তপন, পুষ্পল, নীল, স্বর্ণালি, মিঃ সেন, দাশবাবু, নীহারুল, বিক্রম আরও সবাই ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে অর্চিকে। ওরা কেউ শোকার্ত, কেউ আনন্দিত। আজ ওরাও চলে যাবে আমাকে ছেড়ে। একটু পরেই। শেষ হবে আমার আঠেরোতম উপন্যাস। আমি আর লিখব না। নিজের স্ত্রী-পুত্র সবাই ছেড়ে গেছে আমাকে এদের জন্য। ওদের দুজনকে খুন করেছে ওরা। আর না। বুলা আমাকে বলত আমি একজন ব্যর্থ লেখক। আমার সতেরোটা উপন্যাসের একটাও বিক্রি হয়নি, কোনো পুরস্কার পায়নি। আমি বুলার রোজগারের টাকায় বই করি। কেউ আমাকে পছন্দ করে না। শুধুমাত্র আমার চরিত্ররা আমাকে ভালোবাসে। ওরা আমার সঙ্গে থাকে, খায়, ঘুমোয়, কথা বলে— যতদিন না আমার লেখা শেষ হয়। শেষ হলে আবার নতুনরা আসে। থাকে, খায়…।
লেখাটা শেষ করি ভোর রাত্রে। আর একে একে মিলিয়ে যেতে থাকে অরণ্য, বিদিশা, নীল, মিঃ দাশ সবাই। কষ্টে আমার বুক ছিঁড়ে যেতে থাকে। এতগুলো দিন একসঙ্গে একই ঘরে থাকার পর চলে যাচ্ছে ওরা। আমাকে ছেড়ে। প্রিয়জনকে শ্মশানে দাহ করে স্নান সেরে ফেরার মতো অনুভূতি হতে থাকে আমার। গোটা বুক ফাঁকা হতে হতে একেবারে শূন্য হয়ে যায়।
আর কেউ নেই ওরা। মধ্যরাতের বাজারের মতো খাঁখাঁ করছে ঘরটা। কলম বন্ধ করে পাণ্ডুলিপির ওপর রেখে ক্লান্ত আমি কোনোমতে উঠে দাঁড়াই চেয়ার ছেড়ে। আর বিছানার দিকে চোখ পড়তেই শিউরে উঠি। বুলা ঘুমোচ্ছে খাটে! জানলা দিয়ে ভোরবেলার আলো এসে পড়েছে ওর মুখে। তাহলে?…এতদিন কোথায় ছিল বুলা? আমি পা ঘসে ঘসে হ্যাচোর-প্যাচোর করতে করতে পাশে অর্চির ঘরে যাই, দেখি ও-ও ঘুমোচ্ছে, একেবারে ওর মায়ের মতো করে। তাহলে…!
আমি ফিরে আসি আবার নিজের ঘরে। খুব সাবধানে বুলার পাশে এসে গুটিয়ে শুই। ওর মুখের দিকে তাকাই। বড় সুন্দর লাগে ওর মুখটা। ভালো লাগে ওকে। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। টেবিলে ড্রয়ারে যে বিষের শিশিটা রাখা রয়েছে সেটার কথা মনে পড়ে। আমি আবার উঠতে যাই, কিন্তু ঠিক তক্ষুনি খুব আবছা একটা মুখ চোখের সামনে দুলতে শুরু করে। ভোরবেলার মতো নিষ্পাপ কিশোরী মুখ। আমি ওর নাম দিয়ে ফেলি লাজবন্তী। তারপর ভাবতে শুরু করি। ভাবতে থাকি। লাজবন্তী একটু একটু করে আমার কাছে আসতে থাকে। আমার ঘরে।
দুই-এ পক্ষ – ইন্দ্রনীল সান্যাল
মালব্যনগরের অ্যাসাইনমেন্ট চুকিয়ে দিল্লি ফেরামাত্র প্রতিরক্ষামন্ত্রী রঞ্জিত গগৈ প্রথমা লাহিড়ীকে তলব করলেন। ‘প্র্যাট, তোকে আবার কলকাতা যেতে হবে।’
প্রথমা ভারত সরকারের এলিট ইনটেলিজেন্স উহং ‘কাইমেরা’র সদস্য। র, সিবিআই, আর্মি, নেভি বা এয়ারফোর্স কাইমেরার অস্তিত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক অপরাধ মোকাবিলার জন্যে রঞ্জিত নিজের হাতে কাইমেরা তৈরি করেছেন।
ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমি থেকে পাশ করার পর প্রথমার পোস্টিং হয় আর্মিতে। পড়াশোনায় তুখোড়, কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার হাতের তালুর মতো জানে, সার্টিফায়েড হ্যাকার, মার্শাল আর্টে পটু। রঞ্জিতের ব্যক্তিগত অনুরোধে সে আর্মি থেকে কাইমেরায় জয়েন করে।
প্রথমা বলল, ‘এই তো বেঙ্গল থেকে ফিরলাম। আবার কেন?’
‘মাননীয় রাষ্ট্রপতি অরুণ চ্যাটার্জির কার্ডিয়োলজিস্টের নাম ডক্টর চঞ্চল দুবে। পানিহাটিতে ওঁর একটা হার্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট আছে। নাম ”চঞ্চল’স হসপিটাল ইন পানিহাটি” বা ”চিপ”। রাষ্ট্রপতির স্ত্রী একটা মানথলি ম্যাগাজিন এডিট করেন। তার নেক্সট ইস্যুর জন্যে চঞ্চলের ইন্টারভিউ চাইছেন।’
প্রথমা বুঝতেও পারেনি, ইন্টারভিউ নেওয়ার মতো সোজা ব্যাপার থেকে কত জটিল ঘটনা ঘটতে চলেছে…
দুই
পেনেটিতে, গঙ্গার ধারে দশ বিঘে জমির ওপরে গড়ে উঠেছে চিপ। চারটে পাঁচতলা হাসপাতাল বিল্ডিং ছাড়াও রয়েছে ডাক্তারদের বাংলো, সিস্টার—স্টাফ—রোগীর বাড়ির লোকেদের থাকার জন্যে কোয়ার্টার। গঙ্গার শোভা, নীল আকাশ আর সবুজ মাঠ দেখলে হৃদয় আপনিই ভালো থাকে।
খোদ চঞ্চলের হৃদয় এই মুহূর্তে ভালো নেই। হার্টব্লকের কারণে বুকে পেসমেকার বসানো হয়েছে। অনেক ফোনাফুনির পরে চঞ্চলের সাক্ষাৎকারের অনুমতি পেয়েছে প্রথমা।
সে প্রথমবার ফোন করেছিল পেসমেকার বসানোর তিনদিন আগে। সাক্ষাৎকারের প্রস্তাব শুনে হাসপাতালের ‘অরএমও’ ডক্টর বিকাশ দত্ত ফোন কেটে দেন। দ্বিতীয়দিন ফোন ধরে চঞ্চলের বউ গায়ত্রী। সে ধৈর্য ধরে সবটা শোনে এবং অপারেশনের পরে সময় দেয়। আজ সেই কাঙ্ক্ষিত দিন।
চঞ্চল শুয়ে রয়েছেন নিজের বাংলোর বেডরুমে। মাস্টারবেডের বদলে আইসিসিইউয়ের রেলিং লাগানো বেড। বেডের মাথার দিক পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রিতে ভাঁজ করা। পেসমেকার বসানোর পরে চঞ্চল সম্পূর্ণ সুস্থ। তবে বেডরেস্টে রয়েছেন। বেডের পাশে রাখা হয়েছে অক্সিজেন সিলিন্ডার, আইভি স্যালাইনের পাউচ এবং স্ট্যান্ড, কার্ডিয়াক মনিটর।
‘তোমার নাম প্রথমা, আমার পদবি দুবে। তুমি ”এক” আর আমি ”দুই”। কী ইন্টারেস্টিং ব্যাপার বলো তো!’ প্রাথমিক আলাপের পরে বললেন চঞ্চল।
প্রথমা মৃদু হাসল। বেডের ডানপাশে বসে থাকা বছর তেরোর কিশোরের মাথায় হাত বুলিয়ে চঞ্চল বললেন, ‘চিপ আমার প্রথম সন্তান। আর এ আমার দ্বিতীয় সন্তান। শাশ্বত।’
