কিছুদিনের বিরতি দিয়ে আবার আমি তোমার কাছে গিয়েছিলাম ৷ গিয়ে শুনলাম, তুমি একটা স্কুলের চাকরি নিয়ে বিহারের কোন এক গ্রামে চলে গেছ ৷ বুঝেছিলাম, তুমি আমাকে এড়ানোর জন্যেই ওভাবে চলে গেছ ৷ আমার সঙ্গ তুমি চাও না— তাই তোমার এই অসহায় পলায়ন ৷ তোমার ঠিকানায় অনেক চিঠি দিয়েছিলাম ৷ কিন্তু একটাও জবাব আসত না ৷ মাঝে-মাঝে তোমার বাবার কাছে যেতাম ৷ তিনি তখন একেবারে ভেঙে পড়েছেন ৷
বলতেন, বুঝলে সুদীপ্ত— শেষ জীবনে কোথায় একটু শান্তিতে দিন কাটাব ভেবেছিলাম— কিন্তু ভগবান তা চাইল না ৷ এক মেয়ে আত্মহত্যা করল— আর-এক মেয়ে আমাকে ছেড়ে চলে গেল ৷
আমি তোমার মায়ের কথা বলতে চেয়েছিলাম ৷ কিন্তু দেখলাম, তিনি সযত্নে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেলেন ৷ পরে অবশ্য জেনেছি— কেন তোমরা তোমাদের মাকে এড়িয়ে চলতে, কেন তিনি রান্নাঘরের বাইরে আসতেন না ৷ কিন্তু সে-কাহিনি এখানে অবান্তর ৷ তা ছাড়া তুমি তো সবই জানো, তোমাকে নতুন করে শোনাবার মতো কিছুই নেই ৷
তুমি চলে যাওয়ার পর বেশ কিছুদিন বিশ্রী এক অবসাদের মধ্যে দিয়ে সময় কাটতে লাগল ৷ মাঝে-মাঝে ইচ্ছে হত— তোমার কাছে চলে যাই, তোমাকে সব বুঝিয়ে বলি ৷ কিন্তু অভিমান এসে পথ আটকে দাঁড়াত ৷ এতদিনেও আমি যখন তোমার বিশ্বাস অর্জন করতে পারিনি, তখন এই ক্ষণিক চেষ্টায় সেটা কি ফিরিয়ে আনতে পারব? তাই তোমাকে শুধু চিঠিই লিখতাম ৷ রোজ ভাবতাম, আজ তোমার চিঠি আসবে ৷ আজ না এলে কাল নিশ্চয় আসবে ৷
তোমার চিঠির প্রতীক্ষায় থেকে-থেকে যখন একেবারেই আশা ছেড়ে দিয়েছি— তখন হঠাৎ তোমার একখানা চিঠি এল ৷ সেটাই তোমার শেষ চিঠি ৷ তারপর আরও একবছর কেটে গেছে ৷ তোমার কোনো সন্ধান পাইনি ৷
তুমি লিখেছিলে, তোমার চিঠিখানাই উদ্ধৃত করছি :
আমার সুদীপ্ত,
তুমি যখন আমার এই চিঠিখানা পাবে তখন আমি স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়েছি— ছেড়ে দিয়ে কোথায় যাব— এখনও কিছু ঠিক করিনি ৷ শুধু অনুরোধ, আমাকে খোঁজার বৃথা চেষ্টা কোনোদিন কোরো না ৷ সন্ধান তুমি পাবে না ৷ পেলেও আমি ধরা দেব না ৷ এতদিন একা-একা নিজেকে প্রশ্নে-প্রশ্নে ক্ষতবিক্ষত করেছি— ধিক্কার দিয়েছি— কিন্তু এতটুকু শান্তি পাইনি ৷ মনের কথা মনে চেপে রাখলে বুঝি কোনো দিনও শান্তি পাওয়া যায় না ৷ তাই তোমার কাছে তোমার এই স্বীকৃতি ৷ আশা আছে, এখন বুঝি একটু শান্তি পাব ৷ তোমরা সবাই জানো, পাপিয়া আত্মহত্যা করেছে ৷ কিন্তু আমি জানি— তাকে হত্যা করা হয়েছে ৷ হ্যাঁ সুদীপ্ত, আমি পাপিয়াকে খুন করেছি ৷ খুন করেছি, ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে ৷ সেদিন যখন অত রাত্রে পাপিয়ার ঘর থেকে তোমাকে বের হতে দেখলাম তখন সারা মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল ৷ তুমি আর কাউকে ভালোবাসবে— অথচ আমার সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করবে— কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না ৷ তাই সকলের অজান্তে পাপিয়ার জলের গ্লাসে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিলাম ৷ আমি জানতাম, রোজ রাত্রে শোওয়ার আগে ওর জল খাওয়ার অভ্যেস আছে ৷ তাই ওকে মারার জন্যে আমাকে নতুন কোনো পথ বাছতে হয়নি ৷ এক গ্লাস জল আর ছ’টা ঘুমের ট্যাবলেট ৷ দেখলে তো, পাপিয়ার সে-ঘুম আর কোনোদিন ভাঙল না!
আজ আমি বুঝেছি— আমার সন্দেহ কতখানি ভুল ছিল ৷ আমার সন্দেহ যদি সত্যি হত, তাহলে আমি এখানে চলে আসার পরও সপ্তাহে দু-খানা করে তোমার চিঠি আসত না ৷ কিন্তু ভুল শোধরাবার আর সময় নেই ৷
জানতাম, আমি স্বীকার না করলে কেউ কোনোদিন বুঝতেও পারবে না যে, পাপিয়া আত্মহত্যা করেনি, তাকে খুন করা হয়েছিল ৷ কিন্তু নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে-করে পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি ৷ এখন তুমি ইচ্ছে করলে আমার এই চিঠিখানা পুলিশের হাতে দিয়ে আমাকে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারো— আমি আর কোনও কিছুতেই ভয় পাই না ৷ সবকিছুর জন্যে তৈরি হয়ে আছি ৷ ইতি—
তোমার শিউলি ৷
না শিউলি, তোমার এই চিঠিখানা আমি পুলিশকে দেখাইনি ৷ কোনোদিন দেখাতেও পারব না ৷ সকলে যা জেনেছে— সেটাই সত্যি হয়ে বেঁচে থাকুক ৷ কিন্তু তুমি আর আমাকে এভাবে কষ্ট দিও না ৷ তোমাকে আমি আজও চাই ৷ হ্যাঁ— তুমি খুনি জানা সত্বেও আমি তোমাকে চাই ৷ এভাবে আমার সঙ্গে আর লুকোচুরি খেলো না ৷ যেখানেই থাকো— ফিরে এসো ৷ ফিরে এসো আমার কাছে— তোমার স্বপ্ন-ঘেরা বাড়িতে ৷
দুই পৃথিবী – বিনোদ ঘোষাল
তুমি একজন উন্মাদ। তোমার সঙ্গে কথা বলে কোনো লাভ নেই। একটু আগে অর্চি আমাকে এই কথাগুলো বলে গেল। বলার সময় ও অনেক বড় করে হাঁ করছিল। ওর অন্ধকার মুখের ভেতর দিয়ে খসখসে জিভ আর আলজিভটা থিরথির করে নড়তে দেখছিলাম আমি। একটা অদ্ভুত দৃশ্যকল্প। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমি ভুলে গেছিলাম অর্চি আসলে কী বিষয়ে আমার সঙ্গে কথা বলছে। ওর চিৎকারগুলো বহু দূর থেকে হাওয়াতে ভাসতে ভাসতে এসে পৌঁছতে শুরু করছিল আমার কাছে। টুকরো টুকরো ভাঙা কথা। তার মধ্যে ‘মাকে খুন…মাকে খুন’, শব্দ দুটো বেশ কয়েকবার ছিল। আমি আন্দাজ করছিলাম অর্চি আবার ওর মায়ের মৃত্যু সম্পর্কে কিছু একটা বলছে। বুলার মৃত্যু আমার কাছেও খুব বেদনার তা কি অর্চি জানে? এমনকী আমার নিজের মৃত্যুও যথেষ্ট যন্ত্রণার, তা-ও জানে না কেউ।
