের পর থেকে আর কোনো কাজ নেই, সুতরাং আমি মরে যেতেই পারি। আর একমাত্র মৃত মানুষদের হাতেই কোনো কাজ থাকে না।
অর্চি আমার ছেলে। উনিশ বছর বয়স হয়ে গেল ওর। আমার সঙ্গেই থাকে। কেন থাকে কে জানে? হয়তো চাকরি কিংবা বিয়ে কিছু একটা করার পরদিন থেকে আর থাকবে না। থাকা সম্ভবও না। এই দুটো ঘরের মধ্যে এত বছর ধরে এত মানুষ এসে দিনের পর দিন থাকে যে, যে-কারওরই মেনে নেওয়া কঠিন। আমি নিজেই হাঁফিয়ে উঠি একেক সময়। ঘরে হাঁটাচলা করতে গিয়ে ধাক্কা লাগে পরস্পরের সঙ্গে। আমি নিজের চোখে দেখি সেসব দৃশ্য। বুলা বিরক্ত হত খুব। একসময় বিরক্তিটা মাত্রা ছাড়াতে শুরু করল। তারপর একদিন অরণ্য নিজে হাতে বালিশ চাপা দিয়ে খুন করল বুলাকে। আমি নিজে চোখে দেখলাম বুলা ঘুমোচ্ছিল সেইরাত্রে বিছানায়। আমি টেবিলে বসেছিলাম। অরণ্য বেরিয়ে এসে বালিশ নিয়ে বুলার মুখে চেপে ধরল। বুলা দু-হাত ছড়িয়ে তীব্র ছটফট করছিল, হাত বাড়িয়ে বোধহয় আমাকে খুঁজছিল বাঁচার জন্য। কিন্তু ওকে বাঁচাতে যেতে পারিনি। কারণ আমি তখন চেয়ারে বসেছিলাম। কিন্তু সত্যি আমার সেদিন বড় কষ্ট হচ্ছিল। আমি বারবার নিজের চোখের জল মুছছিলাম। কিন্তু অরণ্যর হাত থেকে বুলাকে বাঁচাতে পারিনি, কারণ আমি তো চেয়ারে বসেছিলাম। আমার প্রিয় টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারটায়।
আমার চোখের সামনে বুলা চলে গেল। তবে খুব বেশি কষ্ট পায়নি। মিনিট খানেক। বড় ভালো ছিল বুলা। আমাকে ভালোবাসত খুব একসময়। সেই বিয়ের কত আগে থেকে। কিন্তু অরণ্য ওকে একটুও সহ্য করতে পারত না। মেরেই ফেলল। আমার চোখের সামনে। খুন করে আবার ঢুকে গেল।
আমার মনে আছে পরের দিন পুলিশ এসে শুধু আমাকে জেরা করছিল। অরণ্যকে কেউ খোঁজেনি। আমার আশ্চর্য লাগছিল। অ্যারেস্ট হওয়া উচিত ছিল অরণ্যর। হলাম আমি। যখন থানায় যাচ্ছি আমি পিছন ফিরে দেখি আমার টেবিলের এককোণে দাঁড়িয়ে অরণ্য মিটিমিটি হাসছে। বুলাকে খুন করে একটুও লজ্জা নেই ওর।
অবশ্য আমি ছাড়া পেয়ে গেলাম। বেকসুর। বুলা নাকি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরেনি। হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছিল। হাই প্রেশার ছিল বুলার। বছর খানেক আগে একটা সিভিয়র অ্যাটাকও হয়েছিল। আমার খুব অবাক লেগেছিল পুলিশ খবর পেল কী করে? পরে বুঝেছি, পুলিশে খবর দিয়েছিল অর্চি। আমার একমাত্র ছেলে অর্চিস্মান। নিজে ছেলে হয়ে বাপকে খুনের আসামি কেন ভেবে বসল কে জানে! ভেবেছিল ওর মা, মানে বুলাকে, আমি খুন করেছি। কেন করব আমি? কারণ কী?
যাই হোক। বুলা চলে যাওয়ার পর আমি ভেবেছিলাম অর্চিও চলে যাবে বাড়ি ছেড়ে। গেল না। গেলে ভালোই হত। দুটো মাত্র ঘর। এতগুলো লোক-বাচ্চাকাচ্চা এই দুটো ঘরে কখনও আঁটে? আর মানুষগুলো তো কেউ ঘর ছেড়ে যায় না কোথাও। সামনের দোকানটাতেও যায় না, আমি না বললে, খুব বাধ্য। যখন বলি কথা বলতে, বলে। যখন বলি হাঁটতে, হাঁটে। আদর করতে নির্দেশ দিলে আদর করে। আর যদি বলি কাউকে…।
এই তো অরণ্য, বিদিশা, তপন, পুষ্পল, নীল, স্বর্ণালি, মিঃ সেন, দাশবাবু, নীহারুল, বিক্রম এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকজন প্রায় আড়াই বছর ধরে আমার বাড়িতে রয়েছে। এর মধ্যে অবশ্য অরণ্য, বিদিশা, নীল আর স্বর্ণালীর সঙ্গেই আমার কথা হয় বেশি। বাকিদের সঙ্গে অনেক কম। কয়েকজনকে তো ভুলেই গেছিলাম আমি। তবু ওরা সবাই মিলে এই দুটো ঘরেই থাকত। ওরা যে আসবে এবং থাকবে অনেকদিন সে কথা কিন্তু আমি আগেই বুলা আর অর্চিকে জানিয়েছিলাম। শুনে বুলা শুধু ‘হুম’ বলেছিল। আর কিছু বলেনি। আর অর্চি এবারেও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি ওষুধগুলো ঠিকঠাক খাও তো?
বাড়িতে লোক আসার সঙ্গে ওষুধ খাওয়ার সম্পর্ক কী? আর এ তো প্রথমবার নয়। এর আগেও অনেকবার এসেছে, নতুন নতুন মানুষ। আমাদের সঙ্গে কেউ মাসের পর মাস, কেউ বছরের পর বছর, কাটিয়েছে। বুলা এ সব জানত। কারণ বিয়ের আগেই আমি ওকে জানিয়েছিলাম এইসব কথা। ও সব শুনে শুধু হেসে বলেছিল, আসুক না। কোনো অসুবিধা নেই। শুধু তোমার আর আমার মাঝখানে না শুলেই হল।
না, কেউ শোয়নি তো! তবু বিয়ের কুড়ি বছর পর কেন যে বুলা হঠাৎ অসহিষ্ণু হতে শুরু করল। আমাকে অসুস্থ ভাবতে শুরু করল। আমি অসুস্থ! কই ঘরের মধ্যে এতগুলো লোক কখনও তো আমাকে সে-কথা বলেনি। কী সম্মান করে আমাকে! এত সম্মান আমাকে আর কেউ করে না।
আমার এই ঘরদুটোর মধ্যে আমি এত বছরে কম কিছু তো দেখিনি। প্রেম-বিরহ-মৃত্যু, বিচ্ছেদ, লোভ-ঘেন্না-ভালোবাসা, অনেক অনেক কিছু। কত সংসার তৈরি হল, ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কত শিশুর জন্ম হয়েছে এই ঘরে। তার কান্নায় আমারা ঘরের দেওয়াল, ছাদ, উঠোন ভরে গেছে। আমার মনে রয়েছে দীপ্তেন আর ঊর্মিমালার মেয়ে হয়েছিল এক শরৎকালের ভোরবেলায়। ওরা তিন বছর ছিল এই ছোট্ট ঘরটায়। বাচ্চাটার যখন জন্ম হচ্ছিল আমি বাইরে, জানলার বাইরে, তাকিয়ে দেখছিলাম, উঠোনে শিউলি গাছটার নীচে ফুলে ভরে গেছে। আমি আনন্দে কাঁদছিলাম। খুব ইচ্ছে করছিল শিশুটাকে একবার ওই ভোরের আলোতে ফুলের মধ্যে শোওয়াতে। ঊর্মিকে জিজ্ঞেসও করেছিলাম। ঊর্মি অনুমতি দেয়নি। আমি জোর করিনি। ওরই তো মেয়ে। আমি ওর নাম দিয়েছিলাম উমা। সেই নাম পছন্দ হয়েছিল ঊর্মির।
